মামুনুর রশীদ

দেশভাগের পর ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ থেকে পত্রপত্রিকা, সিনেমা এসব পূর্ব বাংলায় আসত। পঞ্চাশের দশকে সিনেমার যেমন একটা বাজার ছিল পূর্ব বাংলা, তেমনি কিছু পত্রপত্রিকারও। হয়তো খুব বেশি নয়, তবু দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার একটা প্রচার ছিল, তার দুটো কারণ। একটি হলো, কলকাতা থেকে পূর্ব বাংলায় চলে আসা মধ্যবিত্ত যেমন আমার পিতা এবং তাঁর বন্ধুরা, যাঁদের অভ্যাস ছিল দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা পড়া। দ্বিতীয়টি ছিল, ইংরেজি শেখা বা পড়া। স্টেটসম্যানের ইংরেজি ছাড়া অন্য পত্রিকার ইংরেজি পছন্দ হতো না।
পত্রিকা কলকাতা থেকে সেই গ্রামে পৌঁছাতে প্রায় সাত দিন লেগে যেত। আমার বাবার দৃষ্টিশক্তি সে সময় ছিল প্রখর। একেবারে ছোট অক্ষরটিও তিনি পড়তে পারতেন। পরবর্তীকালে আমি যখন কলকাতায় আসি, তখন স্টেটসম্যান পত্রিকাটি খুঁজে বের করি। তখনো তা জীবন্ত। কিন্তু কালক্রমে দেখলাম তার একটা বাংলা ভার্সন বেরোল এবং এখনো স্টেটসম্যান চলছে, তবে প্রচারের দিক থেকে আগের মতো নেই।
স্টেটসম্যানের একটা বড় ব্যাপার ছিল, পত্রিকাটি অসাম্প্রদায়িক এবং সম্পাদকীয় নীতিমালা ছিল বলিষ্ঠ ও গণতান্ত্রিক। উৎপল দত্তের ‘কল্লোল’ নাটকের বিজ্ঞাপন যখন কোথাও ছাপত না, তখন একমাত্র স্টেটসম্যানে তা ছাপা হতো। রাজরোষকে একেবারেই ভয় পেতেন না এর সম্পাদক পারসিক ভদ্রলোক সি আর ইরানি।
যা হোক, যে কথা বলতে এত কথা বলে ফেললাম তা হলো, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এই পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে কাজ করতেন। এ সময়ই তিনি ‘লালসালু’ উপন্যাসটি লিখে ফেলেন। এ বছর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্মশতবর্ষ। এমন একটা সময়ে জন্মেছি, যখন অনেক জন্মশতবর্ষ, অনেক অর্ধশতবর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে। এটি আমাদের বয়সীদের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জন্মেছিলেন এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতা সরকারি কর্মচারী। সেই ব্রিটিশ আমলের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। ওয়ালীউল্লাহর মাতৃবিয়োগ হয় শিশুকালেই। দ্বিতীয়বার তাঁর পিতা বিয়ে করেন টাঙ্গাইলের করটিয়ার সৈয়দ পরিবারে। এই মা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জননী না হলেও মা হিসেবে তাঁকেই জানতেন। ত্রিশের দশকের সেই দুর্গম করটিয়ায় তিনি বহুবার গিয়েছিলেন। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার ছেলে ওয়ালীউল্লাহ লেখাপড়া করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর দু-একজন বন্ধুবান্ধবের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি প্রয়াত আবু সাঈদ চৌধুরী।
খুব একটা জীবন দেখার সুযোগ তাঁর হয়নি। তারপরও কী অসাধারণ দক্ষতায় তিনি রচনা করেছেন ‘লালসালু’। ‘লালসালু’র মজিদের মতো চরিত্র বাংলা সাহিত্যে কটা আছে? চাঁদের অমাবস্যার শিক্ষকের চরিত্র নিয়ে যখন তিনি লিখেছেন, তখন উপন্যাসের যে আধুনিকতম ধরন, এটা সম্পর্কে আমরা ছিলাম অজ্ঞ। ছোটগল্পেও দেশভাগের বেদনা যে কত গভীরভাবে ফুটে উঠতে পারে, তা তাঁর ‘একটি তুলসীগাছের কাহিনী’তে অবলীলায় ফুটে উঠেছিল!
উপন্যাসে, গল্পে যে ওয়ালীউল্লাহ কালজয়ী কাজ করেছেন, সেই তাঁর নাটকগুলোও আমাদের বিস্মিত করে। ‘বহিপীর’, ‘উজানে মৃত্যু’, ‘তরঙ্গভঙ্গ’-এর মতো নাটকের সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা আমরা যারা এখন নাটক করি, তাঁদের রীতিমতো লজ্জা দেয়।
চট্টগ্রামের তীর্যক নাট্যদলের প্রযোজনায় ‘তরঙ্গভঙ্গ’ দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। তেমন কোনো অতিরিক্ত চমক নেই, অত্যন্ত সহজিয়া ভঙ্গিতে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে নাটকটির অভিনয়। তাতেই একটা গভীরতায় পৌঁছা গিয়েছিল। ‘উজানে মৃত্যু’ও নির্দেশনা করছেন শামীম সাগর। সাহসী এই নির্দেশকের নাটকের সুনাম শুনেছি কিন্তু দেখা হয়নি। সাগর যে প্রযোজনাটি ভালো করবেন, তাতে আমার সন্দেহ নেই।
সম্প্রতি সংগীত বিষয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর একটি লেখা পড়ে আমি বিস্মিত হলাম। ভারতীয় এবং পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গসংগীত নিয়ে তাঁর তথ্যের ও ভাবনার কথা পড়ে নতুন করে কৌতূহল জাগল। তাঁর জানাশোনার মাত্রা যে কত দিগন্তব্যাপী, তা আমাদের জানার বাইরে। তাঁর প্রতিটি উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক আজও এত সমসাময়িক হতে পারে তা সত্যিই অবাক করে। ‘লালসালু’র মজিদ, মহব্বতপুর গ্রামের মানুষ, মজিদের তরুণী স্ত্রী অথবা চাঁদের অমাবস্যার শিক্ষক, তরঙ্গভঙ্গের আদালত—এসবই এত রাজনৈতিক পালাবদলের পরও কেমন করে যেন আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে ফেলছে!
কালজয়ী ক্ল্যাসিক সাহিত্য আমাদের স্মৃতি, আমাদের ভাবনাকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকর্ম জীবন্ত হয়ে আমাদের কল্পলোকে নয়, বাস্তব জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে প্রত্যক্ষ করার মধ্যেই ধরা দেয়। মজিদ যেভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, আজকেও সেভাবেই, বরং তার চেয়েও স্থূল পদ্ধতিতে আমাদের সমাজকে প্রভাবিত করে তুলছে। ‘লালসালু’তে তিনি মানুষের চেয়ে টুপির সংখ্যা বেশি বলেছেন। আমাদের দিনে টুপি তো বটেই, নারীর সংখ্যার চেয়ে বোরকা-হিজাবের সংখ্যা বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন দিন শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে সেই লালসালুর চিত্র।
এই আত্মনিমগ্ন, নিভৃতচারী লেখক স্বদেশও দীর্ঘদিন থাকেননি। পাকিস্তান দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইউনেসকো—এসব প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন। শেষ জীবনে তিনি প্যারিসে গিয়ে ফরাসি স্ত্রী অ্যান ম্যারিকে নিয়ে স্থিত হয়েছিলেন। প্রবাসে থেকেও তিনি বাংলাদেশের এই জনপদকে নিয়ে লেখা নয় শুধু, জীবন্ত কিছু ছবি এঁকেছেন। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ পড়লে মনে হয় তিনি যেন একটা সাদাকালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, ক্যামেরা দিয়ে নয়, কলম দিয়ে। তিনি অনুভব করেছিলেন ধর্মের রাজনীতির শক্তি এত বেশি যে সারা উপমহাদেশকে খণ্ড-বিখণ্ড করেই সে থেমে থাকেনি, মানুষের রক্তের গভীরে তা এমনভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে যে সে একটি পাষাণপ্রতিম অচলায়তন গড়ে তুলেছে।
আমাদের দেশে যাঁরা প্রগতিশীল রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন, তাঁরা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত আলী, মঞ্জু সরকারসহ অনেক লেখকেরই বই পড়েন না। মঞ্চনাটকে যেখানে নিয়ত অচলায়তন ভাঙার কথা বলা হয়, সেখানেও আসেন না, কবিতাও পড়েন না। পশ্চিমবঙ্গে একটি কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়েছিল। কমিউনিস্ট আন্দোলন মানুষকে একবার জাগিয়েছিল, যার নেপথ্যে ছিল সংস্কৃতিকর্মীদের শত নিপীড়নের মধ্যেও নিরলস কর্ম। ভারতের গণনাট্য সংঘ, গ্রুপ থিয়েটার, গণসংগীতের দল মানুষকে জাগানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পেছনে ছিল সে দেশের লেখক তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, মায়াকোভস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কিসহ অনেকে। চীন বিপ্লবের পেছনেও ল্যু স্যুনের মতো লেখকেরা ছিলেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথা আজ পর্যন্ত এ দেশের কোনো রাজনীতিবিদের মুখ থেকে শোনা যায়নি। রাজনীতিবিদ ছাড়াও শিক্ষক, ছাত্রনেতা, ছাত্র—তাঁরাও লেখক, নাট্যকার, সংগীতশিল্পীদের কথা উচ্চারণ করেন না। তাঁদের সবার দায়িত্ব শিল্প-সাহিত্যের এসব সৃজনশীল কাজকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে মানুষকে জাগরণের কাজে, সচেতনতা সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা।
একমাত্র বদরুদ্দীন উমর, হায়দার আকবর খান রনো এসব কাজকে নিয়ে লিখেছেন এবং গুরুত্ব দিয়েছেন। ষাটের দশকে অবশ্য রাশিয়ান ঔপন্যাসিক, কবি, চীনের ল্যু স্যুনসহ অনেক লেখকের লেখাই আলোচিত হতো। সেসব আলোচনা আজ আর নেই। প্রায় নিঃশব্দেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লার জন্মশতবর্ষ পার হয়ে যাচ্ছে। বাংলা একাডেমিতেও এ নিয়ে কোনো গরজ দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বা ফেডারেশনেও কোনো আলোচনা নেই। আলোচনা হলে মানুষের আগ্রহ বাড়বে, কৌতূহলী হয়ে পড়বে মানুষ। তবু টিনের তলোয়ার নিয়ে আমরা যারা যুদ্ধ করি, তারা স্মরণে রেখেছি এই মানুষটিকে। তাঁর নাট্যকর্ম উদ্ভাসিত হয়েছে আমাদের কাজে।
শতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কালজয়ী সাহিত্যকর্ম শতসহস্র বর্ষ বেঁচে থাকুক।
লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব

দেশভাগের পর ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ থেকে পত্রপত্রিকা, সিনেমা এসব পূর্ব বাংলায় আসত। পঞ্চাশের দশকে সিনেমার যেমন একটা বাজার ছিল পূর্ব বাংলা, তেমনি কিছু পত্রপত্রিকারও। হয়তো খুব বেশি নয়, তবু দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার একটা প্রচার ছিল, তার দুটো কারণ। একটি হলো, কলকাতা থেকে পূর্ব বাংলায় চলে আসা মধ্যবিত্ত যেমন আমার পিতা এবং তাঁর বন্ধুরা, যাঁদের অভ্যাস ছিল দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা পড়া। দ্বিতীয়টি ছিল, ইংরেজি শেখা বা পড়া। স্টেটসম্যানের ইংরেজি ছাড়া অন্য পত্রিকার ইংরেজি পছন্দ হতো না।
পত্রিকা কলকাতা থেকে সেই গ্রামে পৌঁছাতে প্রায় সাত দিন লেগে যেত। আমার বাবার দৃষ্টিশক্তি সে সময় ছিল প্রখর। একেবারে ছোট অক্ষরটিও তিনি পড়তে পারতেন। পরবর্তীকালে আমি যখন কলকাতায় আসি, তখন স্টেটসম্যান পত্রিকাটি খুঁজে বের করি। তখনো তা জীবন্ত। কিন্তু কালক্রমে দেখলাম তার একটা বাংলা ভার্সন বেরোল এবং এখনো স্টেটসম্যান চলছে, তবে প্রচারের দিক থেকে আগের মতো নেই।
স্টেটসম্যানের একটা বড় ব্যাপার ছিল, পত্রিকাটি অসাম্প্রদায়িক এবং সম্পাদকীয় নীতিমালা ছিল বলিষ্ঠ ও গণতান্ত্রিক। উৎপল দত্তের ‘কল্লোল’ নাটকের বিজ্ঞাপন যখন কোথাও ছাপত না, তখন একমাত্র স্টেটসম্যানে তা ছাপা হতো। রাজরোষকে একেবারেই ভয় পেতেন না এর সম্পাদক পারসিক ভদ্রলোক সি আর ইরানি।
যা হোক, যে কথা বলতে এত কথা বলে ফেললাম তা হলো, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এই পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে কাজ করতেন। এ সময়ই তিনি ‘লালসালু’ উপন্যাসটি লিখে ফেলেন। এ বছর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্মশতবর্ষ। এমন একটা সময়ে জন্মেছি, যখন অনেক জন্মশতবর্ষ, অনেক অর্ধশতবর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে। এটি আমাদের বয়সীদের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জন্মেছিলেন এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতা সরকারি কর্মচারী। সেই ব্রিটিশ আমলের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। ওয়ালীউল্লাহর মাতৃবিয়োগ হয় শিশুকালেই। দ্বিতীয়বার তাঁর পিতা বিয়ে করেন টাঙ্গাইলের করটিয়ার সৈয়দ পরিবারে। এই মা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জননী না হলেও মা হিসেবে তাঁকেই জানতেন। ত্রিশের দশকের সেই দুর্গম করটিয়ায় তিনি বহুবার গিয়েছিলেন। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার ছেলে ওয়ালীউল্লাহ লেখাপড়া করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর দু-একজন বন্ধুবান্ধবের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি প্রয়াত আবু সাঈদ চৌধুরী।
খুব একটা জীবন দেখার সুযোগ তাঁর হয়নি। তারপরও কী অসাধারণ দক্ষতায় তিনি রচনা করেছেন ‘লালসালু’। ‘লালসালু’র মজিদের মতো চরিত্র বাংলা সাহিত্যে কটা আছে? চাঁদের অমাবস্যার শিক্ষকের চরিত্র নিয়ে যখন তিনি লিখেছেন, তখন উপন্যাসের যে আধুনিকতম ধরন, এটা সম্পর্কে আমরা ছিলাম অজ্ঞ। ছোটগল্পেও দেশভাগের বেদনা যে কত গভীরভাবে ফুটে উঠতে পারে, তা তাঁর ‘একটি তুলসীগাছের কাহিনী’তে অবলীলায় ফুটে উঠেছিল!
উপন্যাসে, গল্পে যে ওয়ালীউল্লাহ কালজয়ী কাজ করেছেন, সেই তাঁর নাটকগুলোও আমাদের বিস্মিত করে। ‘বহিপীর’, ‘উজানে মৃত্যু’, ‘তরঙ্গভঙ্গ’-এর মতো নাটকের সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা আমরা যারা এখন নাটক করি, তাঁদের রীতিমতো লজ্জা দেয়।
চট্টগ্রামের তীর্যক নাট্যদলের প্রযোজনায় ‘তরঙ্গভঙ্গ’ দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। তেমন কোনো অতিরিক্ত চমক নেই, অত্যন্ত সহজিয়া ভঙ্গিতে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে নাটকটির অভিনয়। তাতেই একটা গভীরতায় পৌঁছা গিয়েছিল। ‘উজানে মৃত্যু’ও নির্দেশনা করছেন শামীম সাগর। সাহসী এই নির্দেশকের নাটকের সুনাম শুনেছি কিন্তু দেখা হয়নি। সাগর যে প্রযোজনাটি ভালো করবেন, তাতে আমার সন্দেহ নেই।
সম্প্রতি সংগীত বিষয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর একটি লেখা পড়ে আমি বিস্মিত হলাম। ভারতীয় এবং পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গসংগীত নিয়ে তাঁর তথ্যের ও ভাবনার কথা পড়ে নতুন করে কৌতূহল জাগল। তাঁর জানাশোনার মাত্রা যে কত দিগন্তব্যাপী, তা আমাদের জানার বাইরে। তাঁর প্রতিটি উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক আজও এত সমসাময়িক হতে পারে তা সত্যিই অবাক করে। ‘লালসালু’র মজিদ, মহব্বতপুর গ্রামের মানুষ, মজিদের তরুণী স্ত্রী অথবা চাঁদের অমাবস্যার শিক্ষক, তরঙ্গভঙ্গের আদালত—এসবই এত রাজনৈতিক পালাবদলের পরও কেমন করে যেন আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে ফেলছে!
কালজয়ী ক্ল্যাসিক সাহিত্য আমাদের স্মৃতি, আমাদের ভাবনাকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকর্ম জীবন্ত হয়ে আমাদের কল্পলোকে নয়, বাস্তব জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে প্রত্যক্ষ করার মধ্যেই ধরা দেয়। মজিদ যেভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, আজকেও সেভাবেই, বরং তার চেয়েও স্থূল পদ্ধতিতে আমাদের সমাজকে প্রভাবিত করে তুলছে। ‘লালসালু’তে তিনি মানুষের চেয়ে টুপির সংখ্যা বেশি বলেছেন। আমাদের দিনে টুপি তো বটেই, নারীর সংখ্যার চেয়ে বোরকা-হিজাবের সংখ্যা বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন দিন শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে সেই লালসালুর চিত্র।
এই আত্মনিমগ্ন, নিভৃতচারী লেখক স্বদেশও দীর্ঘদিন থাকেননি। পাকিস্তান দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইউনেসকো—এসব প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন। শেষ জীবনে তিনি প্যারিসে গিয়ে ফরাসি স্ত্রী অ্যান ম্যারিকে নিয়ে স্থিত হয়েছিলেন। প্রবাসে থেকেও তিনি বাংলাদেশের এই জনপদকে নিয়ে লেখা নয় শুধু, জীবন্ত কিছু ছবি এঁকেছেন। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ পড়লে মনে হয় তিনি যেন একটা সাদাকালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, ক্যামেরা দিয়ে নয়, কলম দিয়ে। তিনি অনুভব করেছিলেন ধর্মের রাজনীতির শক্তি এত বেশি যে সারা উপমহাদেশকে খণ্ড-বিখণ্ড করেই সে থেমে থাকেনি, মানুষের রক্তের গভীরে তা এমনভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে যে সে একটি পাষাণপ্রতিম অচলায়তন গড়ে তুলেছে।
আমাদের দেশে যাঁরা প্রগতিশীল রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন, তাঁরা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত আলী, মঞ্জু সরকারসহ অনেক লেখকেরই বই পড়েন না। মঞ্চনাটকে যেখানে নিয়ত অচলায়তন ভাঙার কথা বলা হয়, সেখানেও আসেন না, কবিতাও পড়েন না। পশ্চিমবঙ্গে একটি কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়েছিল। কমিউনিস্ট আন্দোলন মানুষকে একবার জাগিয়েছিল, যার নেপথ্যে ছিল সংস্কৃতিকর্মীদের শত নিপীড়নের মধ্যেও নিরলস কর্ম। ভারতের গণনাট্য সংঘ, গ্রুপ থিয়েটার, গণসংগীতের দল মানুষকে জাগানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পেছনে ছিল সে দেশের লেখক তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, মায়াকোভস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কিসহ অনেকে। চীন বিপ্লবের পেছনেও ল্যু স্যুনের মতো লেখকেরা ছিলেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথা আজ পর্যন্ত এ দেশের কোনো রাজনীতিবিদের মুখ থেকে শোনা যায়নি। রাজনীতিবিদ ছাড়াও শিক্ষক, ছাত্রনেতা, ছাত্র—তাঁরাও লেখক, নাট্যকার, সংগীতশিল্পীদের কথা উচ্চারণ করেন না। তাঁদের সবার দায়িত্ব শিল্প-সাহিত্যের এসব সৃজনশীল কাজকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে মানুষকে জাগরণের কাজে, সচেতনতা সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা।
একমাত্র বদরুদ্দীন উমর, হায়দার আকবর খান রনো এসব কাজকে নিয়ে লিখেছেন এবং গুরুত্ব দিয়েছেন। ষাটের দশকে অবশ্য রাশিয়ান ঔপন্যাসিক, কবি, চীনের ল্যু স্যুনসহ অনেক লেখকের লেখাই আলোচিত হতো। সেসব আলোচনা আজ আর নেই। প্রায় নিঃশব্দেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লার জন্মশতবর্ষ পার হয়ে যাচ্ছে। বাংলা একাডেমিতেও এ নিয়ে কোনো গরজ দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বা ফেডারেশনেও কোনো আলোচনা নেই। আলোচনা হলে মানুষের আগ্রহ বাড়বে, কৌতূহলী হয়ে পড়বে মানুষ। তবু টিনের তলোয়ার নিয়ে আমরা যারা যুদ্ধ করি, তারা স্মরণে রেখেছি এই মানুষটিকে। তাঁর নাট্যকর্ম উদ্ভাসিত হয়েছে আমাদের কাজে।
শতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কালজয়ী সাহিত্যকর্ম শতসহস্র বর্ষ বেঁচে থাকুক।
লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব

গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে সর্বশেষ (৫৪ তম) সাক্ষীর জেরা শুরু হয়েছে। এই মামলাটির বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ।
০৬ অক্টোবর ২০২৫
‘দুই দিন আগেই বাড়ি থেকে পাথরঘাটায় চলে এসেছি। এখন পুরোনো জাল সেলাই করছি। এক সপ্তাহের বাজারও করে এনেছি। আজ বিকেলে সাগর মোহনায় যাব, গভীর রাত থেকে জাল ফেলব।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদরের বাইনচটকী এলাকার জেলে হোসেন আলী। গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কথা হয় তাঁর...
১২ জুন ২০২৫
ভারতের স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞার পর সীমান্তে আটকে থাকা তৈরি পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকগুলো ফেরত আনছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে যেসব ট্রাক বন্দরে ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলো ভারতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ট্রাক ঢুকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
১৯ মে ২০২৫
আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটি হচ্ছে গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক রত্নসম্ভার। গতকাল বুধবার হংকংয়ে বিখ্যাত আর্ট নিলাম কোম্পানি সাদাবি’স-এর এক নিলামে এগুলো তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
০৮ মে ২০২৫