Ajker Patrika

‘বোকা’র প্রয়োজনীয়তা

সাজিদ মোহন
‘বোকা’র প্রয়োজনীয়তা

বিখ্যাত কবি, নাট্যকার উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের নাটকে ‘বোকা’ চরিত্রের দেখা মেলে। এই ‘বোকা’ চরিত্রগুলো প্রধান-অপ্রধান চরিত্রগুলোর দোষত্রুটি তুলে ধরে, যেমনটি অন্য কেউ পারে না। ‘বোকা’র বিদ্রূপ, কটাক্ষ এবং হাস্যরসের ব্যবহার সত্যকে সহজ করতে সাহায্য করে। ‘ওয়াইজ ফুল’ সাহিত্যিক প্যারাডক্সের একটি রূপ, যেখানে বোকা হিসেবে স্বীকৃত একটি চরিত্রকে প্রজ্ঞার ধারক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত গল্প, উপন্যাস, নাটক, শিল্পকর্মে ‘বোকা’র জ্ঞানে প্রায়ই ধরা দেয়, বুদ্ধিবৃত্তিকতা যার অর্থ বা তাৎপর্য উদ্‌ঘাটন করতে ব্যর্থ হয়। অনেকটা আমাদের গোপাল ভাঁড়ের মতো। লোকমুখে পল্লবিত তাঁর গল্পগুলোতে চমৎকার হাসির উপাদান আছে বটে, তবে ওই হাসির নেপথ্যে গুপ্তঘাতকের মতো রয়েছে মিছরির ছুরিও—এক সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে সমালোচনার মাধ্যমে কেটে উদোম করে দেয় সেই ছুরি। আছে লোকশিক্ষা, নীতিশিক্ষা এবং মোটাদাগে সমাজসংস্কারের ব্যাপার-স্যাপার।

এই বাংলার সামন্ততান্ত্রিক সমাজে একদা যখন ছিল নগরসভ্যতার উন্মেষকাল, তিনি ছিলেন সেই সমাজের রাজনৈতিক চেতনা। বিবেক। আর গোপালের রাজনৈতিক চেতনা পরিস্ফুটিত হয়েছিল ভাঁড়ামির ছদ্মবেশে। গোপাল ভাঁড়ের মতোই গল্প বলে গেছেন নাসিরুদ্দীন হোজ্জা ও বীরবল। গল্পগুলো সামন্ত শাসকদের স্বরূপের প্রতি বিদ্রূপ এবং জনগণের মধ্যকার ত্রুটি-বিচ্যুতির সমালোচনায় ভরপুর।

কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, দেশের শিক্ষিত-ভদ্র সমাজ অলিখিতভাবে হিরো আলমের একটা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ ঠিক করে রেখেছে। সেই মানদণ্ড অনেকটা এ রকম—তাঁকে নিয়ে বড়জোর ‘হাসিঠাট্টা করা যায়, গুরুত্ব দেওয়ার মতো কিছু নয়’। এই মানসিকতার বাইরে যেতে পারেননি দেশের রাজনীতিবিদেরাও। ভাঁড় হিসেবে হিরো আলমের স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিলেও, হিরো আলম তাঁর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ওয়াইজ ফুলের মতোই একের পর এক উন্মোচন করে যাচ্ছেন আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অসারতা, খুলে দিচ্ছেন ব্যর্থ প্রশাসনের ছদ্মবেশ।

হঠাৎ হিরো আলমের কথা মনে হলো আরাভ খানের ১০ বছরের জেল হওয়ার খবর দেখে। আরাভ খান পুলিশ হত্যা মামলার আসামি। অনেকের ধারণা, তাঁর ব্যাপারে পুলিশ সবকিছু জানার পরও নিশ্চুপ ছিল। কয়েক দিন আগে আরাভের দাওয়াতে দুবাই গিয়েছিলেন হিরোআলম আর সাকিব আল হাসান। ফিরে এসে হিরো আলম বলেছেন, ‘আমাকে আর সাকিব আল হাসানকে মেডেল দেওয়া উচিত। পুরস্কৃত করা উচিত। কারণ, আমরা যদি অনুষ্ঠানে না যেতাম, কে আসামি, তার সন্ধান পেত না। আমাদের জন্যই তারা আসামির সন্ধান পেয়েছে।’

কিন্তু সাকিব আল হাসান এবং অন্য যাঁরা গেছেন, এ বিষয়ে তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি। মন্তব্য করেছেন তিনি, যাঁকে আমরা বোকার একটা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ ঠিক করে দিয়েছি। আর এই বোকার মন্তব্যের হাস্যরসের নেপথ্যে গুপ্তঘাতকের মতো মিছরির ছুরি কেটে উদোম করে দেয় আমাদের অসারতা ও ব্যর্থতা।

বগুড়ার দুটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন হিরো আলম। বগুড়া-৪ আসনে মাত্র ৮৩৪ ভোটে পরাজিত হয়েছেন। নির্বাচনে হেরে তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষিত সমাজের কিছু লোক আছেন, যাঁরা আমাকে মেনে নিতে চান না। তাঁরা মনে করেন, আমি পাস করলে বাংলাদেশের সম্মান যাবে, তাঁদের সম্মান যাবে। আমরা এত শিক্ষিত, হিরো আলমের মতো মূর্খকে স্যার বলে ডাকতে হবে। এ জন্য তাঁরা আমাকে মানতে চান না। তাঁরা আমার বিজয় মেনে নিতে পারেননি। নির্বাচন নিয়ে এ রকম প্রহসন হলে, কারচুপি হলে, মানুষ নির্বাচন ভুলে যাবে।’

রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি সাধারণ মধ্যবিত্তের তীব্র ঘৃণা, অসন্তোষ, অসমর্থন, অননুমোদন, হতাশা, বিরক্তি, ভীতি এবং অসহায়ত্বের প্রকাশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মধ্যবিত্ত যা বলতে পারছে না, হিরো আলম অকপটেই বলছেন।

ডুবন্ত মানুষ যেমন কুটো ধরেও বাঁচতে চায়, বাংলাদেশের অপরাজনীতির বিভীষিকা থেকে বাঁচতে মানুষ হিরো আলমকেও অবলম্বন ভাবতে দ্বিধাবোধ করছে না।

রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত গেয়ে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর গুপির দশায় পড়েছিলেন হিরো আলম। রাজরাজড়াদের কানে সেই গান যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ডিবি কার্যালয়ে তাঁকে তলব করা হয়েছে। সেখানে তাঁর কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে এসব গান না গাওয়ার জন্য। একজন মানুষ যদি ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো উন্মুক্ত পরিসরে নিজের গাওয়া গান আপলোড করেন, তাহলে তাঁকে ‘সাত সুর জানা আছে?’ জিজ্ঞাসা করা বা ‘গাধার পিঠে চাপিয়ে গাঁ থেকে বের করে দেওয়া’ যাবে কোন আইনে? আজ পর্যন্ত রবীন্দ্রভারতীও রবীন্দ্র-সংস্কৃতি নিয়ে এ ধরনের নীতিপুলিশি করেছে বলে শোনা যায়নি।

হিরো আলমের নাম ও চেহারা নিয়ে কটূক্তি করার মধ্য দিয়ে আমাদের প্রশাসনের উলঙ্গ রূপটা বের হয়ে আসে। এ ধরনের অন্যায়-অবিচার-হয়রানির স্বীকার আমরা প্রতিনিয়তই হই। ভয়ে আমরা মুখ খুলি না। হিরো আলমের ভাঁড়ামির মধ্য দিয়ে তা উন্মোচিত হয়।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত