ভারতবর্ষে গরু জবাইকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রক্তপাতের অজস্র ঘটনা ঘটেছে। এখনো যে ঘটছে না, তা নয়। বিজেপি শাসিত রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ হয়েছে। পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত কোথাও না থাকলেও ভারতে কেন রয়েছে? কারণ ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলের ক্ষমতালাভ। যেন মানুষের জীবনের চেয়েও গরুর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। যদিও হিন্দু শাস্ত্রে গরু জবাই ও গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। শ্রীকৃষ্ণের গাভির দুধপানে জীবন রক্ষা করা এবং কৃষিকাজে গরুর ব্যবহার ইত্যাদি কারণে হিন্দুরা গরুর মাংস খাওয়া ত্যাগ করেছিল। এটা তাদের ব্যবহারবিরুদ্ধ, তবে শাস্ত্রবিরুদ্ধ নয়। ভারত ভ্রমণে অনেক মন্দিরে বিশালাকার পাথরের ষাঁড়ের মূর্তি দেখেছি। কিন্তু ষাঁড়ের মূর্তি মন্দিরে কেন? সেই ষাঁড়ের মূর্তির নিম্নাংশে খোদাইকৃত ‘নন্দী’ লেখা দেখেছি। শিবের বাহন ছিল নন্দী। এ ছাড়া শিবের প্রধান দুই অনুচর নন্দী ও ভৃঙ্গি। নন্দী ছিল বামন আকৃতির, দুই হাত খাটো এবং দেখতে ভয়ানক কুৎসিত বলেই নন্দীর ওই দেহকে আড়াল করতে ষাঁড়ের রূপ দেওয়া হয়েছে। শিবের অনুচর ও বাহন ষাঁড়রূপী নন্দী, তাই ষাঁড়ের প্রতিও হিন্দুদের সমান শ্রদ্ধা এবং পূজনীয় আচার দেখেছি।
দীর্ঘকাল বিধবাদের প্রয়াত স্বামীর সঙ্গে জোরপূর্বক সহমরণে যেতে হতো। হিন্দু ধর্মমতে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রমতবিরুদ্ধ ছিল না। পলাশীর যুদ্ধের অন্যতম কুশীলব রাজা রাজবল্লভ নিজ নাবালিকা বিধবা কন্যার কঠোর নিয়মরীতির পীড়নে ব্যথিত হয়ে বিক্রমপুরের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সঙ্গে পরামর্শ করে পুনরায় মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও পণ্ডিতদের সম্মতি আদায়ের উদ্দেশ্যে নিজ অঞ্চল বিক্রমপুরের পণ্ডিতদের নৌকাযোগে নবদ্বীপে পাঠিয়েছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র বিধবাবিবাহে অসম্মত, প্রকাশ্যে তাই শঠতার আশ্রয় নেন। নিজ পণ্ডিতদের গোপনে বিধবাবিবাহে অসম্মতি প্রদানের কঠোর নির্দেশ দেন। কৃষ্ণচন্দ্র বিক্রমপুরের পণ্ডিতদের বিধবাবিবাহের প্রস্তাব রুখতে গোপাল ভাঁড়কে ব্যবহার করেন। বিক্রমপুরের পণ্ডিতদের রাতের খাবার নিয়ে গোপাল ভাঁড় নৌকায় যায়। পণ্ডিতেরা খাবারের মধ্যে গরুর মাংস দেখে একযোগে রাম রাম বলে তীব্র ঘৃণায় চিৎকার করে ওঠেন। গোপাল ভাঁড় তাঁদের বলে, ‘গোমাংস খাওয়া শাস্ত্রবিরুদ্ধ নয়, এগুলো আপনাদের আহার করতেই হবে।’ এ কথা শুনে পণ্ডিতেরা বলে ওঠেন, ‘শাস্ত্রসম্মত হলেও গোমাংস ভক্ষণ ব্যবহারবিরুদ্ধ। এটা খাওয়া অসম্ভব।’ গোপাল ভাঁড় এই কথারই অপেক্ষা করছিল। স্মিত হেসে বলে, ‘যদি ব্যবহারবিরুদ্ধই হয়, তাহলে বিধবাবিবাহের প্রচলন করতে এসেছেন কেন? বিধবাবিবাহ শাস্ত্রবিরুদ্ধ না হলেও ব্যবহারবিরুদ্ধ। গোমাংসও তেমনি ব্যবহারবিরুদ্ধ। কোনোটিই মানা যায় না।’ এ ঘটনার পর রাতের অন্ধকারে রাজা রাজবল্লভের পাঠানো বিক্রমপুরের পণ্ডিতেরা নবদ্বীপ ত্যাগ করেন। ঘটনাটি প্রসঙ্গে লেখক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় উল্লেখ করেছেন—ঘটনার তথ্য-প্রমাণ নেই। তবে জনশ্রুতিতে এই কাহিনি প্রবলভাবে বিস্তার লাভ করেছিল।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গরু বা গরুর মাংসের ব্যবহার ইতিহাসের নানা পর্বে ঘটেছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের মূলে ভারতীয় সিপাহিদের ওপর বঞ্চনার নানা যৌক্তিক কারণ থাকলেও উপলক্ষ হয়েছিল এনফিল্ড রাইফেলে গরু ও শূকরের চর্বি মাখানো টোটার ব্যবহার নিয়ে, যেটি দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে রাইফেলের নলে ঢোকাতে হতো। এ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহিরা টোটা ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানায়। ক্ষুব্ধ ইংরেজরা টোটা ব্যবহারে অস্বীকারকারী সিপাহিদের কামানের মুখে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ভারতবর্ষব্যাপী সিপাহি বিপ্লব সংগঠিত হয়। মুসলমানদের জন্য শূকরের মাংস হারাম। অন্যদিকে হিন্দুদের পক্ষে গরুর মাংস ব্যবহারবিরুদ্ধ। যদিও টোটাসংক্রান্ত সত্যতা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। বাস্তবে বঞ্চনার বিষয়টিই বিদ্রোহে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দুই সম্প্রদায়ের মিলিত সিপাহি বিপ্লবকালে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বিভক্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। মুসলিম সম্প্রদায় ঈদে গরু কোরবানি দেবে, যেটি হিন্দু সম্প্রদায় মেনে নেবে না। বিদ্রোহী সিপাহিদের ঐক্য শঙ্কার মুখে। গরু কোরবানি নিয়ে দাঙ্গার প্রবল সম্ভাবনাময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। বিদ্রোহ দমনে আর শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন পড়বে না। শিগগিরই দুই সম্প্রদায়ের দাঙ্গা-বিরোধকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটবে। এমনটাই আশা করছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ শাসকেরা। কোম্পানির প্রভাবশালী ইংরেজ স্যার হেনরি লরেন্স ওই সময়ে লর্ড ক্যানিংকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে (কোরবানি ঈদের গরু জবাই নিয়ে) বিরোধের সৃষ্টি হবে, আমি তার অপেক্ষায় আছি।’ মুসলিম নেতৃত্বের বিচক্ষণতায় ইংরেজদের আশা পূরণ
না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ইংরেজ এইচসন এ নিয়ে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করে বলেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের আমরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছি।’
কোরবানি ঈদে গরু কোরবানিকে কেন্দ্র করে কোনো বিরোধ হয়নি। ধর্মবিশ্বাসী মুসলমানেরা গরু কোরবানি দিতে তৎপর হবে, অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায় গো হত্যার প্রতিবাদে বিদ্রোহ থেকে সরে দাঁড়াবে—এমতাবস্থায় উত্তর প্রদেশের বেরলির বিদ্রোহী প্রধান খান বাহাদুর খান ঘোষণা দিয়েছেন, ‘হিন্দু সিপাহিরা যদি এই সিপাহি বিদ্রোহে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তবে বেরলিতে কোরবানির ঈদে গরু কোরবানি দেওয়া হবে না।’ এমনকি বেরলিতে তিনি গরু জবাই পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছিলেন।
সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বিদ্রোহী সিপাহিরা নেতৃত্বে রেখে বিদ্রোহ করেছিল। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর পরিস্থিতি বিবেচনায় অত্যন্ত সাহসিকতায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কোরবানি ঈদ উপলক্ষে দিল্লিতে কোনো গরু জবাই করা চলবে না। যদি কোনো মুসলমান নির্দেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়া হবে। অন্য কোনো মুসলমান যদি এ ব্যাপারে কাউকে সাহায্য করে, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।’ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর স্বয়ং কোরবানির ঈদের দিন একটি ভেড়া জবাই করে সিপাহি বিদ্রোহের ঐক্য রক্ষা করেছিলেন। ফলে ১৮৫৭ সালের ১ আগস্ট কোরবানির ঈদে গরু কোরবানি দেওয়া নিয়ে দুই সম্প্রদায়ে বিরোধের সূত্রপাত ঘটেনি। ভেড়া, খাসি, দুম্বা, ছাগল কোরবানি দিয়ে মুসলিম সম্প্রদায় ঈদ উদ্যাপন করেছিল।
মহাত্মা গান্ধীর গো হত্যার বিরুদ্ধে জীবনভর দৃঢ় অবস্থানের কথা আমরা জানি। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭ সালে গান্ধীর মুখপত্র হরিজন পত্রিকায় তিনি লিখেছেন, ‘এটি লেখা হচ্ছে বকর ঈদ দিবসে। এই দিবস মুসলমানের পক্ষে আনন্দের এবং হিন্দুদের পক্ষে শোকের। হিন্দুদের কাছে এই দিবস শোকের এ জন্য যে, তাদের মুসলমান ভাইয়েরা বলি দেওয়ার জন্য গো হত্যা করে, যদিও তারা জানে যে গরু হিন্দুদের পূজ্য ও শ্রদ্ধার বস্তু।’ গান্ধী সারা ভারতের গো রক্ষা সভার সভাপতি ছিলেন এবং এই সভার নিয়মতন্ত্র নিজে রচনা করেছিলেন। ১৯২৪ সালে বেলগাঁও কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে গান্ধী বলেন, ‘স্বরাজের প্রশ্নের চেয়ে গো রক্ষার প্রশ্নকে আমি কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। বরং কয়েক দিক থেকে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।’ গান্ধী ও খিলাফত চুক্তিতে জিন্নাহ বিরোধিতা করেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে। খিলাফত চুক্তি প্রসঙ্গে গান্ধী বলেছিলেন, ‘এখন বোঝা যাবে কেন আমি নিজেকে সনাতনী হিন্দু হিসেবে গণ্য করি। গরুর প্রতি শ্রদ্ধায় আমি কারুর থেকে কম নই। খিলাফতের আদর্শকে আমার নিজের আদর্শ করেছি এ জন্য যে, একে রক্ষা করে গরুকে সম্পূর্ণ রক্ষা করা যাবে।’ গান্ধী আরও বলেছেন, ‘মৌলানা মহম্মদ আলীর কাছে খিলাফত হচ্ছে ধর্ম, আর খিলাফতের জন্য জীবন দান করে আমি মুসলমানের ছুরি থেকে গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই, সেটাই আমার ধর্ম। তাই আমার দাবি, খিলাফত আমাদের দুজনের কাছেই কেন্দ্রীয় বিষয়।’
শরৎচন্দ্রের ছোটগল্প ‘মহেশ’। গল্পের প্রধান চরিত্র গফুর। হতদরিদ্র এক মুসলিম। পেশায় ছিল তাঁতি, পরে ভাগচাষি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করত। তার পরিবারে মাতৃহীন মেয়ে আমেনা আর বৃদ্ধ ষাঁড় মহেশ। গ্রামটি ব্রাহ্মণ শাসিত। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপে পানির আকাল সৃষ্টি হয় গ্রামটিতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিক্যের কারণে মুসলিম আমেনাকে বহু কষ্টে পানি সংগ্রহ করতে হতো। পানির তৃষ্ণায় বৃদ্ধ ষাঁড় মহেশ আমেনার বহু কষ্টে আনা পানির কলসিতে মুখ দিতে গিয়ে তা ভেঙে যায়। এতে ক্ষিপ্ত গফুর কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে লাঙলের ফলা দিয়ে মহেশকে প্রচণ্ড আঘাত করলে মহেশের মৃত্যু ঘটে। নিজের গরুকে নিজে হত্যা করলেও তার নিস্তার নেই। গো হত্যার অভিযোগে চরম শাস্তি পেতে হবে। এই গল্পে ব্রাহ্মণ শাসিত সেই সমাজে গো হত্যা মানুষ হত্যার সমতুল্য ছিল বলেই আশ্রয় ও ভিটেমাটি ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে গফুর শহরে পালিয়ে জীবন রক্ষায় বাধ্য হয়েছিল।
গরু নিয়ে অজস্র রাজনৈতিক ঘটনা উপমহাদেশে ঘটেছে। এখনো ঘটছে না, তা নয়। ফ্রিজে রাখা মাংসকে গরুর মাংস সন্দেহে হত্যার ঘটনাও সাম্প্রতিক। অথচ পরে প্রমাণ মিলেছে, ফ্রিজের সেই মাংস গরুর ছিল না। ছিল খাসির। গরুর মাংসেরও কত ক্ষমতা, ক্ষেত্রবিশেষে রাজনীতির চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত










