Ajker Patrika

আপসকামিতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে

অরুণাভ পোদ্দার
আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২২, ০৮: ৫২
আপসকামিতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে

কদিন আগেই খোদ ঢাকা শহরের ফার্মগেটের মতো জায়গায় কপালে টিপ পরায় এক কলেজশিক্ষিকাকে প্রকাশ্যে পুলিশের পোশাকে এক লোক শারীরিকভাবে নিগৃহীত করেন। এত দিন আমরা বলে আসছিলাম দেশটা আফগানিস্তানের দিকে যাচ্ছে। হয়তো আফগানিস্তানের থেকেও অন্ধকার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এখন যাঁরা গেল গেল করছেন, আসলে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সবচেয়ে কষ্ট হয় এই ভেবে, মুক্তিযুদ্ধের ধারক ও বাহক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগ ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা বর্তমানে ক্ষমতায়। এই যে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর আস্ফালন, তা কি এক দিনে হয়েছে? হেফাজত তোষণ ও তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ্যপুস্তক সংশোধন থেকে শুরু।

এই অল্প অল্প করে আপসকামিতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী থেকে বিরোধী দলের নেতা, সংসদের স্পিকার একজন নারী, সেখানে খোদ রাজধানীতে একজন নারীকে টিপ পরার জন্য নিগৃহীত হতে হলো? ভাবা যায়! ধর্ম মানে ধারণ করা, নিজের আত্মশুদ্ধি করা। সেখানে বাঙালি নারীর পোশাককে টার্গেট করে যাদের গাত্রদাহ, তারা আসলে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের শত্রু। সরকার এবং তার প্রশাসনের ভেতরই ঘাপটি মেরে থাকা কিছু লোক এখন সাম্প্রদায়িকতার নখদন্ত প্রদর্শন করছে। এরা আসলে কারা? এরা কিছু দল ও প্রশাসনে অনুপ্রবেশকারী, কিছু ক্ষমতার মোহে মদমত্ত সুবিধাবাদী, যারা এখন তৃণমূলে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী অংশকে প্রায় ধরাশায়ী করে ফেলেছে। আমার মতে, আসলে এটা একটা বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে স্বাধীনতাবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যখন রাজনৈতিক খেলায় প্রায় ধরাশায়ী, তখন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এদের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য। পঁচাত্তরের নির্মম হত্যাকাণ্ড, সামরিক সরকারের সব ধরনের ষড়যন্ত্র, ২০০৪-এর গ্রেনেড হামলায়ও যখন স্বাধীনতার পক্ষের এ দলটিকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি, তখনই এই অনুপ্রবেশের মাধ্যমে এর মূল চরিত্র খোল নলচে পাল্টিয়ে ফেলার খেলায় মেতে উঠেছে। আর এই খেলায় অতি অবশ্যই স্বেচ্ছায় আর অনিচ্ছায় যোগ দিয়েছে ক্ষমতাসীনদের একটি অংশ। তাদের কাছে দলের আদর্শ, নৈতিকতা বড় কথা নয়। বড় হলো ক্ষমতা। এর মাশুল শুধু আওয়ামী লীগই দেবে না, এর মাশুল দিতে হবে মুক্তবুদ্ধির, মুক্তচিন্তার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব নাগরিককে।

যখন এ লেখা লিখছি, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু চ্যানেলে ছায়ানটের বর্ষবরণের আবেদন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে দেখলাম। আশ্চর্য হতে হয়, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও বাঙালিকে তার একমাত্র জাতীয় উৎসব নববর্ষের অনুষ্ঠানমালা পবিত্র রমজান মাসে হবে কি না, সেই সংশয়ে থাকতে হয়! খোদ পাকিস্তান আমলেও মানুষ এতটা ধর্মান্ধ ছিল না। এর আগেও রোজার মধ্যে শালীনতা বজায় রেখেই এ ধরনের উৎসব নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে হয়েছে। বেশি দিন আগের কথা নয়, ৮-১০ বছর আগেও বাঙালির একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসবে যখন সারা দেশে কোটি মানুষের ঢল নামত, নানা ভয়ভীতি ও অনুশাসনের বেড়াজালে তা থেকে বাঙালিকে ক্রমেই দূরে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেটা সুপরিকল্পিতভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিতর্ক উসকে দিয়ে বা নারীকে আক্রমণের মাধ্যমে সমাজে ভয় দেখানোর মাধ্যমেই হোক না কেন।

তার মানে আমরা কি ক্রমেই পেছনের দিকে, অন্ধকারের দিকে যাত্রা করছি?

যেটা বলছিলাম, ‘অকুপাই আওয়ামী লীগ’ কিন্তু বিশ্বে নতুন না, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি যদি আমরা দেখি, তা হলেও দেখা যায় যে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও অনুপ্রবেশকারী ও হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার লোক ছিল। পরাশক্তি সোভিয়েতের বিলুপ্ত হলো একটি গুলিও খরচ না করে। তাই বর্তমানের নিরঙ্কুশ আওয়ামী লীগও যে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের চক্রান্তের খপ্পরে পড়ে প্রতিক্রিয়াশীলতার অন্ধকার ফাঁদে পা দেবে না, তা কি বুকে হাত দিয়ে বলা যায়? বিশেষ করে খোদ আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের ও মধ্যম সারির নেতাদের মাঝেই ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বিদ্যমান। তাঁদের অনেকেই মনে করেন, ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে ধর্মহীনতা বা নাস্তিকতা। তাঁদের অনেককেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে মোকাবিলায় প্রতিক্রিয়াশীলদের অস্ত্র ধর্মকেই ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে ভুল বার্তা যাচ্ছে।

চিন্তার বিষয়, বঙ্গবন্ধুকন্যার পরবর্তী নেতৃত্ব কাদের হাতে যাবে—সেটা অনিশ্চিত। বিরোধী দল বিএনপির অবস্থা আরও শোচনীয়। আর মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের একসময়ের ভরসা বামপন্থী দলগুলোর অবস্থা আণুবীক্ষণিক বললেও বেশি বলা হয়। আর বাকি থাকে চরম দক্ষিণপন্থী ধর্মান্ধ দলগুলো। সেই শূন্যতা পূরণের জন্য তারা কিন্তু পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে। আক্ষরিক অর্থেই শক্তি সঞ্চয় করছে দেশি-বিদেশি শক্তির ছত্রচ্ছায়ায়। মাঝে মাঝে তারই মহড়া দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের আনাচকানাচে। খোদ রাজধানীতেই ২০১৩ সালে তারা শক্তিমত্তা প্রকাশ করেছিল।

তো এই টিপ-বিতর্ক, মাঝে মাঝে জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত বিতর্ক, গণপরিবহনে নারী কোন পোশাক পরবে, নারীদের কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের দাবিতে অন্তঃপুরে পাঠানোর দাবি কিন্তু হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

সবচেয়ে ভয়ংকর যেটা ঘটছে সেটা হলো সমাজে এই সব মেনে নেওয়া হচ্ছে ধর্মের নামে, বিনা প্রশ্নে। গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে শুধু ধর্মীয় উসকানিমূলক জলসাকে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এখন দেশের আনাচকানাচে যাত্রাপালা, বাউলগান, পালাগানের জন্য প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়, নিরাপত্তার অজুহাতে। অধিকাংশ সময়ই সেগুলোকে অনুমতি দেওয়া হয় না। এত শতকোটি টাকা ব্যয়ে ও সাড়ম্বরে মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘটা করে পালন করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আশঙ্কার কথা পত্রিকার খবরে উঠে এসেছে, খোদ রাজধানীর উপকণ্ঠে গাজীপুরে এক জরিপে উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধ কবে শুরু হয়েছিল, তা জানে না। জানে না জাতীয় চার নেতা কারা। আরও লজ্জার বিষয়, মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ কারা—এর উত্তরে বলেছে খন্দকার মুশতাকের নাম। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে। সবকিছু যেন লোকদেখানো, শেখা বুলি কপচানোর মতো হয়ে যাচ্ছে। না হলে এক যুগের বেশি সময় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল ক্ষমতায়, তারপরও কেন নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এত অবজ্ঞা, অজ্ঞানতা?

দেশে গত এক দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু মুক্তবুদ্ধির চর্চা, নির্ভেজাল বাংলা সংস্কৃতিচর্চা কোথায় যেন রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের এই অপশক্তি আলোকে ভয় পায়, বাংলা সংস্কৃতিকে ভয় পায়। তাই যেখানেই বাংলা সংস্কৃতির চিহ্ন আছে, সেটা শাড়ি, টিপ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, যাত্রাপালা, বাউলগান যাই-ই হোক না কেন, তাকে উৎপাটন করতে চায়। তাই অনতিবিলম্বে দেশকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান হওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এখনই হাতে নিতে হবে। কষ্টসাধ্য হলেও এর বিকল্প নেই।

এক. সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও লাখো শহীদের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে পাকিস্তানের দ্বিজাতিতত্ত্বকে বিদায় করে আমরা এ স্বাধীন স্বদেশ ও সংবিধান পেয়েছি। বাহাত্তরের সংবিধানই হতে পারে দেশকে ধর্মান্ধতার হাত থেকে মুক্তির রক্ষাকবচ। তাই বাহাত্তরের সংবিধানে আমাদের ফিরে যেতে হবে।

দুই. শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতেও আমাদের এখানে চার-পাঁচ ধরনের জগাখিচুড়ি মার্কা শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে; যা দেশের ঐক্য গড়ে তোলার ব্যত্যয়। সব কারিকুলামে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস পড়ানো বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তিন. দেশের মধ্যে সুষম উন্নয়ন ও গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর করতে হবে। শুধু শহরভিত্তিক ও রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন মানুষের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে; যা অগণতান্ত্রিক শক্তিকে উসকে দিতে পারে।

চার. শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সংস্কৃতিচর্চা না করে তৃণমূল পর্যন্ত সংস্কৃতিচর্চার বিস্তার ঘটানো। বাংলার আবহমানকালীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন—যাত্রাপালা, বাউল, জারি-সারি, বিভিন্ন উৎসব-পার্বণ, মেলা ও লোক ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঙালির ঋতুভিত্তিক উৎসব যেমন নববর্ষ, নবান্ন, বসন্ত উৎসবগুলোকে প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।

আমাদের সৌভাগ্য, এই ক্রান্তিকালে দেশে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। তাঁর প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া স্বদেশকে মৌলবাদের কালো থাবা থেকে মুক্ত রাখবে বলেই আমাদের আশাবাদ।

লেখক: চিকিৎসক ও সংস্কৃতিকর্মী, অরুণাভ পোদ্দার

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত