Ajker Patrika

চেতনায় ভাসানী

মযহারুল ইসলাম বাবলা
আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২২, ১০: ২৫
চেতনায় ভাসানী

১৭ নভেম্বর, ১৯৭৬। সম্ভবত রাত সোয়া আটটায় ভাসানীর মৃত্যুসংবাদ শোনামাত্র ছুটে যাই ঢাকা মেডিকেলের তৃতীয়  তলার পরিচিত কেবিনে। করিডরে উৎসুক মানুষ আর ভাসানীর অনুসারীদের ভিড়। ভিড় ঠেলে কেবিনের দরজায় ধাক্কা দিই। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজা খোলামাত্র ভেতরে ঢুকে দেখি, চিরশয়ানে নিথর ভাসানী। গণমাধ্যমের ফটোসাংবাদিকদের ছবি তোলার হিড়িক। শব ট্রলিতে উঠিয়ে নিচে রওনার সময় ট্রলি ধরতে অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ায় ট্রলির পেছনের দিক খুলে অনভিপ্রেত ঘটনার উপক্রম হয়েছিল। ভ্যাগিস পারভেজ ভাই (বাংলা একাডেমির সামনের সড়কে গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত ইউপিপি নেতা) দ্রুত ঝাঁপিয়ে ট্রলির পেছনের অংশ তুলে না ধরলে কেলেঙ্কারি ঘটে যেত। ট্রলি ঠিক করে নিচের আউটডোরের বিশাল বারান্দায় শব রাখা হলো। রাত ১০টায় ঢাকা মেডিকেল চত্বর লোকে লোকারণ্য। সামরিক শাসনের সেই ক্রান্তিকালে অত রাতে কেউ ঘরের বাইরে থাকার সাহস করত না। কিন্তু সেদিনের রাতটি হাজারো মানুষের সরব উপস্থিতি-আহাজারিতে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল।

দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে লাশ বারান্দার মাঝ থেকে সরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব পাশে আনা হয়। যেন সারিবদ্ধ মানুষ লাইন ধরে মৃত ভাসানীকে দেখতে পারে। রাত দুইটার দিকে দর্শনার্থী কমে এলে মরদেহ বারান্দার পশ্চিম দিকে নিয়ে চারদিকে কাপড় টাঙিয়ে শেষ গোসলের আয়োজন করা হয়। গোসলে অংশ নেওয়া মৌলভির সঙ্গে আমি নিজেও যোগ দিই। কুসুম গরম পানিতে মৃত ভাসানীকে গোসল করানোর ফাঁকে মৃত্যুর আগে লন্ডনে করা অপারেশনের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতস্থান ধরে দেখলাম, হিমশীতল। কাফনে আবৃত করে বারান্দার মাঝখানে লাশ এনে রাখা হলো।

লাশের চারপাশে বড় বড় বরফের চাঁই দেওয়া হলো। ডিউটিরত পুলিশ সদস্যরা দেয়ালে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছেন। মরদেহের সামান্য দূরে বসে প্রখ্যাত শিল্পী মোস্তফা আজিজ এঁকে চলেছেন ভাসানীর শব ও পারিপার্শ্বিক দৃশ্যাবলি। নিদ্রাচ্ছলে দেয়ালে হেলান দেওয়া পুলিশ সদস্যদের স্কেচ শিল্পীর খাতায় দেখে কতিপয় পুলিশ তীব্র আপত্তি জানালেও আমাদের প্রতিরোধে চুপ হয়ে যায়।

ভোরের আগেই ভাসানীর মরদেহ নিয়ে রাখা হলো টিএসসির অডিটোরিয়ামের পূর্ব-উত্তর কোণে। অন্ধকার কেটে ভোরের আকাশে আলো ফোটামাত্র নেমে আসে অগণিত মানুষের ঢল। শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের লাইন দ্রুত দীর্ঘতর হয়ে যায়। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু দর্শনার্থী কমছে না। ক্রমেই মানুষের ঢল বাড়ছে।

সকাল সাড়ে নয়টায় এলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ভাসানী সম্পর্কে। তিনি আসামের অধিবাসী। মওলানা ভাসানী দীর্ঘকাল আসামে ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসও ভারতে নজরবন্দী অবস্থায় ছিলেন। ভাসানী ও তাঁর রাজনীতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ভূপেনের ছিল বলেই অকপটে বলেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অনড় অবস্থানের কারণে ভাসানীর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার কথা।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসমুদ্রে জানাজা শেষে টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁকে দাফন করা হয়।

মওলানা ভাসানী কেবল সাম্রাজ্যবাদবিরোধীই ছিলেন না, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তায় কীভাবে লড়তে হয়, সে শিক্ষাও দিয়ে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। কেননা, আগামী প্রজন্মের পক্ষেই সম্ভব ভাসানীর আজন্ম আকাঙ্ক্ষিত শ্রেণিহীন-বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তরুণেরাই তো আমাদের ভরসার কেন্দ্রে। তাদের প্রতিই আমাদের সব প্রত্যাশা।

শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আমৃত্যু আপসহীন সংগ্রামী জননেতা মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর ৪৬ বছর আজ। তাঁর অসীম সাহস আর নির্ভীক চেতনালব্ধ রাজনীতি আতঙ্কিত করেছিল স্থানীয় সামন্তদের এবং সাম্রাজ্যবাদী চক্রকেও। মেহনতি-শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে আজীবন লড়েছেন ভাসানী। তিনি অবিচল ছিলেন তাঁদের মুক্তির সংগ্রামে।

লেখক: মযহারুল ইসলাম বাবলা, নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত