‘কাউকে পশ্চাতে রেখে নয়। ভালো উৎপাদনে উত্তম পুষ্টি, সুরক্ষিত পরিবেশ ও উন্নত জীবন’ স্লোগান নিয়ে প্রতিদিন অনেক দিবসের ভিড়ে বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তা দিবসও উদ্যাপিত হয়ে গেল। দিবসের স্লোগানটা বেশ গালভরা, কিন্তু যাদের ঘরে খাবারের নিশ্চয়তা নেই, তাদের কাছে সেটা খুবই হাস্যকর মনে হতে পারে। রাত পোহালে প্রিয় শিশুর মুখে কী খাবার দেবেন ভেবে দিশেহারা যে মা, তিনি নিশ্চিত খাদ্যনিরাপত্তা শব্দটি শুনে আক্কেলগুড়ুম হয়ে বসে থাকবেন। খাদ্যনিরাপত্তা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কৃষককে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। তাঁর সামনে হয়তো এই পরামর্শ দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ জনগণকে অবশ্যই বুঝতে হবে। তাদের স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়া আসলেই কোনো উপায় নেই।
জনগণ তো পরিশ্রমের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করে একটু সুখের মুখ দেখেছিল! তিন বেলা না হলেও দুই বেলা পেটপুরে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল তারা। সঙ্গে সস্তার তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ আর পোলট্রির মুরগির মাংস খেয়ে বেশ খুশি হয়ে আরও উন্নত জীবনের চেষ্টা করছিল। সেখানে বলা নেই, কওয়া নেই এক অজানা-অচেনা ভয়ংকর করোনা মহামারি এসে খেটে খাওয়া মানুষকে ঘরে আটকে কর্মহীন করে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢলসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ আবার তাদের দারিদ্র্য ফিরিয়ে দিল। বছর দুই বাদে করোনা পিছু হটায় লড়াকু মানুষেরা তাদের সাহস আর আত্মবিশ্বাস পুঁজি করে আবার কোমর বেঁধে কাজে নেমেছিল। ভেবেছিল অতিরিক্ত পরিশ্রম করে দুই বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেবে। কিন্তু আবারও তাদের ভাবনাকে এলোমেলো করে দিল দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া। তেল-চাল-ডাল-চিনি-ডিম-দুধ-শাকসবজির মতো নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ—সবকিছু ভোজবাজির মতো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেল।
খেটে খাওয়া মানুষ তো বটেই, এখন মধ্যবিত্তেরও নাভিশ্বাস উঠেছে। মুনাফালোভী ব্যবসায়ী, দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় বানিয়ে, যাদের কোনো অভাব নেই, পরিশ্রম না করেও যাদের ব্যাংক ব্যালেন্স অটুট, ঘরে অঢেল খাবার—তারা বুঝবে না। এটা বোঝা খুবই কঠিন। এটা শুধু তারাই বুঝবে, যারা এ অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ৪০ বছর আগে দেশে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য, শাকসবজি, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল উৎপাদন হতো, বর্তমানে তার কয়েক গুণ উৎপাদন বাড়িয়েও কেন খাদ্যের অভাব মিটছে না? আসলে আমাদের খাদ্য উৎপাদন যত না বেড়েছে, তার দ্বিগুণ বেড়েছে জনসংখ্যা। যে কারণে উৎপাদন বাড়িয়েও সুফল পাচ্ছে না মানুষ। সে জন্যই পরিমাপ করতে হবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাত অনুসারে উৎপাদন কী পরিমাণ বাড়াতে হবে? মানুষ এখন আর কোনো জায়গা ফেলে রাখে না। এমনকি বাসার বারান্দা এবং ছাদ যেখানে মাটি নেই, সেসব জায়গাতেও কৃষিকাজ হচ্ছে। আগে যে জমিতে একবারই ধান বা অন্য কোনো ফসল হতো, এখন সেই একই জমিতে বছরে তিনবার ধান বা অন্যান্য ফসল হচ্ছে।
তারপরও আমরা দেখি অনেক জমি সারা বছর পতিত পড়ে থাকে। সেসব জমি অবশ্যই চাষের আওতায় নিতে হবে। কিন্তু চাষ করা কি অতই সোজা? তার জন্য শিক্ষা ও হিসাব-নিকাশ জানা লাগে। কোন জমিতে কোন ফসল হবে, কী সার দিতে হবে, কতটুকু ছায়া বা রোদ লাগবে, সেটা যাঁরা জানেন, তাঁদের পতিত জমিতে চাষের অধিকার, ফসল ভোগ করার অধিকার দিতে হবে। বীজ, সার, প্রয়োজনীয় সেচ এবং শেষ পর্যন্ত ফসলের ন্যায্যমূল্য দিতে হবে। কৃষক অমানুষিক পরিশ্রম করে বেগুন ফলিয়ে লাভ পান ১ টাকা। আর সেই একই বেগুনে মধ্যস্বত্বভোগীরা যখন বিনা পরিশ্রমে ১০ টাকা মুনাফা লুটে নেয়, তখন বেগুনের আগুনমূল্যের তাপে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টা কৃষক ও সাধারণ ক্রেতার মাথার ওপর দিয়েই যায়।
উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যখন অতিমাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হয়, আর মাছ, পোলট্রি ও গবাদিপশু দ্রুত বড় করার জন্য কেমিক্যালযুক্ত ফিড ও মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হয়, তাতে এই মাছ, মাংস ও খাদ্যশস্য নিরাপদ থাকে কি? তা ছাড়া, উৎপাদিত ফসল ও খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার, যা মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে, সেসব বিষয় আদৌ কি কেউ দেখছে? দেখলেও সেটা কি সচেতনতা ও সততার সঙ্গে দেখছে? দেশে বিদ্যমান খাদ্যমান পরিস্থিতি কিন্তু আশার কথা বলে না। তবে এ দায় যে কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বা সরকারের, তা-ও তো নয়। জনসচেতনতাও খুবই জরুরি। অবস্থাদৃষ্টে বলা যায়, এখানেও আমাদের অবস্থা ভালো নয়।
খাদ্যের নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা আর নিরাপদ খাদ্য—দুটোই পরস্পর-সম্পর্কিত। যে খাদ্য খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকে, শরীর-মগজকে পুষ্ট করে, তার অপচয় রোধ করা, তার গুণগত মান বজায় রাখা, নিরাপদ স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের সহজলভ্যতা ও সমবণ্টন নিশ্চিত না হলে এ-জাতীয় দিবস পালন সত্যিই হাস্যকর। খাদ্যের সমবণ্টন না থাকায় কিছু মানুষের থাকে সীমাহীন খাবার আর অনেক মানুষের কাছে থাকে সামান্য খাবার। তাতে যাদের খাবার দরকার, তারা পায় না। আর অল্প লোকের কাছে কুক্ষিগত খাদ্য খাওয়ার লোকের অভাবে ফেলে দিতে হয়। সীমাহীন লোভ মানুষকে দুর্নীতি করতে বাধ্য করে। তারা অধিকাংশ মানুষের খাবার কুক্ষিগত করে রাখে আর অপচয় করে। তাই সব মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে আগে দুর্নীতি দূর করতে হবে। মানুষকে নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। জনগণকে দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। চর্চা বাড়াতে হবে পরিচ্ছন্নতারও। অভ্যাস করতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার।
শৈশব-কৈশোরে দেখেছি সকালবেলা ঘরে তৈরি চিড়া-মুড়ি, কদাচিৎ পিঠা খেতে দেওয়া হতো। এখন ছা-পোষা পরিবারের বাচ্চাদেরও নুডলস, পাউরুটি, পরোটা লাগে। নিম্ন আয়ের পরিবারেও একটি বাচ্চার সারা দিনের চকলেট, চিপস, আইসক্রিম, কেক, পুরি, শিঙাড়া খাওয়ার পেছনে যে টাকা খরচ হয়, তা দিয়ে এই দুর্মূল্যের বাজারেও তাকে চার দিন ডিম-দুধ-কলা খাওয়ানো যেতে পারে। আমাদের স্বভাব অপচয়ের এবং এখন আমরা বড়লোক না হলেও অনেকেই বড়লোক হওয়ার ভান করি। তাই পয়সা দিয়ে খাবার কিনে না খেলে আমাদের মান থাকে না। আমাদের নিজ বাড়িতে বা পথের ধারে অনাদরে-অবহেলায় পড়ে থাকে অনেক প্রকৃতিজাত শাকসবজি; যা ভেষজ গুণেও ভরপুর। কিন্তু এসব আমরা খাই না বলে চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এই আমরাই অরগানিক ফুডের বিজ্ঞাপন দেখে ফুটানি করে ভেজাল ও নকল অরগানিক ফুড খেতে হামলেও পড়ি। আমাদের এই ফুটানির জন্য প্রাকৃতিক খাবারগুলো না খেয়ে অপচয় করি। আমরা যদি প্রকৃতিজাত এসব শাকসবজি যত্ন করে সংরক্ষণ করি এবং খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি, তাতেও খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে পারি। তাই খাদ্যের নিরাপত্তার জন্য উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ এবং প্রকৃতিজাত খাদ্য সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও নারী অধিকারকর্মী










