গত শুক্রবার সকালবেলা বরিশালের বানারীপাড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখি সবকিছু বন্ধ।
পাঁচ শ টাকা দিয়ে মোটরসাইকেলে করে রহমতপুর আসলাম। বিআরটিসির কাউন্টার থেকে পদ্মাপারের কাঁঠালবাড়ী পর্যন্ত টিকিট কিনলাম ৩০০ টাকা দিয়ে, সঙ্গে ২০০ টাকা বকশিশ দিতে হলো টিকিটের স্বল্পতা ও মানুষের ভিড়ের জন্য। লঞ্চ পারাপারের জন্য মাওয়া এসে কোনো বাস না পেয়ে সিএনজিচালিত তিন চাকার বাহনে সামনে মুরগির মতো চেপে বসে ঢাকা এলাম ৩০০ টাকা দিয়ে। যেসব মানুষজন পরিবার-পরিজন নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিলেন, তাঁদের কথা ভাষায় না-ই প্রকাশ করলাম।
শনিবার ঢাকায় এসে খিলগাঁও থেকে মিরপুর যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে জিজ্ঞাসা করলাম যাবে কি না। একবাক্যে রাজি হয়ে গেল কিন্তু টাকা লাগবে ৫০০। রোববার রাস্তায় বের হয়ে মানুষের অসহায়ত্ব ও দিগ্বিদিক ছোটাছুটির অবস্থা দেখে মনে হলো, আমরা কোন দেশে আছি।
ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা, ১০০ কিলোমিটার যেতে একটি বাসের কত লিটার তেল লাগে, সেই হারে ভাড়া বাড়িয়ে হিসাব করলে মোট ভাড়ার ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা না। এই সামান্য হিসাবটা আমাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা হিসাব করে বৃহস্পতিবার যদি সবাইকে জানিয়ে দিতেন, তাহলে শুক্র, শনি ও রোববার মানুষের যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ হয়েছে, তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেত।
এ কাজটি করার কথা বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএ এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সমন্বয়ে। তারা করতে ব্যর্থ হলো, দোষ হলো সরকারের। সাধারণ জনগণ ভোগান্তির পরে সরকারের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করল, কর্তাব্যক্তিরা বহাল তবিয়তে বসে বসে আঙুল চুষলেন।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা বললেন, ‘আমরা ধর্মঘট ডাকি নাই।’ তাঁদের কথা শুনে মনে হয় ভূতে এসে সব মোটরযান ও নৌযান বন্ধ করে দিয়েছে।
কর্তাব্যক্তিদের ভাবসাব দেখে মনে হয় জনগণ কেন শুক্রবার রাস্তায় বের হলো, শনিবার তো অল্প বের হতে পারত, রোববার এক দিন কষ্ট করলে এমন কী আসে-যায়।
এই কয়দিনে ঢাকার রাস্তায় পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য চলছে, তা কোনোক্রমেই সুস্থ পরিবহনব্যবস্থার লক্ষণ নয়। প্রতিদিনই রাস্তায় বাসের মধ্যে যাত্রী ও ভাড়া আদায়কারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি, এমনকি হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ঢাকা ছাড়া অন্যান্য শহর, এমনকি দূরপাল্লার বাসেরও অবস্থা একই রকম। বরিশাল থেকে ঢাকা আসতে লঞ্চের ভাড়া ছিল ২০০-২৫০ টাকা। এখন সেটা ৪০০ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের ও মালিকপক্ষের কর্তাব্যক্তিরা যাত্রীদের কোনো মতামত না নিয়ে যে পরিমাণ ভাড়া বাড়িয়েছেন, তা দেখে লঞ্চ পরিচালনার দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁরাও লজ্জা পেয়ে গেছেন। এখন তাঁরা এই লজ্জা ঢাকার জন্য ৩৯৯ টাকায় বরিশাল থেকে ঢাকায় যাত্রী আনা-নেওয়া করছেন।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো নদীপথে পণ্যবাহী নৌযানের ভাড়া। এই ভাড়াও এখন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। পণ্য পরিবহনের এই ভাড়া বৃদ্ধির কারণে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, এটাও বহন করতে হবে এই বেচারা জনগণকে।
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বা স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ হাসিলের জন্য যা কিছুই ঘটুক না কেন, শেষমেশ বলির পাঁঠা হয় জনগণ; এককথায় বলতে গেলে আমাদের দেশের জনগণই ওই কেষ্টা ব্যাটা।










