রাজনৈতিক বক্তৃতায় হঠাৎ করেই এসেছে ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থান প্রসঙ্গ। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা বিএনপি। দুই দলই একে অপরকে সেফ এক্সিট নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। বিএনপি বলছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে পদত্যাগ করাই হবে সরকারের জন্য ‘সেফ এক্সিট’। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার দাবি নাকচ করে আওয়ামী লীগ উল্টো বিএনপিকে সেফ এক্সিটের জন্য নির্বাচনে আসার পরামর্শ দিয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকেরা একে রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এমন কথাবার্তা পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এটা পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার একটা প্রয়াস। দুই পক্ষই একে অপরকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। যারা আগে মাথা গরম করবে, তাদের ভুল করার সম্ভাবনা বেশি।’
সরকারবিরোধী কর্মসূচি দেওয়ার পর বিএনপি একাধিকবার সরকারকে সেফ এক্সিট নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, আওয়ামী লীগ সেফ এক্সিট চাইলে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। তবে বেশ কিছুদিন প্রসঙ্গটি আড়ালে ছিল। গত শনিবার রাজধানীতে এক বিক্ষোভ সমাবেশে আকস্মিকভাবে সরকারকে সেফ এক্সিট নেওয়ার পরামর্শ দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘এ কথা আমরা বারবার বলেছি, আবারও বলছি, যদি সেফ এক্সিট চান, তাহলে নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে সরে যান।’
একই দিনে রাজধানীতে এক সমাবেশে ওই বক্তব্যের জবাব দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদেরও আমরা বলছি, সেফ এক্সিট চাইলে নির্বাচনে আসুন। নির্বাচনের মাধ্যমে সেফ এক্সিট কারা নেবে, সেটা জনগণই ঠিক করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যতই হাঁকডাক দেন, আমরা বেঁচে থাকতে এটা বাংলার মাটিতে আর ফিরে আসবে না।’
ওবায়দুল কাদেরের জবাবের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে কিছু বলতে চাননি বিএনপির মহাসচিব। তবে শেষ কথাটি প্রসঙ্গে ফখরুল শুধু বলেন, ‘ওনারা দেখবেন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সব সময় জেনে আসছি, যারা জনগণ থেকে বিতাড়িত হয়, তারাই সেফ এক্সিট নেয়। এটা নতুন শুনলাম যে তারাই বিএনপিকে সেফ এক্সিট নেওয়ার কথা বলছে।’
আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, সেফ এক্সিটের কথা বলে বিএনপি অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকে উৎসাহিত করছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বদল বা ক্ষমতা ছাড়তে চাই। আর জনগণই নির্ধারণ করবে, কারা আগামী দিনে ক্ষমতায় থাকবে। তাই অন্য কারও দ্বারা বা উপায়ে নির্বাচন এবং ক্ষমতা বদলের উপায় নেই।’
দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য শাজাহান খান বলেন, ‘বিএনপির সেফ এক্সিট হচ্ছে নির্বাচনে আসা। ওরা (বিএনপি) তো বলবে, সেফ এক্সিট চাইলে তোমরা (আওয়ামী লীগ) পদত্যাগ করো। আমাদের তো পদত্যাগ করার কোনো সুযোগই নাই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যাওয়ার কোনো সুযোগ সংবিধানিক, রাজনৈতিক এবং অবস্থানগতভাবে আমাদের নাই। আর জনগণের মধ্য থেকেও এটা উচ্চারিত নয়। এটা বিএনপিসহ তাদের কতিপয় জোটসঙ্গীর দাবি।’
বিএনপির নেতারা বলছেন, বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো কারণ নেই। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা রাখেনি। দিনের ভোট রাতে করেছে। তাই তাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সরকার দাবি না মেনে তাদের অধীনে নির্বাচন করতে চাইলে ‘ভোট ঠেকাও’-এর পরিকল্পনাও আছে বলে জানান বিএনপির একাধিক নেতা। তাঁদের দাবি, এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা এখন বিএনপির আছে। একেবারে শেষ মুহূর্তে হলেও ‘ডু অর ডাই’ মিশনে নামা হবে।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ খুব স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে একটা সিরিয়াস বিষয়কে হালকা করার জন্য সেফ এক্সিটের পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে। তাদের অধীনে নির্বাচন হলে সেফ এক্সিট হবে না।’
রাজনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপি যে অর্থে সেফ এক্সিটের কথা বলছে; সেই পরিস্থিতি আন্দোলনের মাধ্যমে তাদেরই তৈরি করতে হবে। কিন্তু গত কয়েক মাসের কর্মসূচির গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হয় না, তাদের সেই সক্ষমতা আছে। আবার নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আওয়ামী লীগ যে প্রশ্নের সম্মুখীন, সেটা থেকে তো তারা বেরোতে পারছে না।
রাজনীতির মাঠে সেফ এক্সিট শব্দটা তেমন আবেদন তুলতে পারবে বলে মনে করেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কে, কাকে সেফ এক্সিট দেবে? এই শব্দটার মধ্যে আসলে কি লুকায়িত আছে, এখন ঠিক হয়ে যাও, না হলে খবর আছে? এটাই তো সেফ এক্সিট! এই বাস্তবতা দুই দল কারও জন্য তৈরি করতে পারবে না।’










