Ajker Patrika

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সংগ্রাম নতুন মাত্রা পেয়েছে

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সংগ্রাম নতুন মাত্রা পেয়েছে

ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় ইস্যুতে রাজপথে সক্রিয় একজন অ্যাকটিভিস্ট। ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।

আজকের পত্রিকা: গত বছরের ৭ অক্টোবর হঠাৎ করে হামাস ইসরায়েলে আক্রমণ করার পরে দীর্ঘ মেয়াদে ফিলিস্তিনে আক্রমণ চলছে। ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া কতটা বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে, সেটা নিশ্চিত জানার পরেও হামাস কেন হামলা করল?তানজীমউদ্দিন খান: আমরা যদি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনা দেখি এবং তার আগের ২০১১, ২০১৪ ও ২০২১ সালের পরিস্থিতিতে আমি একটা হিসাব দেখছিলাম, গড়ে প্রতিদিন ২৫০ জন মানুষকে সেখানে হত্যা করা হচ্ছিল। পুরো গাজা একটা অবরুদ্ধ বন্দিশিবিরে পরিণত হয়েছিল। মাত্র ৪১ কিমি দীর্ঘ এবং ১০ কিমি চওড়া এই লম্বাটে ভূখণ্ডের উত্তর ও পূর্ব দিক ইসরায়েলবেষ্টিত, দক্ষিণ-পশ্চিমে মিসরের সীমান্তসংলগ্ন রাফাহ ক্রসিং আর পশ্চিম দিকের পুরোটা ভূমধ্যসাগর। তাই গাজা থেকে বের হতে গেলে একমাত্র মিসরের সীমান্তসংলগ্ন রাফাহ ছাড়া বের হওয়ার অন্য কোনো পথ ছিল না। আবার ২০০৭ সালে গাজায় হামাস ক্ষমতায় আসার পর থেকে গাজাবাসীদের ইসরায়েলের ভেতর দিয়ে অন্য কোথাও যেতে হলে ইসরায়েলি সরকারের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হতো। গাজা এ রকম এক অবরুদ্ধ বন্দিজীবনের মধ্যে তাদের ঠেলে দিয়েছিল!

আবার ৭ অক্টোবরের আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে মানচিত্রটা দেখিয়েছিলেন, সেখানে গাজা আর পশ্চিম তীর বা ওয়েস্ট ব্যাংকের অস্তিত্ব ছিল না। অন্যদিকে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল বা হচ্ছিল। তাতে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো ফিলিস্তিনিদের এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের আর বোধ হয় গুরুত্ব নেই! এ রকম পরিস্থিতিতে হামাস তো জানতই ইসরায়েলের সামরিক শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যপুষ্ট সামরিক শক্তির তুলনায় তাদের শক্তি কিছুই না। কিন্তু যেখানে তাদের অস্তিত্বহীনতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং তাদের অস্তিত্ব পুনঃপ্রকাশের জন্য, তাদের অস্তিত্ব যে টিকে আছে, সে জন্যই হয়তো বা হামাস যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল। আর এ হামলায় তারা ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়াও দেখতে চেয়েছে।

ঘটনার পরে আমরা এখন যে ব্যাপারটা দেখছি, পিএলওর নেতৃত্বের দুর্বলতায় হামাসকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনের যে স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং তাদের মতাদর্শ, সেটাকে পশ্চিমা গণমাধ্যম মোটাদাগে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করে চলছে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সংগ্রাম একটা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাদের অধিকার আদায় এবং অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামটা এখন একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, বিশেষ করে ৭ অক্টোবর ২০২৩-পরবর্তী ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নিধনের ইসরায়েলি প্রচেষ্টার প্রতিবাদের বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে ওঠা সংহতি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। 

আজকের পত্রিকা: হামাস গঠনে ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকতা আছে বলে কেউ কেউ বলেন। এটা কতটুকু সত্য?
তানজীমউদ্দিন খান: একটা সময় সে আলোচনাটা ছিল। অনেকে এটাকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে প্রচার করলেও ২০১৮ সালে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সাংবাদিক দিনা সাইদাহমেদ ১৯৮০-এর দশকে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক সংবাদের বরাতে জানান, ইসরায়েলি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং গাজার মিলিটারি গভর্নর আইজাক সেগেভ নিজেকে ‘হামাস স্রষ্টা’ বলেছিলেন। তাঁর মাধ্যমে ইসরায়েলি সরকার হামাসকে অর্থায়ন করেছিল সেই সময়। যদিও এটা সর্বজনবিদিত যে হামাস মূলত মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পিএলওর শক্তিকে হ্রাস করার জন্য হামাস তৈরি হয়েছিল। তবে, ইসরায়েলের অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং এই প্রতিবাদকে একটা সংগ্রামের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে হামাসের একটা ভূমিকা আছে। পিএলওর দুর্বল নেতৃত্ব, তাদের দুর্নীতির ইতিহাস এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামাস সরাসরি অবস্থান নেওয়ার কারণে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মাঝে তারা জনপ্রিয় হয়েছে। তাদের জনপ্রিয়তা আছে বলেই তারা গাজায় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হতে পেরেছে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের ইসরায়েলের প্রতি নতজানু হওয়ার কারণেও হামাস এখন একটি প্রতিবাদী সংগঠন হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছে। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের অনাচারের বিরুদ্ধে কেউ যখন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না, অন্য কেউ গড়ে তোলে, তখন তার সমর্থন সে দিকেই যায়। হামাসের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত সেটাই ঘটেছে। এখন তারা কিন্তু একটা স্বকীয় অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। 

আজকের পত্রিকা: দীর্ঘ সময় ধরে ফিলিস্তিনে আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? 
তানজীমউদ্দিন খান: মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা আছে। ১৯৬৮ সালে ভিয়েতনামবিরোধী আন্দোলনও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়েছিল। নিউইয়র্ক শহর তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের একটি প্রকাশ ১৯৮০-এর দশকে আমরা দেখেছি। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এর প্রকাশ ঘটেছিল। এরপর ২০১১ সালে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন সেখানে দেখেছি। ৯৯ শতাংশ বনাম ১ শতাংশের সেই আন্দোলন ছিল। এ ধরনের সব আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

আমি মনে করি, এখনকার যে আন্দোলনটা, সেটা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি ফল। সেই আন্দোলনের অনেক স্লোগান ছিল ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে। তারা সাম্রাজ্যবাদ আর নয়া উপনিবেশবিরোধী অবস্থান থেকে সেই আন্দোলন করেছিল। ইসরায়েল আর যুক্তরাষ্ট্রের যে সম্পর্ক, সেটাকে তারা সাম্রাজ্যবাদী সম্পর্ক হিসেবে দেখে।

এখন সেখানে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সংহতি আন্দোলন হচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের সংগঠক ছিলেন। যাঁদের বয়স তখন ১৮-২০ বছরের ছিল, তাঁদের বয়স এখন ৩৫ থেকে ৩৭-এর মধ্যে। ওই পরিপক্বতায় কিন্তু এখনকার আন্দোলন তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এ কারণে এই আন্দোলনের একটা ভিন্ন প্রকাশ এবং সেটারই একটা ধারাবাহিকতা।

গত এপ্রিলে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এ আন্দোলন ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর থেকে সেখানকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ অক্টোবরকেন্দ্রিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছোট ছোট প্রতিবাদ হচ্ছিল।

সেই সময়ে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন হ্যাভেরফোর্ড কলেজের ফিলিস্তিনের তিন শিক্ষার্থীকে রাস্তা পার হওয়ার সময় গুলি করা হয়। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হাওয়ার্ড ফোর্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান ধর্মঘট করেন। এরপর স্ট্যানফোর্ড থেকে সর্বশেষ গত এপ্রিলে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। 

আজকের পত্রিকা: এই আন্দোলনের ফলে কি পশ্চিমা গণমাধ্যমের ন্যারেটিভের কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন?
তানজীমউদ্দিন খান: মূলধারার পশ্চিমা গণমাধ্যমে বেশির ভাগেই অনেক গোঁড়া ইহুদিদের অর্থলগ্নি আছে এবং ওই গণমাধ্যমগুলো ইসরায়েল রাষ্ট্রের অনুকূলেই ক্রিয়াশীল থাকে। যেমন সিএনএন, বিবিসি, ফক্স, স্কাই, নিউইয়র্ক টাইমসের মতো মূলধারার গণমাধ্যম ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করে। খুব স্বাভাবিকভাবে তারা যে ন্যারেটিভকে সামনে আনে, সেটা কিন্তু বড় একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে; বিশেষ করে ‘অ্যান্টি-স্যামেটিজম’ বা ইহুদিবিদ্বেষের অজুহাত, যা ইসরায়েলবিরোধী ন্যায্য সবকিছুকে হেয় করার জন্য আলোচনায় আনা হয়, সেই প্রবণতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তবে খুব শিগগির মূলধারার পশ্চিমা গণমাধ্যমের বয়ানে পরিবর্তন আসবে, তা নয়। তবে এই আন্দোলনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে। যে কারণে অ্যান্টি-স্যামেটিজমের ইস্যুটাকে আনা হয়, সেটা যে একটা খুব খেলো বিষয় এবং এটা যে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য থেকে করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে এখন অনেকের কাছে। এই আন্দোলন যে ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে একটা মানবিক আবেদনকে সামনে নিয়ে এসেছে, ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন বা জেনোসাইড থেকে সুরক্ষা দেওয়ার দাবিতে। তাই এই আন্দোলন এটা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তাদের অধিকারের পক্ষে পাশে দাঁড়ানো, মানুষ হিসেবে আমাদের সবার দায়িত্ব।

মানবিকতাটাই এই আন্দোলনের বড় বিষয়। বিশ্ব রাজনীতিতে যে একটা প্রজন্মগত বিভক্তি আছে এই মানবিক ইস্যুতে, সেটা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু এবারের ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্দোলন এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিন হত্যা অনলাইন অনেক অপ্রচলিত গণমাধ্যমে এবং ইউটিউবে প্রকাশ এবং প্রচার হওয়ার কারণে তৎক্ষণাৎ সারা বিশ্বের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন অনেক নতুন কিছু জানতে পারছে। সে কারণে মূলধারার অনেক পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রভাব কমে আসছে। 

আজকের পত্রিকা: ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সমস্যা সমাধানের কি কোনো সম্ভাবনা আছে? 
তানজীমউদ্দিন খান: এ সমস্যা সমাধানের জন্য একটা হচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্ব আর একটা হচ্ছে, আরব বিশ্বের ভূমিকা। আরব বিশ্বের অধিকাংশ দেশ গণতান্ত্রিক নয়। এখানে একনায়কতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র চলছে। জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাচন নেই। তারা বংশানুক্রমিকভাবে ক্ষমতাসীন থাকছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তাদের বৈধতা নিশ্চিত করছে। ফলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। সার্বিকভাবে ফিলিস্তিন সমস্যা তাদের মধ্যে কোনো আবেদন তৈরি করে না। এ কারণে পশ্চিমা বিশ্বের অনুকূলে তাদের অবস্থান। এসব দেশই কিন্তু সংকটের মূল। যদিও ব্যতিক্রম ইরান আছে।

কিন্তু এ ধরনের আন্দোলন এবং সংহতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে প্রজন্মগত পরিবর্তনটা হচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী রূপ নেয়, তাহলে এ বিষয়টা ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে। এখন কথা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে গণতান্ত্রিক ধারা শক্তিশালী হবে কি না? আর এখানে গণতান্ত্রিক ধারা শক্তিশালী হলে, তারা পশ্চিমা বিশ্বের চেয়ে নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেবে। তখন কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বকে এদের সঙ্গে নতুনভাবে দর-কষাকষি করতে হবে। এটা হলে পশ্চিমা বিশ্বকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে অনেক ছাড় দিতে হবে। যেটা এখন তারা দিতে প্রস্তুত নয়। 

আজকের পত্রিকা: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 
তানজীমউদ্দিন খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেষ সাক্ষীর জেরা চলছে

বাসস, ঢাকা  
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে সর্বশেষ (৫৪ তম) সাক্ষীর জেরা শুরু হয়েছে। এই মামলাটির বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ।

আজ সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) মো. আলমগীরের জেরা শুরু করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমীর হোসেন। আইনজীবী আমীর হোসেন পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে শুনানি করছেন। এর আগে গত মঙ্গলবার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আলমগীরের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়।

এই মামলার শুনানিতে এর আগে গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক শহীদ আবু সাঈদের বাবাসহ স্বজনহারা পরিবারের একাধিক সদস্য সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া মামলার গুরুত্বপূর্ণ ‘স্টার উইটনেস’ হিসেবে সাক্ষ্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান।

গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকার, তাদের দলীয় ক্যাডার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে বলে অভিযোগ ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।

পরবর্তীকালে, এই মামলার অন্যতম আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদ্‌ঘাটনে রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রোভার) হওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল তাঁর আবেদন মঞ্জুর করলে তিনি রাজসাক্ষী হিসেবে এই মামলায় সাক্ষ্য দেন।

মামলার প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানি করছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম এবং গাজী এসএইচ তামিম। শুনানিতে তাঁদের সঙ্গে অপর প্রসিকিউটররাও উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে, এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে আছেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলা ছাড়াও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে একটি মামলায় আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুম-খুনের ঘটনায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলাটি হলো রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড নিয়ে। এই তিনটি মামলার বিচারকাজই বর্তমানে দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার আশায় সাগরে জেলেরা

  • এবার ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার।
  • গতকাল দিনভর ছিল উপকূলের জেলে পল্লিগুলোতে ব্যস্ততা।
মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে বুধবার রাতে। এর আগে দিনভর সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন জেলেরা। অনেকে দেখে নেন ট্রলার ঠিকঠাক আছে কি না। কেউ আবার জালের ছেঁড়া অংশ সেলাই করেন। ছবিটি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের খুরেরমুখ এলাকার। ছবি: আজকের পত্রিকা
মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে বুধবার রাতে। এর আগে দিনভর সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন জেলেরা। অনেকে দেখে নেন ট্রলার ঠিকঠাক আছে কি না। কেউ আবার জালের ছেঁড়া অংশ সেলাই করেন। ছবিটি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের খুরেরমুখ এলাকার। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘দুই দিন আগেই বাড়ি থেকে পাথরঘাটায় চলে এসেছি। এখন পুরোনো জাল সেলাই করছি। এক সপ্তাহের বাজারও করে এনেছি। আজ বিকেলে সাগর মোহনায় যাব, গভীর রাত থেকে জাল ফেলব।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদরের বাইনচটকী এলাকার জেলে হোসেন আলী। গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

মাছের সুষ্ঠু প্রজনন, উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই মৎস্য আহরণের জন্য সমুদ্রে সব ধরনের মাছ শিকার ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা গতকাল বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে শেষ হয়েছে। তাই গতকাল দিনভর ছিল উপকূলের জেলেপল্লিগুলোতে ব্যস্ততা। অনেকে দেখে নিচ্ছিলেন ট্রলার ঠিকঠাক আছে কি না, কেউ জালের ছেঁড়া অংশ সেলাই করছিলেন, কেউ আবার প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীসহ অন্য সরঞ্জাম গুছিয়ে নিচ্ছিলেন।

বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং ফকিরহাট উপ-মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে গতকাল শত শত ট্রলার নোঙর করে রাখা ছিল। জেলেদের উপস্থিতিতে ঘাট এলাকা সরগরম হয়ে ওঠে। ফকিরহাটের মুদি-মনিহারি দোকানগুলোতে জেলেরা কেনাকাটা করতে ভিড় জমান। ফকিরহাট এলাকার বিসমিল্লাহ ট্রলারের মাঝি রহিম মিয়া বলেন, ‘সাগরে মাছ শিকারে যেতে সকল প্রস্তুতি নিয়েছি। নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হওয়ামাত্রই সাগরে নামব।’

জেলে নুরসাইদ ও ফোরকান মিয়া বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবার-পরিজন নিয়ে বেশ কষ্টে কেটেছে। ওই সময়ে বেশ টাকা ঋণ করেছি। এখন সাগরে যাব। দেখি আল্লাহ ঋণ পরিশোধ করতে দেন কি না।’

নোয়াখালীর হাতিয়ার সূর্যমুখী, বাংলাবাজার, কাজিরবাজার, পাইতান মার্কেট চেয়ারম্যান ঘাটসহ বেশ কয়েকটি ঘাটে গতকাল জেলেদের ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে। অনেকে নৌকায় জাল তুলছিলেন, আবার অনেকে জ্বালানি তেল মজুতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ট্রলারে নিয়ে যান। সূর্যমুখী ঘাটের এমভি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি জাফর উল্যা বলেন, ‘সাগরে ৮-১০ দিন থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সন্ধ্যায় সাগরের উদ্দেশে রওনা দেব।’

সূর্যমুখী ঘাট জেলে সমিতির সভাপতি জবিয়ল হক বলেন, ‘সাগরে নামতে প্রস্তুত নোয়াখালীর হাতিয়ার ২০টি ঘাটের লক্ষাধিক জেলে। এসব ঘাটে প্রায় ১০ হাজার ছোট-বড় ফিশিং ট্রলার রয়েছে। প্রতি ট্রলারে ১০ জন হলেও লক্ষাধিক জেলে এই মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। তাঁদের সবাই গত ৫৮ দিন তীরে বেকার ছিলেন।’

পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলার পাড়েরহাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী এলাকার জেলেরা গতকাল দিনভর সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এ ছাড়া মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা, খেতাচিড়া, বড়মাছুয়া, ছোটমাছুয়া, ভান্ডারিয়া উপজেলার চরখালী, হেতালিয়া, কাউখালী উপজেলার সোনাকুর এলাকার জেলেরা, সদর উপজেলা এবং নেছারাবাদ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার জেলেরা প্রস্তুতি শেষে গত রাতে বঙ্গোপসাগরে রওনা হন।

কয়েক দিন ধরে কক্সবাজার উপকূলের জেলেপল্লিগুলোতে নৌকা, জাল মেরামতসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি সেরেছেন জেলেরা। গতকাল মেরিন ড্রাইভের টেকনাফের খুরেরমুখ, সাবরাং ও বাহারছড়া এলাকায় দেখা গেছে, সড়কে দাঁড় করিয়ে রাখা সারি সারি ট্রলারে জাল ও রসদ তোলেন জেলেরা।

একটি ট্রলারের মাঝি আবু তাহের জানান, এবার ভারতের সঙ্গে মিল রেখে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় কেউ সাগরে মাছ শিকারে নামেনি। এতে উপকূলের কাছাকাছি সাগরে জাল ফেললেই ইলিশসহ অন্য মাছ পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী তিনি।

কক্সবাজার শহরের ফিশারি ঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির পরিচালক জুলফিকার আলী জানান, কক্সবাজার উপকূলে ছোট-বড় ৭ হাজারের মতো যান্ত্রিক ট্রলার রয়েছে। এসব ট্রলারে প্রায় এক লাখ জেলে ও শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। অধিকাংশ ট্রলার নিষেধাজ্ঞা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সাগরে রওনা হবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বরগুনা ও আমতলী, পিরোজপুর, কক্সবাজার এবং হাতিয়া প্রতিনিধি]

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

ভারতের নিষেধাজ্ঞা: স্থলবন্দর থেকে ফেরত আসছে রপ্তানি পণ্য

  • ক্রয়াদেশের চালান নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা
  • সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
  • আজ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডেকেছে জরুরি বৈঠক
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ২০ মে ২০২৫, ০২: ৪৪
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

ভারতের স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞার পর সীমান্তে আটকে থাকা তৈরি পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকগুলো ফেরত আনছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে যেসব ট্রাক বন্দরে ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলো ভারতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ট্রাক ঢুকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।

ভারতের নিষেধাজ্ঞার এক দিন পরই গত রোববার লালমনিরহাটের বুড়িমারী ও যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরে পণ্যের ট্রাক আটকে দেয় ভারত। সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা যায়, রোববার ভারতের আমদানি বিধিনিষেধের কারণে বুড়িমারী সীমান্তে প্রাণের ১৭ ট্রাক খাদ্যপণ্য আটকে যায়। এ ছাড়া বেনাপোলে ৩৬টি পোশাক বোঝাই ট্রাকসহ অন্যান্য পণ্যের শতাধিক ট্রাক ঢুকতে পারেনি।

গতকাল সোমবার পর্যন্ত বুড়িমারী থেকে প্রাণের পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলোর অর্ধেকের বেশি ফেরত নিয়ে আসে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া বেনাপোলে পোর্টের ভেতরে ২৪টি ট্রাক ছাড়া বাকিগুলো ফেরত চলে যায়।

বেনাপোল বন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সাজেদুর রহমান গতকাল সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, গতকাল পোর্টের ভেতর ও বাইরে শতাধিক ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল। আজ পোর্টের ভেতরের ২৪টি ছাড়া বাকিগুলো ফেরত নিয়ে গেছেন মালিকেরা। এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, পোর্টের ভেতরের ট্রাকগুলোও ফেরত নিতে হবে।

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের হাতে ৬ মিলিয়ন ডলারের ক্রয় আদেশ রয়েছে। তার মধ্য থেকে রোববার বুড়িমারী দিয়ে ১৭ ট্রাকবোঝাই পণ্য পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সেগুলো ঢুকতে পারেনি। ট্রাকগুলো ফেরত আনা হচ্ছে। নতুন করে কাগজপত্র তৈরি করে অন্য পথ দিয়ে পণ্য পাঠাতে হবে।’

বেনাপোল স্থলবন্দর সূত্রে জানা যায়, ওই ২৪টি ট্রাক পোর্টের ভেতরে থাকায় এখনো তারা ভারতে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের আশা, যেহেতু নিষেধাজ্ঞার আগে এই পণ্যগুলোর এলসি করা হয়েছিল, তাই এগুলো প্রবেশে অনুমতি পাবে। তবে এটি নির্ভর করবে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনার ওপর।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ইতিমধ্যে অনেক রপ্তানিকারক রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সঙ্গে আলোচনা করে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে।

স্থলবন্দরের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসমূহ এবং আশু করণীয় নির্ধারণে বাণিজ্যসচিবের সভাপতিত্বে আজ মঙ্গলবার আন্তমন্ত্রণালয়ের সভা ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থলবন্দরের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসমূহ এবং আশু করণীয় নির্ধারণে বাণিজ্যসচিবের সভাপতিত্বে বিকেল ৪টায় আন্তমন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হবে।

সভায় নৌপরিবহন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিদের উপস্থিতির জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত শনিবার হঠাৎ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি নিষিদ্ধ করে। শুধু ভারতের নবসেবা ও কলকাতা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে দেশটির আমদানিকারকেরা বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি করতে পারবেন বলে ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম, পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্দা ও ফুলবাড়ী শুল্ক স্টেশন দিয়ে ফল, ফলের স্বাদযুক্ত পানীয়, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য, সুতা, সুতার উপজাত, আসবাব রপ্তানিও নিষিদ্ধ করা হয় ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

আমদানি ও রপ্তানিসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের ২৪টি বন্দরের মধ্যে ১৬টি বন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য হয়ে থাকে। তবে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় বেনাপোল ও ভারতের পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য হয়। এর পরিমাণ ৮০ শতাংশ। বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ভারতে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়। এর মধ্যে শতাধিক ট্রাক পণ্য থাকে তৈরি পোশাক।

এর আগে গত ৮ এপ্রিল বাংলাদেশের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে ভারত। ফলে ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে পারছে না বাংলাদেশ। অন্যদিকে প্রায় এক মাস আগে ভারত থেকে বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির সুযোগ বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে তুলনামূলকভাবে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর। তাই ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখাই সরকারের উচিত বলে মনে করছেন তিনি।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং ভারতের বিরোধপূর্ণ বিষয়সমূহ মিটিয়ে ফেলতে হবে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটাই হবে উভয় দেশের জন্য কল্যাণকর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

নিলামে গৌতম বুদ্ধের রত্নসম্ভার

আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটি হচ্ছে গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক রত্নসম্ভার। গতকাল বুধবার হংকংয়ে বিখ্যাত আর্ট নিলাম কোম্পানি সাদাবি’স-এর এক নিলামে এগুলো তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৮৯৮ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি ধূলিধূসর টিলা খুঁড়ে পাওয়া মূল্যবান এই রত্নগুলো এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে একটি বেসরকারি ব্রিটিশ সংগ্রহাগারে প্রায় দৃষ্টিচক্ষুর আড়ালে ছিল। এখন যেহেতু রত্নগুলোর হাতবদলের সময় এসেছে, তাই নতুন সংগ্রাহকেরা আগ্রহ নিয়ে এগুলো সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু এখানে একটা অস্বস্তিও তৈরি হয়েছে।

গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনীর কাছাকাছি, বর্তমানে ভারতের উত্তর প্রদেশে একটি ইটের ঘরের ভেতর থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মুক্তা, রুবি, টোপাজ, নীলা ও নকশা করা সোনার পাত সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে এই রত্নগুলোর সঙ্গে সঙ্গে একটি খোদাই করা পাত্রে হাড়ের টুকরাও পাওয়া যায়, যেগুলোকে গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষ বলে শনাক্ত করা হয়। এই আবিষ্কার তখন প্রত্নতত্ত্বের জগতে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

সাদাবি’স এশিয়ার চেয়ারম্যান নিকোলাস চাউ মনে করেন, স্মরণকালের বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর মাঝে এই রত্নসম্ভার অন্যতম। তবে এগুলো নিলামে তোলার কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আর তা হচ্ছে—ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এবং বৌদ্ধদের কাছে পবিত্র এই সম্পদ বিক্রি করা কি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?

১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ এস্টেট ম্যানেজার উইলিয়াম ক্ল্যাক্সটন পেপ্পে লুম্বিনির ঠিক দক্ষিণে পিপ্রাওয়ায় অবস্থিত একটি ঢিবি খনন করেন। সেখান থেকেই প্রায় ২ হাজার বছর আগের ওই নির্দশনগুলো খুঁজে পাওয়া যায়।

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাপ্ত রত্নসম্ভার ও দেহাবশেষ, যা তখনো পর্যন্ত অক্ষত ছিল, সেগুলো গৌতম বুদ্ধের শাক্য বংশের এবং বিশ্বব্যাপী বৌদ্ধদের ঐতিহ্য। হাড়ের নিদর্শনগুলো থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোতে বিতরণ করা হয়েছে। এসব দেশে এখনো সেগুলোর পূজা করা হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

সম্পর্কিত