Ajker Patrika

মানুষের মতো প্রাণীরাও কি প্রতিশোধপরায়ণ হয়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৯: ৪০
মানুষের মতো প্রাণীরাও কি প্রতিশোধপরায়ণ হয়
নেকড়ে। ছবি: সংগৃহীত

প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব বেঁচে থাকার কৌশল আছে। কেউ শক্তি দিয়ে, কেউ গতি দিয়ে, আবার কেউ বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের রক্ষা করে। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ বিশ্বাস করে এসেছে, প্রতিশোধ নেওয়ার মতো জটিল অনুভূতি কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা এবং বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে। বিজ্ঞানীরা অবশ্য ‘প্রতিশোধ’ শব্দটি ব্যবহারে সতর্ক। তাঁদের মতে, প্রাণীদের আচরণকে মানুষের আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সব সময় ঠিক নয়। তবু এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে কিছু প্রাণী নিজেদের বা নিজেদের দলের ওপর হওয়া আঘাত দীর্ঘদিন মনে রাখে এবং সুযোগ পেলে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে প্রবৃত্তি আর আবেগের সীমারেখা কোথায় মিলেমিশে যায়, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।

এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে কাক। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান পাখিদের অন্যতম কাক মানুষের মুখ পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, গবেষকেরা বিশেষ মুখোশ পরে কাক ধরেছিলেন এবং তাদের শরীরে চিহ্ন লাগিয়েছিলেন। কয়েক বছর পর একই মুখোশ পরে এলাকায় ফিরতেই কাকগুলো সেই মানুষদের চিনে ফেলে এবং দলবেঁধে আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তারা নিজেদের ছানাদেরও ওই মানুষদের চিনতে শেখায়। অর্থাৎ একটি খারাপ অভিজ্ঞতা পুরো কাকসমাজের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।

হাতির স্মৃতিশক্তির কথা বহুদিন ধরেই পরিচিত। পরিবারভিত্তিক শক্তিশালী সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ এই প্রাণীরা নিজেদের দলের সদস্যের মৃত্যু বা আঘাত সহজে ভুলে যায় না। আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় শিকারিদের হাতে হাতি নিহত হওয়ার পর আশপাশের গ্রাম কিংবা সাফারি গাড়ির ওপর হাতির হামলার একাধিক ঘটনার নথি রয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি হয়তো পরিকল্পিত প্রতিশোধ নয়, তবে অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া।

শিম্পাঞ্জি ও অন্যান্য প্রাইমেটদের সমাজও বিস্ময়করভাবে জটিল। দলগত বিরোধ, জোট গঠন, পক্ষ পরিবর্তন কিংবা পূর্বের অপমানের প্রতিশোধমূলক আচরণ তাদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়। কোনো সংঘর্ষে যে সদস্য নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত মনে করে, সে পরবর্তী সময়ে সুযোগ বুঝে প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এই সামাজিক আচরণ অনেকাংশেই মানুষের রাজনীতি বা অফিস সংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি সাইবেরীয় বাঘকে ঘিরে। বন্যপ্রাণী বিষয়ক বিভিন্ন সূত্রে প্রচলিত একটি ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়, এক শিকারির গুলিতে আহত হওয়ার পর একটি বাঘ সেই শিকারির কেবিন পর্যন্ত অনুসরণ করেছিল। শুধু তাই নয়, বাঘটি সেই কেবিন ধ্বংস করেছিল এবং শিকারি ফিরে এলে তাঁকে হত্যাও করে। বিস্ময়করভাবে বাঘটি শিকারিকে মেরে ফেলার পর তাঁকে খেয়ে ফেলেনি। যদিও ঘটনাটি কিংবদন্তির পর্যায়ে রয়েছে এবং এর প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন, তবু এটি প্রাণীদের স্মৃতি ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনায় বারবার উঠে আসে।

কেপ মহিষও ভয়ংকর প্রতিক্রিয়াশীল প্রাণী হিসেবে পরিচিত। আহত সিংহকে পরে গিয়ে পিষে ফেলা কিংবা আগে আক্রমণকারী শিকারির ওপর তাদের হামলা চালানোর বহু বর্ণনা রয়েছে। একইভাবে সিংহও নিজের শাবক বা দলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।

নেকড়ের ক্ষেত্রেও এমন আচরণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের বাহরাইচে একের পর এক নেকড়ে হামলার পর এক বন কর্মকর্তা ধারণা দেন—অতীতে মানুষের আক্রমণে শাবক বা আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেই নেকড়েরা মানুষকে টার্গেট করে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকতে পারে। যদিও এই বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাননি।

শুধু বড় স্তন্যপায়ী নয়, অক্টোপাসও অসাধারণ স্মৃতিশক্তির পরিচয় দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাকুয়ারিয়ামে থাকা ‘ট্রুম্যান’ নামের একটি অক্টোপাস নাকি অপছন্দের এক স্বেচ্ছাসেবককে দেখলেই পানি ছুড়ে মারত, এমনকি কয়েক সপ্তাহ পর দেখা হলেও। অন্যদিকে উটের ক্ষেত্রেও নির্যাতনকারী মালিকের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

তবে সব আলোচিত ঘটনাই যে প্রতিশোধের উদাহরণ, তা নয়। সম্প্রতি আটলান্টিক মহাসাগরে অরকা তিমির ইয়টের সঙ্গে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাকে অনেকে প্রতিশোধ বলে প্রচার করলেও সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি সম্ভবত খেলাধুলা বা দলগত কোনো আচরণ, মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়।

প্রকৃতির এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রাণীরা কেবল প্রবৃত্তির যন্ত্র নয়; তাদের স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং অভিজ্ঞতা থেকে শেখার ক্ষমতা রয়েছে। তারা মানুষের মতো প্রতিশোধপরায়ণ কি না, সেই বিতর্ক চলতেই পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রাণীদের প্রতি মানুষের আচরণ তারা অনেক সময়ই মনে রাখে। তাই প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো সহমর্মিতা, সংযম এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত