Ajker Patrika

এএফপির প্রতিবেদন /দেশে অটোরিকশার ব্যাটারি-মোটরের বাজার সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা, বিষ ছড়াচ্ছে সিসা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৫, ০৭: ১৯
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

জুনায়েদ আকতার। ১২ বছর বয়সী এক বালক। তার শরীরে বিষাক্ত সিসা এমনভাবে মিশে গেছে যে, তার শারীরিক বৃদ্ধি থমকে গেছে। দেখলে মনে হয়, তার প্রকৃত বয়সের চেয়ে সে যেন আরও কয়েক বছরের ছোট। জুনায়েদ দক্ষিণ এশিয়ার সেই সাড়ে তিন কোটি শিশুর একজন, যারা বিপজ্জনকভাবে উচ্চ মাত্রার সিসা দূষণের শিকার। আশঙ্কার বিষয় হলো, এই সংখ্যাটি দক্ষিণ এশিয়ার মোট শিশুর প্রায় ৬০ শতাংশ।

জুনায়েদের শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাওয়ার কারণ বহুবিধ। তবে, তার মা এই অসুস্থতার জন্য দায়ী করেন সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি কারখানাকে। কারখানাটিতে পুরোনো গাড়ির ব্যাটারি তাড়াহুড়ো করে ভাঙত এবং ভাঙা লেড ব্যাটারির বিভিন্ন অংশকে নানাভাবে পুনর্ব্যবহার করত। এই কারখানাটি জুনায়েদের ছোট্ট গ্রামের বাতাস ও মাটি বিষাক্ত করে তুলেছিল।

জুনায়েদের মা বিথি আকতার এএফপিকে বলেন, ‘রাতে (ব্যাটারির পরিত্যক্ত অংশ পোড়ানো) শুরু হতো, আর পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ভরে যেত। শ্বাস নিলে একটা বিশেষ গন্ধ পাওয়া যেত। এর ফলে, এলাকার গাছে মৌসুমি ফলও আর ধরত না। একদিন, আমার খালাতো বোনের বাড়িতে দুটো মরা গরুও খুঁজে পেয়েছিলাম—এই দূষণের কারণে।’

পরীক্ষায় দেখা গেছে, জুনায়েদের রক্তে সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণেরও বেশি। এই বিষয়টি শিশুদের মধ্যে মারাত্মক এবং সম্ভবত অপরিবর্তনীয় মানসিক দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে। বিথি বলেন, ‘ক্লাস টু থেকেই সে আর আমাদের কথা শুনতে চাইত না, স্কুলে যেতে চাইত না।’ বিথি যখন কথা বলছিলেন, ঠিক সে সময়টিতে জুনায়েদ তাঁর পাশে বসে তাদের বাড়ির উঠোনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। বিথি জানান, ছোট বেলায় জুনায়েদ ‘সব সময়ই কান্না করত।’

বাংলাদেশে সিসা দূষণ নতুন কোনো ঘটনা নয় এবং এর কারণও অনেক। এর মধ্যে রয়েছে—সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও রঙে এই ভারী ধাতুর ব্যাপক ও অব্যাহত ব্যবহার। এমনকি হলুদের গুঁড়োতেও এটি ব্যবহার করা হয় কথিত ‘রং ও গুণগত মান বাড়ানোর’ জন্য।

অনেক ক্ষেত্রেই এর জন্য দায়ী করা হয় অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার কারখানাগুলোকে। দেশজুড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য যানে ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে এসব কারখানা দেশজুড়ে গজিয়ে উঠেছে।

বিপজ্জনক মাত্রার সিসার সংস্পর্শে আসা শিশুদের বুদ্ধি ও অবধারণগত (কগনিটিভ) কার্যকারিতা হ্রাস, রক্তাল্পতা, বামনত্ব এবং আজীবন স্নায়বিক রোগের ঝুঁকিতে থাকে। জুনায়েদদের গ্রামের কারখানাটি স্থানীয়দের অব্যাহত অভিযোগের পর বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবেশবাদী সংস্থা পিউর আর্থ মনে করে, দেশে এ ধরনের আরও ২৬৫টি কারখানা থাকতে পারে। সংস্থাটির মিতালি দাস এএফপিকে বলেন, ‘তারা পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে সিসা বের করে এবং তা গলিয়ে নতুন ব্যাটারি তৈরি করে। তারা এই প্রক্রিয়ার পুরোটাই সম্পন্ন করে খোলা আকাশের নিচে। এই কার্যক্রমের সময় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও অ্যাসিড মিশ্রিত পানি বাতাস ও মাটি ও পানি দূষিত করে।’

রাজধানী ঢাকা থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ ফুলবাড়িয়া। গ্রামটি রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরে অবস্থিত। গ্রামটিতে চীনা মালিকানাধীন আরেকটি ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। একপাশে সবুজ ধানখেত। অন্যদিকে, একটি পাইপ দিয়ে ঘোলাটে পানি মৃতপ্রায় জমির পাশে একটি লবণাক্ত পুকুরে গিয়ে পড়ছে। এই জমিটি পুরু কমলা কাদায় ঢাকা।

সিসা দূষণের ফলে পানি কমলার মতো হয়ে আছে। ছবি: এএফপি
সিসা দূষণের ফলে পানি কমলার মতো হয়ে আছে। ছবি: এএফপি

স্থানীয় বাসিন্দা ও ৩৪ বছর বয়সী প্রকৌশলী রাকিব হাসান এএফপিকে বলেন, ‘ছোটবেলায় যখন বাবা মাঠে থাকত, তখন আমি তাঁর জন্য খাবার নিয়ে যেতাম। চারপাশটা ছিল মনোরম, সবুজ, পানি ছিল স্বচ্ছ। কিন্তু এখন দেখুন, এটা কেমন দেখাচ্ছে। এটা মৃত, চিরদিনের জন্য মরে গেছে। তারা আমাদের গ্রামটাকে মেরে ফেলেছে।’

রাকিব হাসান কারখানার দূষণের অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, যার ফলে বিচারক সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেন। তবে পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। রাকিব হাসান বলেন, ‘কারখানাটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কিনে ফেলেছে। আমাদের দেশ গরিব, অনেক মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত।’

কোম্পানি বা ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস কেউই কারখানার কার্যক্রমের বিষয়ে এএফপির মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। বাংলাদেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কারণ বিষয়টি এখনো আদালতে বিচারাধীন।

তবে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বৈদ্যুতিক ব্যাটারির অবৈধ উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করি। তবে এই প্রচেষ্টাগুলো প্রায়শই এই ঘটনার ব্যাপ্তির তুলনায় অপ্রতুল।’

বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার একটি ক্রমবর্ধমান ব্যবসা। এর প্রধান কারণ হলো—ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাপক প্রসারণ। বড় শহর ও গ্রামীণ জনপদে আগে জনপ্রিয় এই রিকশাগুলো প্যাডেলচালিত ছিল। বাংলাদেশের রাস্তায় ৪০ লাখের বেশি রিকশা চলাচল করে এবং কর্তৃপক্ষের অনুমান, সেগুলোতে বৈদ্যুতিক মোটর ও ব্যাটারি লাগানোর বাজার প্রায় ৮৭০ মিলিয়ন ডলারের বা ১০ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার।

এই বিষয়ে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের মায়া ভ্যানডেনান্ট বলেন, ‘পুরোপুরি বিদ্যুৎ পরিচালিত যানের দিকে যাওয়ার এটাই খারাপ দিক।’ ইউনিসেফ কঠোর নিয়মকানুন ও কর প্রণোদনার মাধ্যমে এই শিল্পকে পরিচ্ছন্ন করার কৌশল নিয়ে কাজ করছে।

মায়া ভ্যানডেনান্ট বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষই এর বিপদ সম্পর্কে অবগত নয়।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতির ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষতি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মুহাম্মদ আনোয়ার সাদাত সতর্ক করে বলেন, দেশ এই সমস্যার ব্যাপকতা উপেক্ষা করতে পারে না। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা কিছু না করি। আগামী দুই বছরে (সিসা বিষক্রিয়ায়) আক্রান্তের সংখ্যা তিন থেকে চারগুণ বাড়বে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুলের খ্রিষ্টীয় নববর্ষের বাণী প্রত্যাহার করেছে বিএনপি

এনইআইআর চালু করায় বিটিআরসি ভবনে মোবাইল ব্যবসায়ীদের হামলা-ভাঙচুর

‘আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াতে আসেন, দায়দায়িত্ব আমাদের’

কাজী নজরুলের ‘বিদায় বেলায়’ কবিতায় দাদিকে স্মরণ জাইমা রহমানের

ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভের মুখে মোবাইল ফোনের শুল্ক ও কর কমাল সরকার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত