Ajker Patrika

ইউআইইউ মার্স রোভার: এশিয়া পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউআইইউ মার্স রোভার: এশিয়া পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ
ইউআইইউ মার্স রোভার দলের সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে একটি দেশের অগ্রগতি শুধু অর্থনীতি কিংবা অবকাঠামোর ওপর নয়; নির্ভর করে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা, গবেষণার সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠার সামর্থ্যের ওপর। সেই সক্ষমতারই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’ দল। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি) ২০২৬-এ বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ার সেরা দল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে তারা বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় তুলে ধরেছে।

ইউআইইউ সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিকস (সিএআইআর) পরিচালিত এই দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য মার্স সোসাইটি আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি) ২০২৬-এ অংশ নিয়ে বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান পেয়েছে। এই অর্জন বাংলাদেশের জন্য এক গৌরবময় মাইলফলক। এশিয়ার ২০ বছরের রোভার প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এটি অনন্য সাফল্য। একই সঙ্গে ইউআরসির ২০ বছরের অন-সাইট প্রতিযোগিতার ইতিহাসে কোনো এশীয় দলের প্রথমবারের মতো পোডিয়ামে ওঠার ঘটনাও এটি।

গত ২৭ থেকে ৩০ মে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের হ্যাঙ্কসভিলে অবস্থিত মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অসাধারণ দক্ষতা ও ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে ইউআইইউ দল ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার এশিয়ার সেরা রোভার দল হওয়ার কৃতিত্ব ধরে রাখে।

একটি মার্স রোভার নির্মাণ শুধু যন্ত্র তৈরির কাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মতো জটিল ক্ষেত্র। এই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করে ইউআইইউ মার্স রোভার দল। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষণামুখী পরিবেশ, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং শিক্ষার্থীদের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে দলটি আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

চার দিনব্যাপী প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, চরম পরিবেশে কার্যক্রম পরিচালনা এবং যন্ত্রপাতি সার্ভিসিং—এই চার কঠিন মিশন সম্পন্ন করতে হয়। ইউআইইউ মার্স রোভার সফলভাবে সব মিশন সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক বিচারকদের প্রশংসা পায়।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইউআইইউ দল ৪০৪.৪৪ পয়েন্ট অর্জনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থান লাভ করে। প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ৪৬৯.৫৭ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন এবং অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ নোভা রোভার ৪১২.৪১ পয়েন্ট নিয়ে রানারআপ হয়। শুধু সামগ্রিক অবস্থানেই নয়, ইউআইইউ দল ‘বেস্ট অটোনোমাস সিস্টেম’ স্বীকৃতিও অর্জন করেছে। রোভার প্রযুক্তিতে স্বয়ংক্রিয়তা বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি। এটিতে কোনো মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই পরিবেশ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে হয়।

বিশ্বের ১১৬ বিশ্ববিদ্যালয় দল প্রাথমিকভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও বিভিন্ন ধাপের মূল্যায়ন শেষে মাত্র ৩৮টি দল চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, ভারত, পোল্যান্ড, তুরস্ক, মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেরা দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ইউআইইউ নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

ইউআইইউ মার্স রোভার দলের পরামর্শক ছিলেন ইউআইইউ স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক ড. হাসান সারওয়ার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. সুমন আহমেদ। মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইউআইইউ কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসাইন। ৯ সদস্যের দলের নেতৃত্ব দেন শাইফ আল শাদ। দলের অন্য সদস্যরা হলেন সিনিয়র লিড মো. মোসফিকুর রহমান, কো-টিম লিড শেখ সাকিব হোসেন, মেকানিক্যাল টিম লিড সিয়াম ইবনে সারওয়ার, অটোনমাস টিম লিড মো. সালমান কবির চৌধুরী, সায়েন্স টিম লিড আয়েশা আক্তার সায়মা, কমিউনিকেশন টিম লিড সাব্বির আহমেদ, মেকানিক্যাল টিম মেম্বার মো. মিমতিয়াজে ইসলাম হিমেল এবং কমিউনিকেশন টিম মেম্বার মোহাম্মদ তাম্মায়।

এই সাফল্যের পেছনে যেমন রয়েছে শিক্ষার্থীদের মেধা, অধ্যবসায় আর উদ্ভাবনী চিন্তা, তেমনি রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। শিক্ষার্থী, পরামর্শদাতা, ফ্যাকাল্টি সদস্য এবং সমর্থকদের সম্মিলিত নিষ্ঠা, উদ্ভাবন আর অধ্যবসায়ের ফলই আজকের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

বাংলাদেশের তরুণদের এই সক্ষমতা যে বিশ্বমানের প্রযুক্তি এবং গবেষণার অঙ্গনে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মার্স রোভারের এই অর্জন তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত