Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

হার্ভার্ডে ভর্তির যোগ্যতা কী জানালেন আসিফ মোক্তাদির

আব্দুর রাজ্জাক খান
হার্ভার্ডে ভর্তির যোগ্যতা কী জানালেন আসিফ মোক্তাদির

সিলেটে বেড়ে ওঠা আসিফ মোক্তাদির উন্নত শিক্ষার স্বপ্নে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। বাফেলো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে প্রথম সেমিস্টারে তাঁর জিপিএ ছিল মাত্র ২.৬৭। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়েও ছিলেন অনিশ্চয়তায়। সেই আসিফ এখন হার্ভার্ডে স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে পড়ছেন। আজকের পত্রিকার পডকাস্ট ‘সফল যাঁরা, কেমন তাঁরা’য় অতিথি হিসেবে নিজের সংগ্রাম আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক খান।

প্রথমে জানতে চাই, সিলেট থেকে সুদূর আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা আপনার কেমন ছিল?

পারিবারিক ভিসায় আমেরিকা যাওয়ার সময় কল্পনাও করিনি যে হার্ভার্ডে পড়তে পারব। দেশে উচ্চমাধ্যমিকের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে তিন সেমিস্টার পড়েছিলাম। আমেরিকায় গিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হলো, এর জন্য অনেক মনোবল দরকার। বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে স্নাতক শেষ করে ফিজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েট স্টাডিজে মাস্টার্স করি, পরে মেডিকেল সায়েন্সে ডক্টরেট। চিকিৎসাকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে মনে হলো, রোগীদের আরও ভালো সেবা দিতে হলে আরও উচ্চতর ডিগ্রি দরকার। নিজেকে যাচাই করতে কলাম্বিয়া ও হার্ভার্ডে আবেদন করি। দুটোতেই সুযোগ পেয়ে অবাক হয়েছিলাম। অনেক ভেবে হার্ভার্ড বেছে নিই।

আপনি বলেছেন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

প্রথমটি পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব। দেশের তিন সেমিস্টারের ক্রেডিট কীভাবে ট্রান্সফার হবে, কোথায় যোগাযোগ করব, আমেরিকার ভর্তিপ্রক্রিয়া কী, টিউশন ফি কীভাবে দেব—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। দ্বিতীয়টি খরচ। আর অভিবাসীদের বড় সমস্যা ভাষা, কারণ আমরা বাংলায় অভ্যস্ত।

পড়াশোনার খরচ কীভাবে চালিয়েছেন? কোনো কাজ করার প্রয়োজন হয়েছিল?

আমি খুবই ভাগ্যবান যে স্নাতকে সরকারি সহায়তা পেয়েছিলাম। তাই নিজের পকেট থেকে খুব বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। মাস্টার্স ও ডক্টরেটের সময় ঋণ নিয়েছি, যা ধীরে ধীরে শোধ করব। আমি কফি শপে কাজ শুরু করেছি, তবে টিউশন ফি দেওয়ার জন্য নয়, নিজের খরচ আর পরিবারকে কিছুটা সাহায্য করার জন্য। আমেরিকায় এটি খুবই স্বাভাবিক। অধ্যাপকের সন্তানেরাও রেস্টুরেন্ট বা রিটেইল স্টোরে কাজ করেন। আমার ইউনিভার্সিটির অ্যাডভাইজারও কফি শপে কাজ করতেন।

আপনি কফি শপে কাজ করেছেন, মজার কোনো স্মৃতি মনে আছে?

আমি খুব ফাঁকিবাজ ছিলাম। বেলা দুইটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দ্বিতীয় শিফটে কাজ করতাম, তখন শ্রীলঙ্কান ম্যানেজার থাকতেন না। আমি স্টোরের পেছনে বসে ফোন চালাতাম, ময়লা ফেলতে গিয়ে বাইরে বেশি সময় কাটাতাম। সহকর্মীরা মিলে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করে ভেতরে বসে খেতাম, যা সেখানে অনুমোদিত ছিল না।

আমেরিকায় গিয়ে প্রথম বাফেলো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন। অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আমি দেশে তিন সেমিস্টার সম্পন্ন করে, সেখান থেকে প্রায় ৩৫ ক্রেডিট ট্রান্সফার করতে পেরেছিলাম, তাই চার বছরের জায়গায় তিন বছরে স্নাতক শেষ করি। বিশ্ববিদ্যালয় বাসার কাছে ছিল, টিউশন ফিও তুলনামূলক কম। শুরুতে ক্লাসে ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে ভয় পেতাম, ভুল হলে শিক্ষক-সহপাঠীরা কী ভাববে। পেছনে চুপচাপ বসে থাকতাম। পরে বুঝলাম, প্রশ্ন না করলে আর না মিশলে এগোনো যাবে না। তখন ইংরেজি বলার চর্চা শুরু করি, প্রশ্ন করি, গ্রুপ স্টাডি করি। এতে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানতে পারি।

বাফেলো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে প্রথম সেমিস্টারে জিপিএ ২.৬৭ পেয়েছিলেন। এরপর টানা তিনবার ডিনস অ্যাওয়ার্ড পেলেন। ঘুরে দাঁড়ালেন কীভাবে?

শুধু ফাঁকিবাজি নয়, সিদ্ধান্তের ভুলও ছিল। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিস্টারে ২০-২২ ক্রেডিট নিতাম। আমেরিকায় সাধারণত ১২, ১৫ বা ১৮ ক্রেডিট নেয়, সেটা বুঝিনি। জেদ করে অনেক কঠিন কোর্স নিয়েছিলাম। ভাষার ভয়, নতুন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা আর লাইফস্টাইল ব্যালান্স—সব মিলিয়ে কঠিন হয়ে পড়েছিল। ড্রপআউট করতে চাইনি, কোনোমতে পাস করার চেষ্টা করেছি।

প্রথম সেমিস্টারের ফল দেখে মনে হয়েছিল পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব কি না। কিন্তু এত কষ্ট করে এসে সুযোগ হেলায় হারাতে চাইনি। ছোটবেলার স্বপ্ন, মা-বাবার স্বপ্ন—সবই মাথায় ছিল। আমি নিয়মিত অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, আমেরিকান বন্ধুদের কাছে তাদের স্টাডি মেথড জানতে চাই, তারা কীভাবে পড়ে তা দেখি। এভাবে একটা ধারা পেয়ে যাই, তারপর তিনটি ডিনস অ্যাওয়ার্ড পাই।

হার্ভার্ডে কখন, কীভাবে আবেদন করলেন?

স্নাতকের পর ফিজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েট স্টাডিজে মাস্টার্স করি, যে ডিগ্রি দিয়ে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রোগী দেখা, প্রেসক্রিপশন লেখা ও ডায়াগনস্টিক টেস্ট অর্ডার করা যায়। এরপর মেডিকেল সায়েন্সে ডক্টরেট শেষ করে হার্ভার্ডে আবেদন করি। এখন পাবলিক হেলথে প্রথম সেমিস্টারে পড়ছি।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও সুযোগ পেয়েছিলেন, হার্ভার্ড কেন বেছে নিলেন?

আমার লক্ষ্য ছিল আইভি লিগে পড়া। কলাম্বিয়ার ফল আগে আসে, তাতে আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। তবে আবেদনের সময়ই ঠিক করেছিলাম, হার্ভার্ডে না হলে আর পড়ব না। বোস্টন শহর আমার পছন্দ, হার্ভার্ডের ব্র্যান্ড ভ্যালু আর বিশ্বজোড়া অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক আছে। বড় বড় বিজ্ঞানী ও বিখ্যাত ব্যক্তি সেমিনার করতে আসেন। আরেকটা বড় কারণ ক্রস-রেজিস্ট্রেশন: পাবলিক হেলথে পড়েও বিজনেস স্কুল, মেডিকেল স্কুল, এমনকি এমআইটিতেও ক্লাস নেওয়া যায়।

বাংলাদেশের তরুণেরা হার্ভার্ডে পড়তে চাইলে কীভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেন?

আমি মাস্টার্সের কথা বলতে পারি। এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ, স্নাতকের সিজিপিএ, স্টেটমেন্ট অব পারপাস আর রেকমেন্ডেশন লেটার ভালো রাখতে হয়। হার্ভার্ড শুধু জিপিএ দেখে না, দেখতে চায় আপনি কেন নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়তে চান।

একটি ভালো স্টেটমেন্ট অব পারপাস বা এসওপিতে কী কী উপাদান থাকা দরকার?

আমরা অনেকে এক সপ্তাহ বা এক মাস আগে লেখা শুরু করি। অনেকে চার-ছয় মাস আগে শুরু করার পরামর্শ দেন। আমি বলব, যত আগে সম্ভব লেখা শুরু করা উচিত। কারণ বারবার এডিট করতে হয়। অ্যাডমিশন রিভিউ কমিটি আপনাকে চেনে না, এসওপিই তাদের কাছে আপনাকে পরিচয় করানোর একমাত্র মাধ্যম। এআই বা অনলাইন টেমপ্লেট কপি করলে চলবে না, কারণ আপনার কারণ আর আমার কারণ আলাদা। জীবনের কোন ঘটনা আপনাকে এই বিষয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছে, সেই গল্প তুলে ধরতে হবে। সিজিপিএ কম থাকলে সংক্ষেপে কারণ উল্লেখ করা যায়। ‘আমি খুব পরিশ্রমী, মানুষকে সাহায্য করতে চাই’ ধরনের জেনেরিক লেখা হলে হবে না। এমনভাবে লিখতে হবে, যেন রিভিউ কমিটি বলেন, ‘এই শিক্ষার্থীকে আমি আমার বিভাগে চাই।’

রেকমেন্ডেশন লেটার কার কাছ থেকে নেবে, খ্যাতিমান অধ্যাপক নাকি, যিনি পরিচিত?

আমার মতে, যিনি আপনাকে ভালোভাবে চেনেন। খ্যাতিমান অধ্যাপক আপনাকে না চিনলে জেনেরিক চিঠি লিখবেন, এমন হাজার হাজার চিঠি কমিটির কাছে থাকে। যিনি চেনেন, তিনি আপনার গবেষণা, দুর্বলতা কীভাবে কাটিয়েছেন, শক্তির জায়গা আর পাঁচ বছর পর আপনি কোথায় থাকতে পারেন, সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারবেন। আর অবশ্যই অনেক আগে অনুরোধ করতে হবে, কারণ অধ্যাপকেরা ব্যস্ত থাকেন।

হার্ভার্ডে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের বৃত্তি আছে?

হার্ভার্ড অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিভাগ অনুযায়ী নিজস্ব স্কলারশিপ দেয়, তবু বাকি অঙ্ক বেশ বড় থাকে। ভর্তির পর ফাইন্যান্সিয়াল এইড অফিসে যোগাযোগ করলে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের বৃত্তির তালিকা পাঠায়। অনেক বৃত্তির অঙ্ক কম, কিন্তু কয়েকটিতে আবেদন করলে টিউশন অনেক কমে আসে। বাংলাদেশ থেকে আবেদনের ক্ষেত্রে আমার ধারণা সীমিত, কারণ আমি আমেরিকা থেকে আবেদন করেছিলাম।

হার্ভার্ডে এক্সট্রা কারিকুলারের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্ব পায়?

এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেকগুলোতে জড়িয়ে সব উল্লেখ করা ভুল বলে আমি মনে করি। এতে মনে হয় আপনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল নেই, এক থেকে আরেকটিতে লাফিয়েছেন। যে বিষয়ে পড়বেন, তার সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ করুন, যেমন অলিম্পিয়াড, ডিবেট, কোডিং প্রতিযোগিতা বা বই লেখা। নাচ-গান শখের জায়গা থেকে করতেই পারেন, তবে মূল ফোকাস ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে হওয়া উচিত।

আপনি কী ধরনের এক্সট্রা কারিকুলারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?

লেখালেখি পছন্দ করি, ২০২২ ও ২০২৩ সালের বইমেলায় আমার দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। রেফারেলের পর অনেক রোগী ভাষাগত বা অন্য কারণে ফলোআপ করে না। তাদের সাহায্যে ‘রেফারেল অ্যাসিস্ট’ নামে একটি নন-প্রফিট সংগঠন পরিচালনা করি, যেখানে স্বেচ্ছাসেবকেরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে ও মনে করিয়ে দিতে সাহায্য করে। আরেকটি নন-প্রফিট ‘অ্যাচিভ’-এর লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার বাছাইয়ে সেমিনার আয়োজন। সাংবাদিকতাও করেছি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত