Ajker Patrika

এমআইটির শিক্ষাভান্ডারে শিক্ষার্থীদের জন্য দুর্লভ সুযোগ

ড. মশিউর রহমান
এমআইটির শিক্ষাভান্ডারে শিক্ষার্থীদের জন্য দুর্লভ সুযোগ

বিশ্বের প্রথম সারির সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম দিকেই রয়েছে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। বহু নোবেলজয়ী, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান থেকে। এলিট এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা অনেক শিক্ষার্থীরই জীবনের একটি দুর্লভ সুযোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঢাকার এক সাধারণ কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, কিংবা রংপুর বা বরিশালের কোনো মফস্বলের ছাত্র তাঁদের জীবনে এমআইটির কী প্রভাব থাকতে পারে? এর উত্তরটি লুকিয়ে রয়েছে এমআইটির উন্মুক্ত শিক্ষানীতিতে।

২০০১ সালে এমআইটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা তাদের কোর্সের সব তথ্য অনলাইনে বিনা মূল্যে উন্মুক্ত করে দেবে। এই উদ্যোগের নাম এমআইটি ওপেনকোর্সওয়ার। লেকচার নোট, সিলেবাস, অ্যাসাইনমেন্ট, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ভিডিও লেকচার—সবকিছুই বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। এটি শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়; এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি। জ্ঞানকে পণ্য নয়, বরং মানবজাতির যৌথ সম্পদ হিসেবে দেখার একটি ঘোষণা। এ ঘোষণা দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটা দুর্লভ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত।

মানসম্মত শিক্ষার সমান সুযোগ

বাংলাদেশে এখনো মানসম্মত উচ্চশিক্ষা সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য নয়। রাজধানী ও বড় শহরের বাইরে অনেক শিক্ষার্থী উন্নত ল্যাব, আপডেটেড সিলেবাস বা আন্তর্জাতিক মানের লেকচারের সুযোগ পায় না। এমআইটির উন্মুক্ত কোর্স এ বৈষম্য কমাতে পারে। ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী মেশিন লার্নিং শিখতে চায়। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো বিষয়টি সীমিতভাবে পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এমআইটির অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে সে বিশ্বমানের পাঠ্যসামগ্রী হাতে পেতে পারে, যা একই সঙ্গে গবেষণাভিত্তিক ও আপডেটেড। এতে তার শেখার পরিসর আর দেশের সীমায় আটকে থাকে না।

আত্মশিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তোলা

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো পরীক্ষানির্ভর মানসিকতা প্রবল। কিন্তু এমআইটির ওপেন কোর্স শিক্ষার্থীদের শেখায়, শেখা মানে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়; বরং সমস্যা বোঝা ও সমাধান করা। এই উন্মুক্ত রিসোর্স ব্যবহার করতে গেলে শিক্ষার্থীকে নিজে থেকে পরিকল্পনা করতে হয়, সময় ব্যবস্থাপনা করতে হয় এবং নিজের অগ্রগতি নিজেই মূল্যায়ন করতে হয়। এটি আত্মশিক্ষার বা নিজে নিজে শেখার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।

গবেষণার মান উন্নয়ন

দেশে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছে, কিন্তু তাঁদের গবেষণার মান সব সময় আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছায় না। এর একটি বড় কারণ হলো উন্নত কোর্স ও গবেষণাধর্মী উপকরণের অভাব। এমআইটির ওপেনকোর্সওয়্যার শুধু তাত্ত্বিক পাঠ নয়; অনেক কোর্সে গবেষণাপদ্ধতি, প্রকল্পভিত্তিক কাজ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের মডেল দেওয়া থাকে। একজন শিক্ষার্থী যদি এগুলো অনুসরণ করে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস বা প্রজেক্ট তৈরি করে, তাহলে তার কাজের গভীরতা ও মান স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।

প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থান

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি দক্ষতা কর্মসংস্থানের অন্যতম চাবিকাঠি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবোটিক, বায়োটেকনোলজি—এসব ক্ষেত্রে এমআইটির কোর্সগুলো অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের তরুণেরা যদি নিয়মিতভাবে এসব কোর্স অনুসরণ করেন, তবে তাঁরা শুধু স্থানীয় চাকরির বাজারে নয়, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং বা রিমোট কাজের ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারেন। বিশ্বায়নের যুগে দক্ষতাই মূল পুঁজি। আর এমআইটির উন্মুক্ত জ্ঞানভান্ডার সেই পুঁজির পথ খুলে দেয়।

শিক্ষকদের জন্যও নতুন দিগন্ত

এ সুবিধা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়; দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকেরাও এমআইটির সিলেবাস ও শিক্ষণপদ্ধতি দেখে নিজেদের কোর্স আপডেট করতে পারেন। এতে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানও উন্নত হতে পারে। উন্মুক্ত শিক্ষার এই চর্চা যদি প্রতিষ্ঠানগতভাবে উৎসাহিত করা হয়, তাহলে একটি সমন্বিত উন্নয়ন সম্ভব।

কিন্তু চ্যালেঞ্জ কোথায়? অবশ্যই কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগ, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা (সব কোর্স ইংরেজিতে) এবং আত্মশৃঙ্খলার অভাব—এসব বড় বাধা। তবে এগুলো অতিক্রমযোগ্য। যদি স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো হয় এবং শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও প্রযুক্তি দক্ষতা উন্নত করা হয়, তাহলে এমআইটির উন্মুক্ত রিসোর্স বাংলাদেশের জন্য সত্যিকারের এক শিক্ষাবিপ্লব হয়ে উঠতে পারে।

কোর্সগুলো দেখতে ভিজিট করুন এখানে

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত