Ajker Patrika

সামিরার যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন জয়

আনিসুল ইসলাম নাঈম
আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৯: ০৮
সামিরার যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন জয়
সামিরা।

সামিরা সুলতানা ঢাকার মেয়ে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সম্প্রতি তিনি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট কলেজে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। ‘লিটল আইভিস’ নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের এই খ্যাতনামা লিবারেল আর্টস কলেজে তিনি পড়বেন কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে। তাঁর সাফল্যের গল্প লিখেছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম

পরিবারে দুই ভাই-বোনের মধ্যে ছোট সামিরা। তিনি প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করেছেন। শেখার প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। ছোটবেলায় ভাবতেন, বইয়ের বাইরেও শেখার অনেক কিছু রয়েছে। তাই খেলা, প্রতিযোগিতা বা নতুন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া করতেন না। এসব বিষয়ে তাঁর মা সব সময় উৎসাহ দিতেন।

অনন্য সামিরা

ছোটবেলা থেকে সামিরা টেনিস, গান, নাচ, আবৃত্তি, দাবা ও চিত্রাঙ্কন শিখেছেন। পাশাপাশি শিশুশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অ্যাবাকাস লার্নিং অব হায়ার অ্যারিথমেটিক বা অ্যালোহা থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েট হোন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকতে তিনি জুনিয়র সেকশনের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করান। জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত অ্যালোহা প্রতিযোগিতায় দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান সামিরা।

নেতৃত্ব, স্বেচ্ছাসেবকতা ও অর্জন

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সামিরা বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হন। অল্প বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা হয় তাঁর। শিক্ষাজীবনে ধারাবাহিকভাবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নিয়মিতভাবে শীর্ষস্থানীয় শিক্ষার্থীদের তালিকায় ছিলেন। এ সময় তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ বৃত্তিও অর্জন করেন। স্কুল এবং কলেজ জীবনে ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন থেকে ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেন। পাবলিক স্পিকিং ও মডেল ইউনাইটেড নেশনসে জাতীয় পর্যায়ে একাধিক পুরস্কারও লাভ করেন। বহুমুখী প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইন্টারন্যাশনাল কিডস অ্যাওয়ার্ড ২০২৪-এ ‘রাইজিং স্টার’ উপাধিতে পান। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাবের সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেন। এ ছাড়া তিনি ইংলিশ অলিম্পিয়াডের জাতীয় ফাইনালিস্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। একই সময়ে ল্যাটেন্ট ট্যালেন্ট ডিসকভারিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট জোনের শুরু থেকে যুক্ত আছেন এবং বর্তমানে সেখানে সিনিয়র ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রেইনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া কুইন্স কমনওয়েলথ এসে কম্পিটিশন ২০২৫-এ গোল্ড অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন।

বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন

সামিরা কলেজ জীবন থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তিনি কোডিং শেখা শুরু করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে কম্পিউটার সায়েন্সের প্রতি তাঁর আগ্রহ গভীর হয়। নতুন শিক্ষাব্যবস্থা, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং শেখার পরিবেশ তাঁকে আকৃষ্ট করে; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের লিবারেল আর্টস কলেজগুলোর শিক্ষাপদ্ধতি তাঁকে মুগ্ধ করে। কলেজে পড়ার সময় তিনি স্যাট পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। একদিকে এইচএসসি পরীক্ষার চাপ, অন্যদিকে স্যাটের প্রস্তুতি—দুই দিকই তাঁকে একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে। এরই মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচিতে নানা পরিবর্তন আসে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তবে সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।

যেভাবে প্রস্তুতি নেন সামিরা

এইচএসসির পর নিজের প্রোফাইল শক্তিশালী করতে তিনি বিভিন্ন ইন্টার্নশিপে যুক্ত হন। দি জিটিএম অ্যাডভাইজরস এবং দ্য ব্রোজেন প্রজেক্টে কাজ করার পাশাপাশি ওয়ার্ডস্মিথ রাইটিং জোনে এসইও ইন্টার্ন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লেখা একাধিক কনটেন্ট আন্তর্জাতিক সার্চ রেজাল্টে স্থান পায়। বিদেশে ভর্তির প্রস্তুতিতে তিনি নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যসেশন, ওয়েবিনার এবং শিক্ষার্থী এবং অ্যালামনাইদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। পাশাপাশি অসংখ্য প্রবন্ধ লিখে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে সমালোচনা হলেও পরিবারের সমর্থন তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

কানেটিকাট কলেজে ভর্তির গল্প

সামিরার পছন্দের প্রতিষ্ঠান ছিল কানেটিকাট কলেজ। তিনি ‘আর্লি ডিসিশন ২’ মাধ্যমে আবেদন করেন। তাঁর একাডেমিক ফল, সহশিক্ষা কার্যক্রম, পুরস্কার, স্যাট স্কোর এবং শিক্ষক ও কর্মক্ষেত্রের সুপারিশপত্র ভর্তিপ্রক্রিয়ায় বেশ ভূমিকা রাখে। অপেক্ষার দীর্ঘ সময় শেষে অবশেষে ৬ ফেব্রুয়ারি ভোরে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই ইমেইল। আনন্দে উচ্ছ্বসিত সামিরা ছুটে যান মায়ের কাছে। তিনি বলেন, এই অর্জন আল্লাহর রহমত ছাড়া সম্ভব ছিল না, আর মায়ের অবদান ছিল সবচেয়ে বড় প্রেরণা। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পান, পাশাপাশি কানাডার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও অফার পান।

বৃত্তির সুযোগ-সুবিধা

কানেটিকাট কলেজে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি প্রতিযোগিতা অত্যন্ত সীমিত। সামিরার প্রাপ্ত বৃত্তির মূল্য প্রায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৪ দশমিক ১২ কোটি টাকা), যা চার বছরের টিউশন ও আবাসন ব্যয় বহন করবে। এ ছাড়া তিনি অন-ক্যাম্পাসে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পাবেন।

নতুনদের উদ্দেশে সামিরা সুলতানা বলেন, বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া, একাডেমিক ফলের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় থাকা এবং নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিকল্প পরিকল্পনা রাখাও জরুরি। কারণ, পুরো প্রক্রিয়া অনেকটাই অনিশ্চিত। ভবিষ্যতে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চান সামিরা সুলতানা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত