Ajker Patrika

ধীরগতির চক্করে শিক্ষার প্রকল্প

রাহুল শর্মা, ঢাকা 
ধীরগতির চক্করে শিক্ষার প্রকল্প
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালের জুনে। কিন্তু চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকার পূর্বাচলে টিচিং ও ট্রেনিং পেট হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন এবং কক্সবাজারে গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্পেরও একই অবস্থা। ২০২২ সালের জুলাইয়ে নেওয়া প্রকল্পটির কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গত ৩০ জুন পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রের তথ্যমতে, শুধু এ দুটি প্রকল্প নয়, গত অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) অন্তর্ভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ৭২টি প্রকল্পের মধ্যে অধিকাংশই ধীরগতির চক্করে পড়েছে। কয়েকটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি। ফলে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ আবার বাড়ানো হচ্ছে। কোনো কোনো প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। ৭২টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ১৯০ দশমিক ১৩ কোটি টাকা।

প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ড. সরদার মো. কেরামত আলী গত ৩০ আগস্ট আজকের পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কেন বিলম্ব হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের আওতায় বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গত এক বছরের (২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত) বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে গত ৩০ জুলাই সভা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষ ও জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক। ২০ আগস্ট সভার কার্যবিবরণীতে স্বাক্ষর হয়।

সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন ৭২টি প্রকল্প। এর মধ্যে মাউশির অধীনে ৯টি, ইইডির অধীনে ১৬টি, ইউজিসির অধীনে সর্বোচ্চ ৪৪টি, ব্যানবেইসের অধীনে ১টি এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের অধীনে ২টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।

সভার কার্যবিবরণীর তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে ৭২টি চলমান প্রকল্পের বিপরীতে মোট বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ১৯০ দশমিক ১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৫ হাজার ৩১৪ দশমিক ৪৯ কোটি এবং প্রকল্প সহায়তা (বিদেশি সাহায্য) ৮৭৫ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা। প্রকল্পে সংশোধিত এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে গত জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৬৫২ দশমিক ৮২ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। অথচ আগের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) একই সময়ে আর্থিক অগ্রগতি ছিল ৮০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, যা জাতীয় অগ্রগতির হার শতভাগ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৩ শতাংশ কম।

সবচেয়ে ধীরগতি ইউজিসির প্রকল্পে

নথিপত্র বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী পাঁচটি সংস্থা বা অধিদপ্তরের মধ্যে ইউজিসির বাস্তবায়ন অগ্রগতি সবচেয়ে কম। ৭২টি প্রকল্পের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ইউজিসি। এসব প্রকল্পের বিপরীতে ২ হাজার ৩৮৯ দশমিক ৬২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে অগ্রগতি ৭৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ গত সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হিট প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু প্রকল্পটি শুরুই হয়েছে ২০২৫ সালে। শুরু করতেই দুই বছর শেষ হয়ে গেছে। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। এখন এ প্রকল্পে গতি এসেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব প্রকল্পে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, সেগুলো দূর করার জন্য আমরা কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘ইউজিসির বাস্তবায়নাধীন যেসব প্রকল্প আছে, সেসব প্রকল্পের সবার প্রতি আমাদের সতর্কবার্তা—কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি আমরা বরদাশত করব না।’

ইইডির ১৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন অগ্রগতিতে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এসব প্রকল্পে ৭২৮ দশমিক ২৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবায়নের অগ্রগতি ৯৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

মাউশির ৯টি প্রকল্পে ১ হাজার ৪৬২ দশমিক ২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৬৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি।

বাংলাদেশ স্কাউটসের দুটি প্রকল্পে ১৩ দশমিক ৬৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ব্যানবেইসের একটি প্রকল্পে ৫৮ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি সর্বনিম্ন ৪০ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

সূত্র বলছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের গত অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়ন অগ্রগতি খুব কম। এটি এ বিভাগ এবং এর আগে অবিভক্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে কম অগ্রগতি। বিষয়টি উঠে এসেছে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায়ও। সভায় বলা হয়, কম অগ্রগতির পক্ষে অনেক যুক্তিই থাকতে পারে। তবে বছর শেষ হওয়ার তিন-চার মাস আগে বাজেটের ৫০ শতাংশ ব্যয় করতে না পারা খুবই দুঃখজনক। যেসব প্রকল্প ৫০ শতাংশ ব্যয় করতে পারেনি, সেগুলোকে এর ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, সভায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিচালকদের আরও সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। এ বিষয়ে কারও মনোযোগের ঘাটতি থাকলে তাঁদের অন্য কোনো দপ্তরে বদলি বা পদায়নের কথাও বলেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত