
দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বাতিঘর বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ ১৩৭ বছর পার করেছে। ১৪ জুন নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। গৌরবময় ইতিহাস, শিক্ষা-ঐতিহ্য ও সাফল্যের বার্তা নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান কলেজটির দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে হাজারো শিক্ষার্থী এ কলেজ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বরিশালের সমাজ, সংস্কৃতি ও জনজীবনের বিকাশে বিএম কলেজের অবদান অনস্বীকার্য। তবে ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আরও গবেষণা এবং কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত (১৮৫৬-১৯২৩) তাঁর পিতা ব্রজমোহন দত্তের নামে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুন ব্রজমোহন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষার বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা থেকে এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম। এর আগে ১৮৮৪ সালের ২৭ জুন তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রজমোহন বিদ্যালয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৯ সালে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। প্রতিষ্ঠাতার লক্ষ্য ছিল শিক্ষিত, সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলা।
সবুজে ঘেরা বিএম কলেজের ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের কাছে যেন এক নান্দনিক ও মেধানির্ভর পরিবেশ। শতবর্ষ গেট, ঐতিহাসিক মূল ভবন, নাগলিঙ্গম, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও জারুল ফুলের রঙিন সমারোহ ক্যাম্পাসকে দিয়েছে বিশেষ সৌন্দর্য। এ ছাড়া রয়েছে জীবনানন্দ চত্বর, মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতিফলক এবং তিনটি মনোরম পুকুর। প্রায় ৬০ একর জায়গা-জুড়ে বিস্তৃত ক্যাম্পাসটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের জন্য সুপরিচিত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষে বিএম কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। পরবর্তী সময়ে চালু হয় স্নাতকোত্তর শিক্ষা। বর্তমানে কলেজে ২২টি বিষয়ে অনার্স এবং ২১টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে পুনরায় চালু করা হয় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম।
কলেজটিতে বর্তমানে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষক ও কর্মকর্তার অনুমোদিত পদ ১৯৮টি, যেগুলোর মধ্যে ১৮৭টি পদে জনবল কর্মরত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলোয় শিক্ষার্থীদের ফলও প্রশংসনীয়। প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে একটি প্রশাসনিক ভবন, একটি অডিটরিয়াম, একটি গ্রন্থাগার ভবন, একটি ক্যানটিন, ১১টি একাডেমিক ভবন এবং সাতটি আবাসিক হল। শিক্ষার পাশাপাশি বিতর্ক, সংগীত, নাটক, বিজ্ঞানচর্চা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড, রক্তদান, ভাষাচর্চা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। সমৃদ্ধ এই গ্রন্থাগার এখনো জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বিএম কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। মহান মুক্তিযুদ্ধে কলেজের ৪২ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শহীদ হন। এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসেও প্রতিষ্ঠানটির অবদান উল্লেখযোগ্য।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি (বিসিএসজিইএ), বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি এবং কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী জাবের আহমেদ বলেন, ‘১৩৭ বছর পেরিয়েও বিএম কলেজ আপন মহিমায় উজ্জ্বল। দক্ষিণাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে এই প্রতিষ্ঠান এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।’ তবে তিনি শ্রেণিকক্ষ ও কেন্দ্রীয় অডিটরিয়ামের সংকট, কিছু বিভাগে শিক্ষকস্বল্পতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
১৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১৪ জুন কলেজ ক্যাম্পাস থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়। র্যালিতে কলেজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্জন তুলে ধরা বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড বহন করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ১৩৭ বছরের পথচলায় সরকারি ব্রজমোহন কলেজ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানপ্রেম ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে সহায়ক হবে।
দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে ছিল আলোচনা সভা, কেক কাটা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বৃক্ষরোপণ, ব্লাড গ্রুপিং ও রক্তদান কর্মসূচি। অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী কাজী সাইফুল বাশার বলেন, প্রায় দেড় শতকের ঐতিহ্যবাহী বিএম কলেজ শিক্ষার পাশাপাশি নানা ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন আরও বড় পরিসরে হলে ভালো লাগত।
সত্য, প্রেম আর পবিত্রতার আদর্শে প্রতিষ্ঠিত বিএম কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরিশালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের অন্যতম ভিত্তি। কবি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন এই কলেজের শিক্ষার্থী। এ ছাড়া দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই কলেজের গ্রন্থাগার। অবকাঠামোগত সংকট, জলাবদ্ধতা এবং সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের মতো কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও বিএম কলেজ এখন পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। আধুনিক গবেষণা সুবিধা, উন্নত অডিটরিয়াম এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে প্রতিষ্ঠানটি আরও বৃহত্তর ভূমিকা রাখতে পারবে।
১৩৭ বছর পথচলার শেষে আজও বিএম কলেজ বরিশালের মানবসম্পদ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে আছে। বলা যায়, সমৃদ্ধ বিএম কলেজ মানেই সমৃদ্ধ বরিশাল।
‘বাবা’—মাত্র দুটি অক্ষরের শব্দ। কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বিশাল এক আকাশ, অফুরন্ত ভালোবাসা, সীমাহীন ত্যাগ এবং অটুট নির্ভরতার গল্প। সন্তানের জীবনে বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি একজন পথপ্রদর্শক, নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
২ ঘণ্টা আগে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) রসায়ন বিভাগের ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সুমিতা সাজনীন মারুফা যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি স্কলারশিপ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টন, ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি এবং কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি।
৪ ঘণ্টা আগে
গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর সামাজিক জীবনের একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কাচারি ঘর। সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল পরিবারগুলোর আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘর শুধু একটি স্থাপনা নয়, ছিল শিক্ষা, আড্ডা ও মানবিক সম্পর্কের এক জীবন্ত কেন্দ্র।
৪ ঘণ্টা আগে
জার্মান একাডেমিক এক্সচেঞ্জ সার্ভিস ডাডের সহযোগিতায় পরিচালিত এই বৃত্তির লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে মেধাবী ও গবেষণামুখী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা। বিশেষ করে যাঁরা আন্তর্জাতিক গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক সহযোগিতায় অবদান রাখতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য এটি একটি অনন্য সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
৫ ঘণ্টা আগে