Ajker Patrika

রাশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানের স্যাটেলাইট তথ্য পাচ্ছে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১১: ০২
রাশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানের স্যাটেলাইট তথ্য পাচ্ছে ইরান
রাশিয়া ইরানকে স্যাটেলাইট তথ্য দিচ্ছে বলে দাবি করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়া ইরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা বলেছেন, তেহরানকে লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে স্যাটেলাইট ছবি ও উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি দিচ্ছে মস্কো। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে বিষয়টি দাবি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ঘনিষ্ঠতম অংশীদারকে টিকিয়ে রাখতে চায় রাশিয়া। একই সঙ্গে এমন একটি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায়, যা সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়ার জন্য লাভজনক হয়ে উঠেছে।

সরবরাহ করা প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে পরিবর্তিত শাহেদ ড্রোনের বিভিন্ন উপাদান। এগুলো যোগাযোগ, নেভিগেশন ও লক্ষ্যভেদ সক্ষমতা বাড়াতে তৈরি করা হয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, ইউক্রেনে ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকেও রাশিয়া নির্দেশনা দিচ্ছে। কতগুলো ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করা উচিত এবং কোন উচ্চতা থেকে আঘাত হানা উচিত, সে সম্পর্কেও কৌশলগত পরামর্শ দিচ্ছে তারা। এসব তথ্যদাতার মধ্যে এক জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাও আছেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছে ইরানকে। যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে এই সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। সম্প্রতি রাশিয়া সরাসরি ইরানের হাতে স্যাটেলাইট ছবি তুলে দিয়েছে বলে জানিয়েছে দুটি সূত্র। যাদের একজন ওই ইউরোপীয় কর্মকর্তা এবং অন্যজন মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনীতিক।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সহায়তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে, তার সঙ্গে তুলনীয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে মস্কোর সহায়তায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের রাডার ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক হামলায় সফল হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব হামলার মধ্যে ছিল জর্ডানে থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আগাম সতর্কীকরণ রাডার, পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের অন্যান্য লক্ষ্যবস্তু।

ক্রেমলিন এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

স্যাটেলাইট ছবি স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুর বিস্তারিত অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে সূক্ষ্ম তথ্য দিতে পারে। হামলার আগে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং আঘাতের পর ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নেও এগুলো সহায়ক। লন্ডনের কিংস কলেজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো ও সিআইএর বিশ্লেষক জিম ল্যামসন বলেন, ‘রাশিয়া যদি নির্দিষ্ট ধরনের যুদ্ধবিমান, গোলাবারুদ ঘাঁটি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বা নৌ চলাচলের মতো বিষয়ের বিস্তারিত ছবি দিয়ে থাকে, যার গোয়েন্দা মূল্য রয়েছে, তাহলে তা ইরানের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।’

এক কর্মকর্তা জানান, রাশিয়া যে তথ্য দিচ্ছে তা এমন একটি স্যাটেলাইট বহর থেকে সংগ্রহ করা, যা সামরিক অভিযানের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে। এই বহর পরিচালনা করে রুশ এয়ারোস্পেস ফোর্সেস, যাকে রুশ সংক্ষিপ্ত রূপে ভিকেএস বলা হয়।

গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এবার যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সামরিক সম্পদ লক্ষ্য করে আঘাত হানায় ইরান বেশি সফল হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাডারকে ড্রোন দিয়ে অচল করে পরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কৌশলটি ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যবহৃত পদ্ধতির সঙ্গে খুব মিল রয়েছে।

প্যারিসের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় সায়েন্সেস পো-এর অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এখন রাডার ও কমান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থার দিকে বেশি কেন্দ্রীভূত। তাদের হামলার ধরন ক্রমেই রাশিয়ার কৌশলের মতো হয়ে উঠছে।’

মস্কোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার নেতৃত্বদানকারী বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, রাশিয়া ইরানকে হামলার জন্য গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তাঁর বিশ্বাস মস্কো ‘কিছুটা হলেও’ ইরানকে সহায়তা করছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ‘অন্য কোনো দেশ ইরানকে যা-ই দিক না কেন, তা আমাদের সামরিক অভিযানের সাফল্যে প্রভাব ফেলছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ৭ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং ১০০টির বেশি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে। এর ফলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৯৫ শতাংশ কমে গেছে।’

রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নেই, তবে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানই মস্কোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার। রাশিয়া ইরানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারীদের একটি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সম্পর্কের উত্থান-পতন থাকলেও ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর তা উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে।

দুই দেশ সামরিক ও প্রতিরক্ষা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির জন্য কমিশন ও ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে। সামরিক প্রতিনিধিদল নিয়মিত একে অন্যের দেশ সফর করেছে এবং যৌথ প্রশিক্ষণও হয়েছে। রাশিয়া ইরানের সাম্প্রতিক একটি স্যাটেলাইট ব্যবস্থাও তৈরি ও উৎক্ষেপণ করেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরানই রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছে। রাশিয়া যখন যুদ্ধক্ষেত্রে শাহেদ ব্যবহার শুরু করে, তখন কয়েক ডজন ইরানি কর্মকর্তা ক্রিমিয়ায় জড়ো হয়ে ইউক্রেনীয় শহর ও সম্মুখসারিতে এর প্রভাবের ভিডিও দেখেছিলেন। ইউক্রেনের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ৫৭ হাজারের বেশি শাহেদ ধরনের ড্রোন ব্যবহার করেছে।

এরপর মস্কো নিজ দেশেই এসব ড্রোন উৎপাদন শুরু করে। আরও নির্ভুলভাবে পথনির্দেশ ও লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা বাড়াতে এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন সেই উদ্ভাবনের কিছু অংশ আবার ইরানের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে।

ইরানকে রাশিয়া যতটা সহায়তা দিতে পারে, তার চেয়েও কম দিচ্ছে। কারণ, ইউক্রেনে তাদের নিজস্ব যুদ্ধ চলমান এবং ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করতে ক্রেমলিনের অনীহাও একটি কারণ। তবু বর্তমান সহায়তা ইরানের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ, যদিও সীমিত, ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন ল্যামসন। তিনি বলেন, ‘স্যাটেলাইট তথ্য ও ড্রোন কৌশল নিয়ে পরামর্শসহ যে সহায়তা রাশিয়া দিচ্ছে, তা সীমিত হলেও যুদ্ধের জন্য মূল্যবান এবং নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।’

এই যুদ্ধ কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ার জন্য লাভজনক হয়েছে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থার মজুত কমে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে তেলের দাম বেড়েছে, যা রুশ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। দাম কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন রুশ তেল কেনার ওপর বিধিনিষেধও শিথিল করেছে।

তবে যুদ্ধের নেতিবাচক দিকও আছে রাশিয়ার জন্য, বিশেষ করে যদি ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তবু মস্কো এটিকে অংশীদারকে সহায়তা করা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে। পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলেও ক্রেমলিন এখনো ওয়াশিংটনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখে বলে জানান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‍্যান্ডের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া নীতি বিষয়ক চেয়ার স্যামুয়েল চারাপ। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র যে গোয়েন্দা সহায়তা দেয়, তার প্রতিদানে আমাদেরই ওষুধ আমাদের খাওয়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে এটি দেখা হচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত