
ভারতে কিউআর কোড স্ক্যান করে কয়েক মুহূর্তে টাকা পাঠানো এখন প্রায় সবার দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কোনো পয়েন্ট অব সেল (পস) যন্ত্র বা নগদ টাকার ঝামেলা নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা—গ্রাহক বা বিক্রেতা কারও জন্যই কোনো দৃশ্যমান সার্ভিস চার্জ ছিল না।
তবে দীর্ঘ এক দশক ধরে চলা এই বিনা মূল্যে ডিজিটাল লেনদেনের অভিজ্ঞতা হয়তো শিগগিরই বদলাতে যাচ্ছে। ডিজিটাল অর্থ স্থানান্তরের এই ব্যবস্থায় ব্যাংক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলোকে বিক্রেতা বা মার্চেন্টদের কাছ থেকে ফি আদায়ের সুযোগ করে দিতে যাচ্ছে ভারত সরকার।
এখনৌ ফির হার বা প্রয়োগের ক্ষেত্র চূড়ান্ত হয়নি। তবে নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় থাকা প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বড় বড় প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক বড় অঙ্কের কেনাকাটার ওপর শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) ধার্য করা হতে পারে।
সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, সাধারণ গ্রাহকদের কেনাকাটা এবং এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির (পি২পি) অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো ফি লাগবে না। যদি মার্চেন্ট ফি চালুও হয়, তবে তা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি বড় অঙ্কের লেনদেনের ওপর সামান্য হারে প্রযোজ্য হবে। ফলে দৈনন্দিন অধিকাংশ ছোটখাটো লেনদেন পূর্বের মতোই বিনামূল্যে থাকবে।
তবে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—ইউপিআইয়ের ওপর এই মূল্যের ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হলে যে বিশাল নেটওয়ার্কটি এত সাফল্য এনে দিয়েছে, তা কি দুর্বল হয়ে পড়বে?
২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা ‘ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস’ বা ইউপিআই এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কেবল চলতি বছরের জুলাই মাসেই ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ২৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন (২,৩৬০ কোটি) লেনদেন হয়েছে, যার মোট আর্থিক মূল্য ২৯ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ৩১৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
ফোনপে (PhonePe) এবং গুগল পের (Google Pay) মতো ফিনটেক অ্যাপগুলো এই লেনদেনের সিংহভাগ পরিচালনা করে। সর্বশেষ অর্থবছরে ইউপিআই লেনদেনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪১ দশমিক ৬ বিলিয়নে—যা এর শুরুর বছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার গুণ বেশি। বর্তমানে ৫৫ কোটিরও বেশি মানুষ এটি ব্যবহার করছেন এবং ভারতের বাইরে অন্তত ১১টি দেশে কোনো না কোনো রূপে ইউপিআই পেমেন্ট সুবিধা চালু হয়েছে।
ইউপিআই কেবল বড় আকারের পরিধিই অর্জন করেনি, এর স্থাপত্যও বেশ ব্যতিক্রমী। একক কোনো প্রভাবশালী অ্যাপের ওপর ভিত্তি না করে ভারত এমন এক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিযোগী সংস্থাগুলো একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সেবা দিতে পারে। ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (এনপিসিআই) নামের একটি অলাভজনক সংস্থা এই ব্যবস্থাটি পরিচালনা করে, আর বাণিজ্যিক ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের সেবা দিয়ে থাকে।
ইউপিআইয়ের অভূতপূর্ব প্রসারে যে বিষয়টি নীরবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে, তা হলো দোকানদার ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ। একজন সবজি বিক্রেতা, ট্যাক্সিচালক বা রাস্তার ছোট দোকানদারকে পেমেন্ট নিতে কোনো দামি কার্ড টার্মিনাল কিনতে হয়নি। একটি ছাপানো কিউআর কোড ঝুলিয়ে দিলেই কাজ শেষ। এ ছাড়া কোনো অতিরিক্ত ফি না থাকায় বিক্রেতাদের গ্রাহক ফিরিয়ে দেওয়ারও কোনো কারণ ছিল না। অর্থনীতিবিদ অভিনব মোথোরাম এবং শ্যারন বিউটোর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিক্রেতাদের এই নেটওয়ার্ক কেবল ইউপিআই-এর সাফল্যের ফল নয়, বরং এটিই ছিল সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি।
মোথোরামের মতে, ‘ফি যদি কেবল বড় মার্চেন্ট বা বড় অঙ্কের লেনদেনে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাব হবে সামান্য। কিন্তু এই ফি যদি ছোট ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিক্রেতাদের ওপর গিয়ে পড়ে, তবে ছোট শহরের বিকাশমান নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
আলোচনায় থাকা প্রাথমিক প্রস্তাবটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে ঝুঁকি সর্বনিম্ন রাখা যায়। একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, দুই হাজার রুপির ওপর লেনদেনের ক্ষেত্রেই কেবল এই ফি ধার্য করা হতে পারে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান জেফ্রিসের মতে, দুই হাজার রুপির ওপরের লেনদেন মোট লেনদেনের সংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ হলেও, মোট লেনদেনের মূল্যের প্রায় ৬৭ শতাংশই এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। এর ফলে সাধারণ পাড়ার দোকানগুলোর লেনদেন অপরিবর্তিত রেখেও ব্যাংক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলোর জন্য বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নতুন রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এটি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করবে।
ইউপিআই ব্যবহারকারীর কাছে বিনামূল্যে মনে হলেও এটি পরিচালনা করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। বিশাল সার্ভার চালানো, লেনদেন নিষ্পত্তি, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং সাইবার আক্রমণ থেকে সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। এতদিন সরকার এই খরচ ভর্তুকি হিসেবে ব্যাংক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলোকে দিয়ে আসছিল। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)-এর গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, ‘এই পরিষেবার খরচ কাউকে না কাউকে তো বহন করতেই হবে।’
ভারত এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মুখোমুখি। একদিকে ইউপিআই-কে সামাজিকভাবে সর্বব্যাপী রেখে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, অন্যদিকে এর প্রসারের গতি বজায় রাখা। বিশ্বে এর সফল উদাহরণও রয়েছে। ব্রাজিলের পিক্স (Pix) নামের তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থাটি সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে হলেও ব্যবসার ক্ষেত্রে সামান্য ফি নেয়। তা সত্ত্বেও এটি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল পেমেন্ট সিস্টেমের একটি, যা প্রতি মাসে ১৪ কোটি মানুষ ও ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে।
অর্থনীতিবিদ রেণুকা সানের মতে, একটি সঠিক ফি কাঠামো ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট খাতে বাণিজ্যিক বাস্তবতা ও স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনবে, যা ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
তবে মনস্তাত্ত্বিক একটি ঝুঁকিও রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে লোকাল সার্কেলসের (LocalCircles) এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ ইউপিআই ব্যবহারকারী জানিয়েছেন ফি আরোপ করা হলে তাঁরা ইউপিআই ব্যবহার বন্ধ করে দেবেন; মাত্র ২২ শতাংশ ব্যবহারকারী ফি দিয়ে ব্যবহারে রাজি আছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউপিআই নেটওয়ার্ক এখন এতটাই শক্তিশালী যে বড় কোনো শপিং মলে সামান্য ফি বসানো হলে মানুষ এটি ব্যবহার করা বন্ধ করবে না। কিন্তু ফি-র কারণে যদি ছোট ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে, তবে ইউপিআই যে বাধাহীন সুবিধার জন্য জনপ্রিয় হয়েছিল, তা কিছুটা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

এক দশক আগেও যে অর্থনীতির বড় অংশের হিসাব করা হতো কারখানা, দোকান, কৃষি ও প্রচলিত সেবার মাধ্যমে, এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, অ্যাপভিত্তিক যাতায়াত, মোবাইল ফোনে আর্থিক লেনদেন, অনলাইনে কাজ করে আয় কিংবা ফুটপাতে ছোট ব্যবসা—সবই এখন মানুষের আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ
১১ ঘণ্টা আগে
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ লঙ্ঘনের দায়ে গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সাতটি মামলা করা হয়েছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
ভারত সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে কড়াকড়ি ও নানা শর্তারোপের প্রভাবে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে, অন্যদিকে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও
১৫ ঘণ্টা আগে
গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ও স্থলভাগে গ্যাস সংরক্ষণাগার নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এসব বিষয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
১৯ ঘণ্টা আগে