Ajker Patrika

মাত্র ৫ হাজার রুপি দিয়ে ৫০ কোটির ব্যবসা গড়লেন পারুল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মাত্র ৫ হাজার রুপি দিয়ে ৫০ কোটির ব্যবসা গড়লেন পারুল
ভারতীয় উদ্যোক্তা পারুল গুলাটি। ছবি: এনডিটিভি

ভারতীয় অভিনেত্রী, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও উদ্যোক্তা পারুল গুলাটি মাত্র ৫ হাজার রুপি মূলধন এবং একটি মোবাইল ফোনকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন প্রায় ৫০ কোটি রুপির ব্যবসা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হেয়ার এক্সটেনশন বা বাড়তি চুল যোগ করার ব্র্যান্ড ‘নিশ হেয়ার’ বর্তমানে ভারতের অন্যতম পরিচিত উদ্যোক্তা-নেতৃত্বাধীন ব্র্যান্ড হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

সম্প্রতি দিব্যা জৈনের সঞ্চালনায় এক আলাপচারিতায় নিজের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প তুলে ধরেন পারুল। সেখানে তিনি জানান, ২০১৭ সালে ‘নিশ হেয়ার’ যাত্রা শুরু করার সময় ভারতে হেয়ার এক্সটেনশন নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হতো না। চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা চুল পড়ার সমস্যায় ভোগা অনেকেই এই ধরনের পণ্যকে পরচুলার সঙ্গে এক করে দেখতেন। এর সঙ্গে সামাজিক সংকোচও জড়িয়ে ছিল।

পারুল বলেন, অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করার সময় একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে এমন এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, যিনি একই সঙ্গে চাকরি, মডেলিং এবং নিজের ব্যবসা সামলাচ্ছিলেন। ওই নারীর জীবনযাপন তাঁকে নিজের ব্যবসা শুরু করার অনুপ্রেরণা দেয়। পরে তিনি বুঝতে পারেন, মানুষের চুলের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেই একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসার সুযোগ রয়েছে।

নিজের উদ্যোক্তা জীবনের শুরুর কথা স্মরণ করে পারুল বলেন, ‘অনেক আবেগ আর অনেক ধারণা নিয়েই সবকিছু শুরু হয়েছিল।’ মাত্র ৫ হাজার রুপি দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ কীভাবে এত দূর এসেছে, তা নিয়ে বলেন, ‘আমি কীভাবে এখানে পৌঁছেছি, তা একমাত্র ঈশ্বরই দেখেছেন।’

ব্যবসা শুরুর সময় বড় তারকাদের দিয়ে বিজ্ঞাপন করানোর মতো অর্থ পারুলের ছিল না। তাই নিজেই হয়ে ওঠেন ব্র্যান্ডটির মুখ। মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতে থাকেন। প্রতিদিন কনটেন্ট তৈরি করতে করতে একসময় সেটিই হয়ে ওঠে ‘নিশ হেয়ার’-এর অন্যতম প্রধান বিপণন কৌশল।

পারুল মনে করেন, প্রতিষ্ঠাতা নিজে যখন কোনো পণ্যের প্রচারে সামনে থাকেন, তখন ক্রেতাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। মজা করে তিনি বলেন, ‘আমিই মার্কেটিং বিভাগ। এ ক্ষেত্রে কোনো বাজেটের প্রয়োজন নেই, কারণ আমি শুধু রিল বানাই।’

শুরুর দিকে পারুল নিজেই হেয়ার এক্সটেনশন তৈরি ও বিক্রি করতেন। প্রথম পণ্যটি ছিল চুল পাতলা হয়ে যাওয়া নারীদের জন্য চুলে বাড়তি ভলিউম দেওয়ার একটি এক্সটেনশন। সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজতে তিনি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের অডিশনেও যেতেন। সেখানে ইচ্ছা করেই মানুষের সামনে নিজের হেয়ার এক্সটেনশন খুলে ফেলতেন, যাতে অন্যদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়।

তাঁর প্রথম ক্রেতা ছিলেন মেনকা নামের এক অভিনেত্রী। কাস্টমাইজড একটি হেয়ারপিসের জন্য তিনি অর্ডার দেন। বাজারে এ ধরনের পণ্যের দাম ১০ থেকে ১২ হাজার রুপি হতে পারত। কিন্তু প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য পারুল সেটি ৫ হাজার রুপিতেই বিক্রি করেন। প্রথম তৈরি করা পণ্যটি অবশ্য প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। পরে নকশা ও মান উন্নত করে প্রায় এক মাসের প্রচেষ্টায় প্রথম বিক্রি সম্পন্ন করেন তিনি।

পারুলের ভাষায়, ‘কোনো ধারণা বাস্তবায়ন করা না হলে সেটি ভালো ধারণা হলেও কোনো কাজে আসে না; তা শুধু মাথার ভেতরের একটি অকেজো চিন্তা হয়ে থাকে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি শুরুতে বিভিন্ন শহরের ফ্লি মার্কেটেও পণ্য নিয়ে হাজির হতেন পারুল। ক্রেতাদের সরাসরি পণ্য ব্যবহার করে দেখাতেন এবং তাদের নিজেদের মোবাইলে ছবি তুলতে উৎসাহিত করতেন। পরে অনেক ক্রেতা সেই ছবি দেখে আবার ফিরে এসে পণ্য কিনতেন। প্রায় ১২টি ফ্লি মার্কেট আয়োজনে অংশ নেওয়ার পর ব্যবসায় বড় সম্ভাবনা দেখতে পান পারুল। আহমেদাবাদের একটি অনুষ্ঠানে এক লাখ রুপি আয় তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।

তবে পারুলের মতে, শুধু ভাইরাল হলেই ব্যবসায় সাফল্য আসে না। তিনি বলেন, ‘ভাইরাল হওয়া সহজ, কিন্তু ভাইরাল কনটেন্ট সবসময় বিক্রি বাড়ায় না।’ তাই তিনি এমন কনটেন্ট তৈরির ওপর জোর দেন, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পণ্যটি কী এবং কীভাবে কাজ করে তা বোঝাতে পারে। তাঁর জনপ্রিয় কনটেন্টের অন্যতম কৌশল ছিল ক্যামেরার সামনে হেয়ার এক্সটেনশন খুলে ফেলা।

ব্যবসার প্রচারে ব্যতিক্রমী উদ্যোগও নিয়েছেন পারুল। কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘নিশ হেয়ার’-এর সরবরাহ করা আসল মানবচুল দিয়ে তৈরি পোশাক পরে উপস্থিত হয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি।

‘শার্ক ট্যাংক ইন্ডিয়া’-তে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন পারুল। ব্যবসায়িক পরিভাষা ও আর্থিক বিষয় নিয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ না থাকায় সেখানে তিনি নার্ভাস ছিলেন বলে জানান। তবে তাঁর উদ্যোক্তা-দর্শন এখনো সরল—নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং দ্রুত ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

তাঁর পরামর্শ, ‘কোনো ধারণাকে মেরে ফেলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সেটি নিয়ে ১০ জনের মতামত চাওয়া।’ তাঁর মতে, সাফল্যের শুরু বড় বিনিয়োগ বা বিজ্ঞাপন বাজেট দিয়ে নয়; বরং মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা, নিজের পণ্যের ওপর বিশ্বাস এবং প্রতিদিন সেটিকে মানুষের সামনে তুলে ধরার সাহস থেকেই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত