Ajker Patrika

আবারও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আবারও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কা
ক্যান্ডি শহরের টুক-টুক চালক কীর্তি রাথনা। ছবি: আল-জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ায়। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা আবারও একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটিতে বর্তমানে জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনেকটা ২০২২ সালের ভয়াবহ সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।

এই বিষয়ে শুক্রবার আল-জাজিরার এক নিবন্ধে শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি শহরের পেট্রলচালিত টুক-টুক (ত্রিচক্রযান) চালক কীর্তি রাথনার পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি মার্চ মাসের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে ক্যান্ডি শহরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পেট্রল সংগ্রহ করছিলেন কীর্তি রাথনা। সরকারের নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী তিনি সপ্তাহে মাত্র ২০ লিটার জ্বালানি পান। অথচ কয়েক বছর আগেও প্রয়োজনমতো যে কোনো সময় জ্বালানি কিনতে পারতেন তিনি। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু করার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

হামলার জবাবে ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দিয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। শ্রীলঙ্কা তার মোট জ্বালানির প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানি করে এবং এর বড় অংশই এই পথ দিয়ে আসে। ফলে দেশটির জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।

এই সংকট মোকাবিলায় সরকার আবারও কিউআর কোড-ভিত্তিক জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে—যা ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও করা হয়েছিল। নতুন ব্যবস্থায় মোটরসাইকেল প্রতি সপ্তাহে ৮ লিটার, টুক-টুক ২০ লিটার, ব্যক্তিগত গাড়ি ২৫ লিটার, বাস ১০০ লিটার ডিজেল এবং ট্রাক ২০০ লিটার ডিজেল পেতে পারে।

তবে শুধু সংকটই নয়, জ্বালানির দামও বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খরচে, যা নিম্নআয়ের মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে দেশটির সার আমদানিতেও বিঘ্ন ঘটেছে। কারণ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া এই হরমুজ প্রণালি হয়েই আসে। ফলে খাদ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কায় খাদ্যের মূল্য প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

এই পরিস্থিতি অনেকের কাছেই ২০২২ সালের সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সেসময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের নীতির কারণে দেশটি প্রথমবারের মতো বৈদেশিক ঋণে খেলাপি হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সীমিত হয়ে যায়। এতে মূল্যস্ফীতি হয়ে পড়েছিল আকাশছোঁয়া। পরে গণবিক্ষোভের মুখে রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া দিশানায়েকের সরকার বলছে, এই সংকট তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কারণ এটি বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাবে ঘটছে।

দেশটিতে বর্তমানে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। আয় না বাড়লেও বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়।

সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির যে পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তার পুরোটা ভোক্তাদের ওপর চাপানো হয়নি। এর ফলে সরকারকে প্রতি মাসে প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। তাদের যুক্তি, পুরো মূল্য বাড়ানো হলে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়বে।

সংকট মোকাবিলায় সরকার সপ্তাহে বাড়তি একদিন (বুধবার) সরকারি অফিস ও স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে জ্বালানি খরচ কমানো যায়। পাশাপাশি বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা চলছে। রাশিয়া থেকে স্বল্পমূল্যে জ্বালানি আমদানির বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ ছাড়া ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যৌথভাবে দেশটির পুরোনো জ্বালানি সংরক্ষণাগার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে বড় সমস্যা হলো সংরক্ষণ সক্ষমতার অভাব। বর্তমানে শ্রীলঙ্কা মাত্র এক মাসের জ্বালানি মজুত রাখতে পারে। নতুন কিছু স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট নয়।

এদিকে দেশটির এলপিজি গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণে সংকট আরও বেড়েছে। একজন বিক্রেতা জানিয়েছেন, আগে যেখানে তিনি ৫০টি সিলিন্ডার পেতেন, এখন পাচ্ছেন মাত্র ৩৫ টি।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি রেশনিং ও খরচ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সরকারের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত কীভাবে একটি ছোট অর্থনীতিকে আবারও সংকটে ঠেলে দিতে পারে—শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জিয়ার নাম না বলায় বিএনপির স্বাধীনতার অনুষ্ঠান বর্জন, ইউএনও বদলি

বিশ্বের সবচেয়ে অপছন্দের দেশের তালিকা প্রকাশ

ইসরায়েলের পরমাণু বোমার তথ্য ফাঁসকারী আরব ইহুদি ভানুনুর ভাগ্যে কী ঘটেছিল

ট্রাম্পের নীতিতে খেপেছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাতে খুঁজছে দুর্বল জায়গা

খারগ দ্বীপের দখলে ভেঙে পড়বে আইআরজিসি, শেষ হবে যুদ্ধ: হোয়াইট হাউস

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত