Ajker Patrika

বাজার মানে বাড়তির চাপ

  • পরিবহন খরচের কথা বলে বেড়েছে বেশির ভাগ সবজির দাম।
  • মাছ-মুরগি, ডিম-আটার দামও বেড়ে গেছে।
সাখাওয়াত ফাহাদ, ঢাকা 
বাজার মানে বাড়তির চাপ
ফাইল ছবি

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির চাপ যে বাজারে পড়বে, তা আগে থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ করে এল জ্বালানি তেলের ‘বড় অঙ্কের’ মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে চারদিক দিয়ে। বড় নড়াচড়া শুরু হয়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। বাড়তি পরিবহন খরচের কথা বলে অনেক পণ্যের দামই এর মধ্যে বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যেসব পণ্যের দাম এখনো বাড়েনি, সেগুলোও দ্রুত সময়ের মধ্যে বেড়ে যেতে পারে বলে আগাম জানিয়ে রাখছেন তাঁরা। বাজার মানেই তাই গেরস্তের কাছে এখন বাড়তির চাপ।

রাজধানীর মেরাদিয়া বাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার এবং কারওয়ান বাজারে পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে গতকাল বৃহস্পতিবার সবজি, মাছ, মাংস, দুধ, ফল, আটা-ময়দা, চাল, তেল, ডিমের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগেও নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এখন বাড়তি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সেই চাপ আরও বাড়ছে।

২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫, পেট্রল ১৬০, অকটেন ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। দুই দিনের মধ্যে সারা দেশে বাস ও লঞ্চভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক বা পিকআপের ভাড়াও বেড়ে গেছে অঘোষিতভাবে।

চাপ সবজির বাজারে

মেরাদিয়া বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি করলা ৮০, লম্বা বেগুন ৮০, মোটা বেগুন ১২০, হাইব্রিড শসা ৮০, চিচিঙ্গা ৮০, পটোল ১২০, আলু ৩৫, পেঁপে ৩০, শিম ২০০, ঢ্যাঁড়স ১০০, ঝিঙা ১০০, ধুন্দল ৮০, কাঁকরোল ৮০, গাজর ১৪০, কাঁচা মরিচ ২০০ এবং টমেটো ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে পেঁয়াজ ৪৫, দেশি রসুন ১২০, ভারতীয় রসুন ১৮০ এবং আদা ১৪০ টাকা কেজি।

শান্তিনগর বাজারে এসব পণ্য কেজিতে ১০-১৫ টাকা কমে পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে কারওয়ান বাজারে করলা ৫০, লম্বা বেগুন ৬০, মোটা বেগুন ১০০, শসা ৫০, চিচিঙ্গা ৫০, পটোল ৪০, আলু ২২, পেঁপে ২০, শিম ১২০, ঢ্যাঁড়স ৪০, কাঁকরোল ৬০, গাজর ১২০, টমেটো ৮০, ঝিঙা ৬০ এবং কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পেঁয়াজ ৪০, রসুন দেশি ৯০ ও ভারতীয় ১৩০, আদা ভারতীয় ১৪০ ও দেশি ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

তবে এসব বাজারের মধ্যে পটোল, শিম, কাঁচা মরিচ ও ঢ্যাঁড়সের দামের ক্ষেত্রে প্রায় কেজিতে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান দেখা গেছে।

মানিকগঞ্জ থেকে পিকআপে করে সবজি আনেন বলে জানান মেরাদিয়া বাজারের ব্যবসায়ী শিপন মিয়া। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দাম আগেও বাড়তিই ছিল। এখন জ্বালানি তেলের দামের কারণে আরেকটু বাড়ছে। পিকআপ ভাড়া আজ ৪০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।’

মুরগির সরবরাহ কম, পরিবহনে বাড়তি ভাড়া

সবজির পাশাপাশি মাছ-মুরগির বাজারেও বাড়তি দামের চাপ দেখা যাচ্ছে। মেরাদিয়া বাজারে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকা কেজি দরে। শান্তিনগর বাজারে সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা আর কারওয়ান বাজারে একই মুরগির দাম ৩০০ থেকে ৩১০ টাকা। ব্রয়লার মেরাদিয়ায় ১৯০ টাকা, শান্তিনগর ১৮০ আর কারওয়ান বাজারে ১৭০ টাকা কেজি।

মেরাদিয়া বাজারের ব্যবসায়ী সাইমুন সর্দার অভিযোগ বলেন, ‘মুরগির উৎপাদন কম, খরচ বেশি। কাপ্তান বাজারে মুরগি আসে, সেখান থেকে পিকআপে করে নিয়ে আসি। গাড়িভাড়া বাড়ছে, তাই আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হয়।’

মুরগির সরবরাহ কমে গেছে জানিয়ে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী সাজ্জাদ মিয়া বলেন, ‘এক হাজার মুরগি চাইলে ৩০০ দিচ্ছে।’ দামের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজকে প্রতি মুরগিতে ৪ টাকা বেশি পড়েছে।’

মুরগির মতোই মাছের বাজারেও দাম ঊর্ধ্বমুখী। মেরাদিয়া বাজারে ইলিশের দাম আকারভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। রুই বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা এবং পাঙাশ ২০০ টাকা কেজি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ বাড়ায় পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে।

মেরাদিয়ার মাছ ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন বলেন, ‘মেরুল থেকে মাছ আনি। আমাদের আনার তেমন খরচ বাড়েনি। কিন্তু পাইকারদের মাছ আনার দাম বাড়ছে। তাই আমাদেরও কিছুটা বেশি দামে কিনতে হইতেছে।’

কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। এতে মাছভেদে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা দাম বেড়েছে।

বেড়েছে আটা-ময়দার দাম

সরকারি সংস্থা টিসিবির জানিয়েছে, এক মাসে ব্যবধানে প্যাকেটজাত আটার দাম ৪ শতাংশ ও ময়দার দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায় এবং ময়দা ৮০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সপ্তাহখানেক আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা।

মালিবাগের ব্যবসায়ী সুজন মোল্লা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গত মাসেই আটা-ময়দার দাম কেজিতে ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির ফলে আবার মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে ডিলাররা।’

ট্রাকভাড়া বৃদ্ধির ফলে চালের দামেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটে চাল ব্যবসায়ী সিকদার আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বুধবার থেকেই বাড়তি দামে চাল আনতে হচ্ছে। ট্রাকপ্রতি প্রায় ৪ হাজার টাকা বেড়েছে।’

ডিমের ডজন ১৭০ টাকা

রাজধানীর একেক এলাকায় একেক দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম। অধিকাংশ বাজারেই ডিমের দাম গত সপ্তাহে ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। তবে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির পর তা প্রতি ডজনে ১০ টাকা বেড়ে গেছে।

দুধের দাম একলাফে ১০ টাকা বৃদ্ধি

প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম গত দেড় মাসে দুই দফায় লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। মিল্কভিটার পর আড়ং, প্রাণ, ফার্মফ্রেশসহ বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দুধ এখন লিটারপ্রতি ১২০ টাকা, আধা লিটার ৬০ টাকা বিক্রি করছে। উৎপাদনকারীরা পরিবহন, সংগ্রহ, প্যাকেজিং, গোখাদ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে সরকারকে চিঠি

চলতি মাসের শুরুতেই ভোজ্যতেলের দর লিটারে ৫ টাকা বেড়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন তেলের দাম আরও বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে।

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে। তবে শুধু তেলের দাম বেড়েছে, এই কারণ দেখিয়ে ইচ্ছেমতো সবকিছুর দাম বাড়ানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে জবাবদিহি থাকা দরকার।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত