Ajker Patrika

এলপিজি বিক্রিতে কারসাজি

  • বিইআরসির নির্ধারণ করে দেওয়া দাম মানছেন না বিক্রেতারা।
  • ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২০০০–২৫০০ টাকায়।
  • বিক্রেতাদের বিভিন্ন স্তরের কারসাজিকে দায়ী করছেন ক্রেতারা।
  • সংকটের জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে: বিইআরসি
ফয়সাল আতিক, ঢাকা
এলপিজি বিক্রিতে কারসাজি
ফাইল ছবি

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সিলিন্ডারজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়িয়ে নির্ধারণ করলেও তা মানছেন না বিক্রেতারা। তাঁরা আগের মতোই অতিরিক্ত দামে গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীদের এই অতিমুনাফায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রেতারা।

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দামবৃদ্ধি এবং বিইআরসির দাম বাড়িয়ে নতুন দাম করার পরও তা কার্যকর না হওয়ায় ক্রেতারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। তাঁরা বলছেন, বিইআরসির দুর্বল তদারকির কারণেই বিভিন্ন স্তরের বিক্রেতারা মিলেমিশে কারসাজি করে ক্রেতাদের পকেট কাটছে।

আমদানি পর্যাপ্ত থাকলেও এলপি গ্যাসের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়েছে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে। সরকার তদারকি শুরু করেছে ২০ সেপ্টেম্বরের পর। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসিও লাইসেন্সধারী কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। কোম্পানিগুলো এলপি গ্যাসের সংকট নেই বলে জানিয়েছে। এরপরও সংকট কাটেনি। তবে কারা এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মূল্যবৃদ্ধির কারসাজির সঙ্গে জড়িত তা এখনো শনাক্ত হয়নি বলে জানা গেছে।

সেপ্টেম্বরে ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের বিইআরসির বেঁধে দেওয়া দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু সংকটের অজুহাতে বিক্রি করা হয় ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। কোম্পানিগুলো সংকটের জন্য দায়ী করে ডিলার, পরিবেশক ও বিক্রেতাদের। আর এসব স্তরের ব্যবসায়ীরা দায়ী করেন কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কমানোকে। সংকট কাটাতে ও ক্রেতাকে দামে লাগাম টানতে ৪ অক্টোবর বিইআরসি এলপি গ্যাসের দাম কেজিতে ২১ টাকা বাড়ায়। এতে ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম আগের চেয়ে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কোথাও এই দাম মানা হচ্ছে না। গ্রাহকদের স্থানভেদে ও কোম্পানিভেদে কিনতে হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।

গ্রাহকেরা বলছেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এলপি গ্যাসের দাম খুচরা পর্যায়ে কেজিতে অন্তত ৭৬ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন পরিমাণের গ্যাসের সিলিন্ডার থাকলেও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ১২ কেজির সিলিন্ডার। চলতি মাসে বিইআরসি এলপিজির দাম বাড়ানোর পর সংকট কিছুটা কমলেও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামেই বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গত দুই দিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২ কেজির একটি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে এখনো ২ হাজার টাকার বেশি লাগছে। কোথাও কোথাও আগের মতোই ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

দেশে ৩২টি কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে এলপি গ্যাস আমদানি ও সিলিন্ডারজাত করার লাইসেন্স নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১২টি কোম্পানি সেপ্টেম্বর ও চলতি অক্টোবরে এলপি গ্যাস আমদানি ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত।

বিইআরসির একজন ঊর্ধ্বতন সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে আজকের পত্রিকাকে বলেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি এলপি গ্যাস আমদানি হয়েছে। তবুও বাজারে এলপি গ্যাসের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হয়েছে। বিইআরসি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছে, নিজস্ব অনুসন্ধানও চালাচ্ছে। আমদানি, পরিবেশক কিংবা ডিলার—কোন পর্যায়ে অনিয়ম ঘটেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আগস্টে এক লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপি গ্যাস আমদানি হয়। সেপ্টেম্বরে আমদানি হয় এক লাখ ৫৬ হাজার ১২৯ টন এলপি গ্যাস। চলতি বছরে এ দুই মাসেই সর্বোচ্চ পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে। বর্তমানে দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন, মাসে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টন। দিনে ৫ হাজার টন বা ৫০ লাখ কেজি এলপিজি বিক্রি হয়।

ঢাকার কয়েকটি হোটেল–রেস্তোরাঁয় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৩৩ কেজি ওজনের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়, যদিও সরকার নির্ধারিত মূল্য ৫ হাজার ৫১ টাকা।

ভোলা প্রতিনিধি জানান, জেলার ডিলাররা ১২ কেজি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ টাকায় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। ওই সিলিন্ডার খুচরা বিক্রেতারা ২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

ভোলা সদরের যুগিরঘোলের বাসিন্দা ও ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক মো. হামিদ পারভেজ বলেন, তিনি দুই হাজার টাকায় ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার কিনেছেন।

যুগিরঘোলের খুচরা বিক্রেতা মেসার্স মোসলেম ট্রেডার্সের মালিক মো. মোসলেম উদ্দিন বলেন, তিনি ১ হাজার ৯৫০ টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।

বিএম ও টোটাল এলপি গ্যাসের ডিলার অসীম সাহা বলেন, ‘আমরা ৬ অক্টোবর খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ১২ কেজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করেছি ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮৬০ টাকা পর্যন্ত।’

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলে এলপিজি গ্যাসের সংকট তীব্র। জেএমআই কোম্পানি দুই মাস ধরে গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। ২ হাজার ১০০ টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। কোথাও দাম আরও বেশি।

টাঙ্গাইল জেলা এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি হারুণ অর রশিদ বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৭৪২ টাকায় কিনলেও কোম্পানি পরিবহন খরচ দেয় না। ট্রাক ভাড়া, খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যয়, লোড-আনলোড, গুদাম ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারী ব্যয়—সব মিলিয়ে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা ব্যয় হয়। ফলে তাঁদের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, চাঁদপুরে খুচরায় ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০ টাকা পর্যন্ত। গত মঙ্গলবার চাঁদপুর শহরের তালতলা, মিশন রোড, নিউ ট্রাক রোড, নতুন বাজার ও পালবাজার এলাকার বিভিন্ন এলপিজি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খুচরা বাজারে ১২ কেজির এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকায়। বিক্রেতারা জানান, বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, আইগ্যাস ও ওমেরাসহ কয়েকটি কোম্পানির এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে। এসব কোম্পানির ১২ কেজির সিলিন্ডার ডিলার পয়েন্ট থেকে খুচরা বিক্রেতারা ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮২০ টাকায় কিনছেন।

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীতে খুচরা বিক্রেতারা ১২ কেজির সিলিন্ডারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন।

এলপি গ্যাস নিয়ে অনিয়ম খুঁজে দেখার কাজ করা একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, এলপি গ্যাসের দাম বেড়ে যাবে এমন আগাম খবর পেয়ে ডিলার ও পরিবেশক কিংবা খুচরা বিক্রেতা—সব পর্যায়েই কিছু কিছু মজুত হয়েছে বলে তাঁরা আভাস পাচ্ছেন। আবার বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোও তাদের প্ল্যান্ট থেকে পরিমাণে কম এলপি গ্যাস বাজারে ছেড়েছে। মোটা দাগে এটিই অনিয়ম ও দামবৃদ্ধির কারণ।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান বলেন, তাঁরা বেশ কিছু স্পর্শকাতর তথ্য নিয়ে কাজ করছেন। কারা এই সংকটের পেছনে দায়ী তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত