Ajker Patrika

সরাসরি তালিকাভুক্তিতে ফিরল বেসরকারি কোম্পানি

  • সাড়ে ১৬ বছরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
  • নতুন অর্থ না তুলেও কীভাবে বাজারে আসবে এবং শেয়ারের দাম কীভাবে নির্ধারিত হবে, সে প্রশ্ন থাকছেই।
  • পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত।
মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
সরাসরি তালিকাভুক্তিতে ফিরল বেসরকারি কোম্পানি

দেশের পুঁজিবাজারে বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ ফিরে এসেছে। পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সাড়ে ১৬ বছর ধরে থাকা এ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে সরকার। এর অর্থ হলো, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু না করেই বেসরকারি কোম্পানি সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হবে। এত দিন শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এই সুযোগ উন্মুক্ত ছিল। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানির জন্যও প্রাথমিক গণপ্রস্তাব ছাড়াই তালিকাভুক্তির দরজা খুলল।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গতকাল সোমবার এক আদেশে ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জারি করা বেসরকারি কোম্পানির তালিকাভুক্তির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ—ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকেও সরাসরি তালিকাভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের আবেদন বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তার আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। বিভাগের উপসচিব মো. মামুনুর রশীদ স্বাক্ষরিত ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়, পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়ে আগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলো।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, এ সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি ও খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীরা ব্যবসার মালিকানায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং বাজারে বিনিয়োগের বিকল্প বাড়বে। তালিকাভুক্তির নিয়ম মানতে গিয়ে কোম্পানিগুলোর হিসাব, তথ্য প্রকাশ ও করপোরেট শাসনে উন্নতি হতে পারে। বাজারে প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা বাড়লে দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজারের ভিত্তিও শক্ত হতে পারে।

তবে সরাসরি তালিকাভুক্তি মানেই কোম্পানি নতুন মূলধন পাবে—এমন নয়। যদি কেবল বিদ্যমান মালিকদের শেয়ার বিক্রি হয়, অর্থ কোম্পানির কাছে না-ও যেতে পারে। নতুন শেয়ার ইস্যু হলে তবেই কোম্পানি সরাসরি অর্থ পেতে পারে। তাই তালিকাভুক্তির ধরন ও শর্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে স্পষ্ট করা জরুরি।

এদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে দীর্ঘদিনের এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) জরুরি কমিশন সভায় বসতে যাচ্ছে। এ সভায় ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সিকিউরিটিজের সরাসরি তালিকাভুক্তি) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করবে বলে জানা গেছে। কমিশন জানিয়েছে, অনুমোদনের পর বিধিমালার খসড়াটি শিগগির জনমত যাচাইয়ের জন্য বিএসইসির ওয়েবসাইট ও সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হবে।

বিএসইসির খসড়া অনুযায়ী, সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে নির্দিষ্ট শ্রেণির বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি। এর মধ্যে রয়েছে শতভাগ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং যেসব কোম্পানিতে সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানা কমপক্ষে ১০ শতাংশ। এ ছাড়া কমপক্ষে ৫১ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি, ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বার্ষিক লেনদেন বা সম্পদ রয়েছে—এমন বড় দেশীয় কোম্পানি এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করা টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ পাবে।

এদিকে পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। প্রশ্ন তৈরি হয়, কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে নতুন অর্থ না তুলেও কীভাবে বাজারে আসবে এবং শেয়ারের দাম কীভাবে নির্ধারিত হবে। ২০০৬ সালে বিএসইসি সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধান প্রথম চালু করেছিল। ২০১০ সালের পুঁজিবাজারের অস্বাভাবিক উত্থান ও পরবর্তী ধসের পর বাজারে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ, কারসাজি ও বিনিয়োগকারীর স্বার্থ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে।

এর পরই বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর হয়। ২০১৬ সালে এ সুযোগটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ২০১০ সালেই সর্বশেষ বেসরকারি তালিকাভুক্ত কোম্পানি ছিল খুলনা পাওয়ার।

এবার নতুন ব্যবস্থায় আগের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বেশ কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেফারেন্স মূল্যের ভিত্তিতে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ, তালিকাভুক্তির প্রথম ৩০ মিনিটে শুধু ক্রেতাদের দরপ্রস্তাবের সুযোগ, প্রথম দুই কার্যদিবসে বিশেষ লেনদেনব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শেয়ার বিক্রিতে বিধিনিষেধ। এ ছাড়া তালিকাভুক্তির প্রথম পাঁচ কার্যদিবসে একক আদেশে সর্বোচ্চ ১ হাজার শেয়ার কেনাবেচার সীমা এবং তালিকাভুক্তির পর এক বছর পর্যন্ত কোম্পানির স্পনসর ও পরিচালকদের শেয়ার পুনঃ ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল-আমিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাজারের জন্য ইতিবাচক। তবে যে কারণে এই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই সব সমস্যায় যাতে না হয়—বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। এই সুযোগে যেন অযোগ্য কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে না পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত