Ajker Patrika

এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর বাড়তি সময় পেল বাংলাদেশ

• জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব অনুমোদন

• সংস্কার ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ

শাহ আলম খান, ঢাকা
আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯: ৫৬
এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর বাড়তি সময় পেল বাংলাদেশ

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। তবে বাড়তি এই সময়ের কার্যকর ব্যবহার নির্ভর করবে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানো, সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।

স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় বেলা ৩টায় ও বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়। এই অধিবেশনের বিশেষত্বই ছিল—বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণ-সংক্রান্ত জাতিসংঘের প্রস্তাব গ্রহণ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

সাধারণ পরিষদের সদস্য উরুগুয়ে বাংলাদেশের পক্ষে এই প্রস্তাবের উত্থাপন করে। এতে জি-৭৭-ভুক্ত দেশসমূহ এবং চীন সমর্থন ব্যক্ত করে। সাধারণ পরিষদ মনে করে, এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ এমনভাবে হতে হবে, যাতে তা টেকসই ও অপরিবর্তনীয় হয় এবং কোনো দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিঘ্ন না ঘটে।

এরও আগে এ অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য ২০ অক্টোবর তৈরি হওয়া এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার বাড়তি সময় সংক্রান্ত A/ 81 /L.8 নম্বর খসড়া প্রস্তাবে বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত করার কথা বলা হয়।

সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালের প্রস্তাবটিও অনুমোদিত হয় বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর পক্ষে প্রস্তাবে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জটিলতা, আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন, বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং অতীতের সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের মতো বিষয়গুলো বিবেচনার দাবি রাখে।

এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের আগে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, বর্ধিত প্রস্তুতিকালে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে এবং উত্তরণ নির্বিঘ্ন করার জাতীয় কৌশল বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে হবে।

এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘব্যবস্থার সহায়তা এবং বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। এ ছাড়া এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত জানাতে হবে। এ জন্য উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির কাছে জমা দেওয়া বাংলাদেশের বার্ষিক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে এবং তা মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। সিডিপিও বাংলাদেশের উত্তরণ পিছিয়ে দেয়ার সুপারিশ দেয়।

তবে বাড়তি সময় পেলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এই সময়কে সংস্কারের কাজে লাগানোই হবে বাংলাদেশের জন্য মূল পরীক্ষা। তাঁর বিশ্লেষণে তিনি বলেছেন, বাড়তি সময় বাংলাদেশকে সাময়িক স্বস্তি দেবে, কিন্তু তা সংস্কারের বিকল্প হতে পারে না।

ফাহমিদা খাতুনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সময়ে উৎপাদনশীলতা, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতা, শুল্ক প্রশাসন, দক্ষতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজার তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

জাতিসংঘের প্রস্তাবেও বাংলাদেশের জন্য সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্ধিত প্রস্তুতিকালে দেশের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। উত্তরণ নির্বিঘ্ন করতে জাতীয় কৌশল বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এসব উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়মিত জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসিকে (ইউএনসিডিপি) জানাতে হবে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সুসংবাদ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এখন বাড়তি সময় কাজে লাগিয়ে অবকাঠামো ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। যেসব দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা প্রয়োজন, সেসব দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করার উদ্যোগও নিতে হবে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও একই সময় পর্যন্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দুই দেশের উত্তরণ যেন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিঘ্ন না ঘটায়, সে জন্য জাতিসংঘ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় মান অর্জন করেছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা হারানোর পরও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলা। তিন বছরের বাড়তি সময় সেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে; এখন নির্ভর করছে সংস্কারের বাস্তবায়নের ওপর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত