Ajker Patrika

লাভের ফসলে ঝুঁকছেন কৃষক

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
লাভের ফসলে ঝুঁকছেন কৃষক
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

দেশের কৃষিতে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে ফসল নির্বাচনের চিত্র। উৎপাদন খরচ, বাজারদর এবং লাভ-লোকসানের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে কৃষকেরা ঐতিহ্যগত ধান ও পাটের পরিবর্তে সরিষা, আদা, হলুদ, বিভিন্ন শীতকালীন সবজি এমনকি তামাকের মতো তুলনামূলক বেশি লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদনেও। একদিকে আউশ ধান ও পাটের আবাদ-উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে বেড়েছে তেলবীজ, মসলা ও সবজির উৎপাদন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ফসল পরিসংখ্যান এবং কৃষিশ্রমিকের মজুরি’ শীর্ষক ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৪ দশমিক ৬৮ শতাংশই কৃষিনির্ভর। কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তন আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রাক্কলন আরও নির্ভুল করতে এবার নিয়মিত ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কৃষি উৎপাদন ও কৃষিশ্রমিকের মজুরির তথ্য প্রকাশ শুরু করেছে বিবিএস।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মিজানুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, কৃষকেরা এখন লাভ-লোকসানের হিসাব করেই ফসল নির্বাচন করছেন। উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় আউশ ধান ও পাট চাষে আগ্রহ কমছে। অন্যদিকে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায় এমন সবজি, সরিষা ও অন্যান্য বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন তাঁরা। তিনি বলেন, মোট ধান উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ আসে আউশ থেকে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক এই ফসল থেকে সরে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তামাক চাষে লাভ বেশি হওয়ায় সরকারি নিরুৎসাহ সত্ত্বেও এর আবাদ বাড়ছে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আউশ ধানের আবাদ কমে ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৫১৬ একরে নেমেছে, যা আগের বছর ছিল ২৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৩৪ একর। উৎপাদনও ২৭ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪৬ টন থেকে কমে ২৭ লাখ ৮ হাজার ১৯১ টনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পাটের আবাদ ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৩৭৪ একর থেকে কমে ১৬ লাখ ৭৫ হাজার ৭৯৯ একরে নেমেছে। উৎপাদনও প্রায় ৮৯ লাখ ৫৩ হাজার বেল থেকে কমে ৮৮ লাখের কিছু বেশি বেলে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট এবং বাজারদরের অনিশ্চয়তা পাট চাষে আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে সরিষা চাষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরিষার আবাদ বেড়ে ১১ লাখ ৬৩ হাজার ১৪৪ একরে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ১১ লাখ ২৫ হাজার ৭৬৫ একর। উৎপাদনও বেড়ে ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩০ টনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে আদার উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার টন এবং হলুদের উৎপাদন প্রায় ৪০ হাজার টন বেড়েছে। শীতকালীন সবজির মধ্যে মূলা, বাঁধাকপি, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, লালশাক ও খিরাইয়ের উৎপাদন বেড়েছে। ফলের মধ্যে মাল্টা, জলপাই, কুল, পাকা পেঁপে ও ডালিমের উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

প্রতিবেদন আরও বলছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তামাকের আবাদ ১ লাখ ৭ হাজার একর থেকে বেড়ে ১ লাখ ২২ হাজার একরের বেশি হয়েছে। উৎপাদনও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিশ্চিত বাজার, আগাম অর্থায়ন এবং চুক্তিভিত্তিক চাষের সুবিধা তামাকের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। একই সময়ে কৃষিশ্রমিকের মজুরি আগের বছরের তুলনায় উচ্চ অবস্থানে রয়েছে, যা গ্রামীণ শ্রমবাজারে শ্রমিকসংকট এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত