আমরা জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, কুদরাত-এ-খুদা, মুনীর চৌধুরীর উত্তরসূরি। এই লেখায় আমি বোঝার চেষ্টা করব, জাতি হিসেবে আমাদের দেখলে আসলেই এই মহামানব উদ্ভাবকদের উত্তরসূরি মনে হয় কি না। প্রযুক্তি হলো এমন একটি ব্যাপার, যা রাতারাতি আমাদের জীবনপদ্ধতি অনেকখানি পাল্টে দেয়—বৈদ্যুতিক বাতি, মুঠোফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা– এসব। প্রযুক্তি আসে উদ্ভাবক আর আবিষ্কারকদের কাছ থেকে। এই উদ্ভাবক আর আবিষ্কারকেরা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান, সেটি হলো উদ্ভাবন। গত ১০ বছরের গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনগুলো হলো ক্রিসপার জিন সম্পাদনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ফাইভ-জি, ইমিউনোথেরাপি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ইত্যাদি। প্রিয় পাঠক, বলুন তো, এ সবকিছুর মধ্যে মিল কোথায়? মিল হলো, এর কোনোটিই আমাদের বাংলাদেশ থেকে আসেনি। অথচ আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে একটি। তাহলে নিশ্চয় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের একটি বড় অংশ আমাদের পথশিশু, রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিকদের মধ্যে লুকিয়ে আছে। কেন সেই মেধা বিকশিত হতে পারেনি?
যন্ত্রপাতি নিয়ে খুটখাট করা আর প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য হলো, প্রযুক্তি একটি বিশালসংখ্যক মানুষের জীবনের একটি বড় সমস্যা সমাধান করে। যেমন স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা নুরুল কাদের খান (যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের কারণে ঘৃণাবশত নিজের নামের শেষাংশ ‘খান’ নিজেই ছেঁটে দেন) এলসি নামে একটি বাণিজ্যিক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন, যেটির কারণে আমাদের দেশে হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়িক খাত রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্ম হয়।
অনেক সময় উদ্ভাবকেরা ঠিক করেন, এই আবিষ্কার তাঁরা পেটেন্টের মাধ্যমে সংরক্ষণ করবেন; যাতে তিনি এটি থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হন। এই পেটেন্ট নিশ্চিত করে যে এক বা একাধিক দেশে এই প্রযুক্তির তিনিই প্রথম উদ্ভাবক। কাজেই প্রথম দিকে একটি নির্দিষ্টসংখ্যক বছর তিনিই শুধু এর আর্থিক সুবিধাভোগী হবেন। বাংলাদেশে এর একটি উদাহরণ হলো, সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের বিজয় কি-বোর্ডের পেটেন্ট। এটি নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়। তবে আমার দৃষ্টিতে এটি যতটা না পেটেন্টের মেধাগত মূল্যের কারণে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে তরুণ প্রযুক্তিবিদদের প্রতি তাঁর উন্নাসিক মনোভাবের কারণে।
প্রযুক্তি আর বিজ্ঞান গবেষণা আপন ভাই-বোনের মতো। যে সমাজে মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণা খুব একটা হয় না, সে সমাজে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন তেমন দেখা যায় না। ঠিক উল্টোটাও সত্য। আমি শুরু করেছি এটি দেখিয়ে যে গত ১০ বছরের উদ্ভাবনের মধ্যে একটি মিল হলো, কোনোটিই বাংলাদেশ থেকে আসেনি। আরেকটি মিল আছে, বিজ্ঞান ও গণিতে গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পুরস্কার কখনোই বাংলাদেশে আসেনি। যে সমাজ ও রাষ্ট্র অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামদের মতো বিদেশের সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে আসা মানুষদের ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না, সেখানে এটি হওয়াই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত যতটি পেটেন্ট আবেদন জমা পড়েছে, সেগুলোর মধ্যে কতটি অনুমোদন পেয়েছে এবং কত শতাংশ দেশি, এই তথ্যগুলো একটু অনলাইনে ঘাঁটাঘাঁটি করলে সহজে পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পরপর একটি ছোট্ট লাফ বাদ দিলে, দেশি নিবন্ধিত উদ্ভাবনের সংখ্যা বছরওয়ারি তেমন বাড়েনি। শুধু তা-ই নয়, সরকারের মধ্যে অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) বলে যে বস্তুটি আছে, সেটিও দেশি উদ্ভাবনের সংখ্যা বাড়াতে পারেনি।
আমরা যদি একটু ভেতরে গিয়ে গত বছরের অনুমোদিত পেটেন্টের মধ্যে কোন দেশের কতটি পেটেন্ট, তার হিসাব দেখি, তাহলে দেখব, গত বছরের পেটেন্ট অনুমোদন সবচেয়ে বেশি পেয়েছে ভারত। পেটেন্ট কিন্তু অনেক খরুচে ব্যাপার। তাহলে অন্য একটি দেশ কেন তাদের প্রযুক্তি আমাদের দেশে এত টাকা খরচ করে নিবন্ধন করল? কারণ, নিশ্চয় আমাদের দেশে তাদের এই উদ্ভাবনের বাজার আছে। এবং সেই বাজার ধরার প্রতিযোগিতায় আমরা হেরে গেছি।
যেকোনো উন্নত দেশে বেশি পেটেন্ট আসে সফটওয়্যার ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে। গত বছর আমাদেরটি কিন্তু সে রকম হয়নি। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, আগের বছরগুলোও মোটামুটি একই রকম। এর অর্থ হলো, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকার যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করল, সেটি গেছে আমলা, দাতা সংস্থার কনসালট্যান্ট আর তাঁদের পছন্দের কিছু ব্যবসায়ীর পেটে। সত্যিকারের উদ্ভাবকের কাছে সেই বিনিয়োগ পৌঁছায়নি।
যে আমলাতন্ত্র গত ৫০ বছরে উদ্ভাবন ও গবেষণার কিছু করতে পারেনি, কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া সেই আমলাতন্ত্র হঠাৎ অনেক দারুণ কিছু করা শুরু করবে, এই আশা করি না। মুক্তিযুদ্ধের পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কিছু ছাড়াই নুরুল কাদের খান এলসির মতো একটি আর্থিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন। আমাদের এখন দরকার একগুচ্ছ নুরুল কাদের খান, যাঁরা কোনো কিছুর বা কারও জন্য অপেক্ষা করবেন না।
অপেক্ষা করছি এসব সংশপ্তক বিজ্ঞানী আর উদ্ভাবকের জন্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এবং সচিবদের উচিত হবে সরকারের জন্য বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের পেছনে সরাসরি বিনিয়োগের পথ খুঁজে বের করা। তাঁদের কাজ করার আদর্শ পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা। নইলে যে ‘আত্মসম্মান’ নিয়ে বেঁচে থাকার কথা বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময় পরপর সরকার বদলালেও তা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
লেখক: তত্ত্বীয় কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিজ্ঞানী, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার ইনফরমেশন সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট, যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি রিসার্চ ল্যাব এবং ইউএমবিসির গবেষক ও শিক্ষক।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের নতুন যাত্রায় ক্রীড়াঙ্গনকে নিয়ে সরকারের ভাবনা কী, কীভাবে এগোচ্ছে বা এগোতে চাইছে সরকার—পুরো বিষয়টি ‘আজকের পত্রিকা’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আজকের পত্রিকার হেড অব স্পোর্টস রানা আব্বাস।
২ ঘণ্টা আগে
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন মালিকানাধীন আকিজ-বশির গ্রুপ শীতলক্ষ্যা নদী জবরদখল করে বালু দিয়ে ভরাট করছে। রাত-দিন তিনটি ড্রেজার দিয়ে বিরতিহীনভাবে নদী ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
২ ঘণ্টা আগে
কানের একটি বিকেলের কথা দিয়েই শুরু করি। সমুদ্রের পাশে ছোট ছোট পতাকা উড়ছে। পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ হাঁটছে। কেউ সিনেমা দেখতে যাচ্ছে, কেউ সিনেমা নিয়ে কথা বলছে, কেউ চুপচাপ কফি খাচ্ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা আসলে খুব বড় নয়। মানুষও খুব আলাদা নয়।
২ ঘণ্টা আগে
সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হলেও দুটিই শক্তিশালী গণমাধ্যম। উপগ্রহভিত্তিক টিভি চ্যানেলের প্রসার ঘটার আগপর্যন্ত সংবাদপত্রই ছিল প্রধান সংবাদমাধ্যম।
২ ঘণ্টা আগে