Ajker Patrika

নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল: উৎপাদন কমেছে ৭০ শতাংশ

  • প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ ৬০-৮০% পর্যন্ত কম
  • অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মঘণ্টা ও শিফট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে
মো. সাইদুল ইসলাম, নরসিংদী
নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল: উৎপাদন কমেছে ৭০ শতাংশ
গ্যাস-সংকটে গত দুই সপ্তাহে নরসিংদীর কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে অনেক কারখানা। গতকাল নরসিংদীর চৌয়ালা এলাকার চৌয়ালা ডাইং মিলে। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের মতো গ্যাস-সংকটে ভুগছে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল। কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ ৬০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম। ফলে গত দুই সপ্তাহে নরসিংদীর কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আবার কোথাও সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে।

নরসিংদীর মাধবদী, চৌয়ালা, শেখেরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ডাইং, ফিনিশিং, প্রিন্টিং, টেক্সটাইল, নিটিং, উইভিং, স্পিনিং, প্রসেসিংসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় শিল্পকারখানা। শিল্পমালিকেরা বলছেন, গ্যাসনির্ভর ছোট ছোট কারখানা চালাতে প্রায় ১৫ পিএসআই (প্রতি বর্গইঞ্চিতে গ্যাসের চাপ) প্রয়োজন। অথচ অনেক এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে ৩ পিএসআই। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ শূন্য। আর বড় ডাইং মিলে দরকার ৫০ পিএসআই। অথচ সেখানে বর্তমানে ২০ পিএসআই চাপও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ে কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যবসায়িক লেনদেনও উল্লেখযোগ্য হ্রাস পাচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে টেক্সটাইলসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিল্পমালিকেরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। গ্যাস-সংকট দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়ে ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস লিমিটেডের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, এই সংকট কবে নাগাদ কাটবে এবং তত দিন পর্যন্ত শিল্পমালিকেরা কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন, সে বিষয়ে সরকারকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলসের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, সংকট দ্রুত না কাটলে শ্রমিকদের বেতন কিংবা গ্যাস বিল—কোনোটিই ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারবেন না শিল্পমালিকেরা।

সবচেয়ে বেশি বিপাকে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মঘণ্টা ও শিফট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আয় কমে গেছে হাজারো শ্রমিকের। পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় কাটছে দিন। চৌয়ালা এলাকার সাগর নামের এক শ্রমিক জানান, ‘গ্যাস না থাকার কারণে ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। পরিবারে আমি একাই রোজগার করি। এভাবে চলতে থাকলে আমি বউ, বাচ্চা এবং বাবা-মাকে খাওয়াব কী?’

আবেদ টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ২০ দিন ধরে তাঁদের কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ।

চৌয়ালার একটি ডাইং কারখানার মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট কর্মীদের পাশাপাশি ভোগান্তিতে আছেন সাধারণ মানুষ। কারও কমেছে আয়, কারও বেড়েছে ব্যয়। নরসিংদী শিক্ষা চত্বরে সবজি বিক্রি করা আনিস নামে এক ব্যক্তি বলেন, গ্যাস না থাকায় অনেক মেসে ঠিকমতো রান্না হচ্ছে না। অনেকে মেস ছেড়ে বাড়িতে চলে গেছেন। ফলে বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও কমেছে।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আব্দুল মোমেন মোল্লা বলেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হবে।

শিল্পের পাশাপাশি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। জেলার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়।

রফিক মিয়া নামের এক সিএনজিচালক বলেন, নিয়মিত গ্যাস না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যাত্রীর চাপ বেশি, কিন্তু গ্যাস সরবরাহ কম। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আয়ও কমছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের এক বাসচালক বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে গাড়ি স্বাভাবিকভাবে চালাতে পারছেন না।

স্টার সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস) মো. শাহাবুদ্দিন জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তাঁরা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছেন না। এতে অনেক গ্রাহক ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন। কেউ কেউ স্বজনপ্রীতির অভিযোগও করছেন।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানায়, নরসিংদীতে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৩৬৫টি গ্যাস-সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আবাসিক খাতে প্রায় ২৭ হাজার গ্রাহক এবং ১৯টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস-সংযোগ রয়েছে। তিতাস গ্যাসের ঘোড়াশাল জোনাল বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। যেটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তার পুরোটাই ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্যাসের চাপ না বাড়লে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা প্রয়োজনের ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত