Ajker Patrika

৩ দিনের স্মরণোৎসবে মুখর হবে কুষ্টিয়ার লালনধাম

তামীম আদনান, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০: ২৭
৩ দিনের স্মরণোৎসবে মুখর হবে কুষ্টিয়ার লালনধাম
মরমি গান আর আত্মদর্শনের সাধনায় ব্যস্ত লালনধামে আগত সাধু ভক্তরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’—দেহ, মন ও আত্মার রহস্য অনুসন্ধানের এমন মরমি গানে আবারও মুখর হতে যাচ্ছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া। ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আগামীকাল শনিবার (১৭ অক্টোবর) তাঁর আখড়াবাড়িতে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব। এতে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু-বাউল, লালনভক্ত ও দর্শনার্থীরা সমবেত হয়েছেন।

লালনের অনুসারীদের কাছে এ আয়োজন কেবল স্মরণোৎসব নয়, বরং সাধুসঙ্গ, আত্মশুদ্ধি ও মনের মানুষের সন্ধানের এক আধ্যাত্মিক মিলনমেলা। তাঁদের বিশ্বাস, জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের অন্তরের সত্য ও মানবিকতাই বড়।

আগামীকাল সকালে অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল সাধুসঙ্গ। বিকেলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমি এ আয়োজন করেছে।

তিন দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাধুসঙ্গ, মরমি সংগীত পরিবেশনা ও গ্রামীণ মেলা।

দেহতত্ত্ব থেকে মানবতার দর্শন

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। তাঁর গান ও দর্শন আজও মানুষকে আত্মপরিচয়, মানবতা এবং পরম সত্যের অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত করে। ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ ও ‘জাত গেল জাত গেল বলে’—এমন অসংখ্য গানে তিনি জাত, দেহ, মন, আত্মা, গুরু ও পরম সত্তার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।

লালনের দর্শনের অন্যতম দিক হলো জাতপাত ও ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। তাঁর অনুসারীদের মতে, হানাহানি ও অসহিষ্ণুতার এই সময়ে সম্প্রীতি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় লালনের দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

লালন গবেষক হৃদয় সাহা বলেন, লালনের আধ্যাত্মিক গান আত্মশুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের পথ দেখায়। বর্তমান সময়ে হানাহানি ও অসহিষ্ণুতা দূর করতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাঁর মানবতাবাদী দর্শন সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। শুধু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে লালনের দর্শন নিয়ে গবেষণা ও চর্চা বাড়াতে হবে।

সাধুসঙ্গের পাশে গ্রামীণ মেলা

স্মরণোৎসব উপলক্ষে মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে আখড়াবাড়ির পাশে তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। পাশাপাশি বসেছে গ্রামীণ মেলা। সেখানে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আগামীকাল শনিবার সন্ধ্যা থেকে মঞ্চে লালনসংগীত পরিবেশনা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সাধুসঙ্গ ও মরমি গানের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরেও দর্শনার্থীদের মধ্যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

নিরাপত্তায় প্রশাসনের প্রস্তুতি

উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল ও সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। আজ শুক্রবার বিকেলে মাজার প্রাঙ্গণ ও মেলার স্থান পরিদর্শন করেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম ও জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান।

জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান বলেন, লালনের তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব শুধু কুষ্টিয়ার নয়, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা লালনধামে সমবেত হন।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত