Ajker Patrika

পুশ ইনের জন্য জড়ো

‘আমার সন্তানেরা অসুস্থ হয়ে গেছে, আমরা বাঁচতে চাই’

  • শূন্যরেখায় দুদিন ধরে সন্তানসহ দম্পতি।
  • ভালো সমাধান ছাড়া আসতে দেব না: বিজিবি
  • দৌলতপুর সীমান্তে ১২ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ।
  • পুশ ইনে ব্যর্থ হয়ে বিএসএফ পাটগ্রামে ককটেল ফাটাল।
আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম 
‘আমার সন্তানেরা অসুস্থ হয়ে গেছে, আমরা বাঁচতে চাই’
শূন্যরেখায় বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যদের মাঝখানে অবস্থানরত একটি পরিবার। গতকাল কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তে। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘আমার শিশুসন্তানেরা অসুস্থ হয়ে গেছে, তাদের চিকিৎসা দরকার। ঠিকমতো খাবারও খাওয়াতে পারছি না। ওদেরকে কীভাবে বাঁচাই! আমরা বাঁচতে চাই।’ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে ৬ মাস আর ৪ বছর বয়সী দুই শিশুসন্তান নিয়ে এভাবেই আকুতি জানান সুমি আক্তার। চোখে অসহায়ত্ব, মুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছাপ।

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে দুই দিন ধরে নিরুপায় বসে আছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি, তাঁদের দুই শিশুসন্তানসহ ছয়জন। বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টা আর বিজিবি ও গ্রামবাসীর পুশ ব্যাকের দৃঢ়তায় সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে আছে তাঁদের ভবিষ্যৎ।

গত রোববার সকাল ৬টার দিকে উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তপথে নারী-শিশুসহ ৬ জন এবং ইজলামারী সীমান্তপথে আরও ৩ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। কাঁটাতারের এপারে বাংলাদেশ প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হলেও বিজিবি এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধায় তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাঠাতে পারেনি বিএসএফ। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নারী-শিশুসহ ভুক্তভোগীরা সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছিলেন। ভারত কিংবা বাংলাদেশ—কোনো দেশেই ঠাঁই মেলেনি তাঁদের।

গয়টাপাড়া সীমান্তে দেখা গেছে, সীমান্তের শূন্যরেখার একদিকে বিএসএফ, অন্যদিকে বিজিবি। মাঝখানে দুই শিশুসন্তান নিয়ে অসহায় বসে আছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি। সুমির কোলে ৬ মাসের শিশুসন্তান ফাইমা আর বেলালের কোলে ৪ বছরের ফাতেমা। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি সয়ে দুই দিন ধরে এভাবে বসে আছেন তাঁরা।

সুমি আক্তার ও বেলালের দাবি, তাঁরা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা। কয়েক মাস আগে সিলেট সীমান্তপথে তাঁরা ভারতে পাড়ি জমান। পরে বিএসএফ তাঁদের ধরে নিয়ে গত রোববার ভোরে সীমান্তের কাঁটাতার পার করে দেয়। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় তাঁরা প্রবেশ করতে পারেননি।

সোমবার সীমান্তের শূন্যরেখায় ওই দম্পতির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি ও বিএসএফের বাধায় সামান্য দূরে অবস্থান করতে হয়। সাংবাদিক দেখতে পেয়ে সুমি বলেন, ‘আমাদের বাঁচতে দেন। কোন দেশে নেবেন নেন, কিন্তু এভাবে ফেলায় রাখিয়েন না। বাচ্চাগুলা মরে যাবে। আমরা বাঁচতে চাই।’

গয়টাপাড়া বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা গতকালের অবস্থানেই আছেন। তাঁরা শূন্যরেখার কাছে ভারতের প্রান্তে রয়েছেন। ওই প্রান্তে বিএসএফ এবং আমাদের প্রান্তে বিজিবি রয়েছে। গতকাল কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। অবস্থানকারীদের বিএসএফ কম্বল ও পলিথিন দিয়েছে। খাবারও দিয়েছে। এ ছাড়া আমাদের এখানকার লোকজন খাবার ও ছাতা দিয়েছেন।’

শিশুদের অসুস্থতার প্রশ্নে এই বিজিবি সদস্য বলেন, ‘এমনিতে তারা ভালো আছে। কিন্তু গরমে একটু সমস্যা হচ্ছে।’

জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘সীমান্তে জড়ো করা নারী-শিশুসহ অন্যরা আগের স্থানেই অবস্থান করছে। ইন্ডিয়া পুশ করেছে, আমরা আসতে দিইনি। আপাতত আসতে দেব না; যতক্ষণ পর্যন্ত না একটা ভালো সমাধানে আসছে।’

১২ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে গতকাল সকালে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সীমান্তে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় গ্রামবাসীর মুখোমুখি অবস্থানের একপর্যায়ে বিজিবি ও বাংলাদেশি গ্রামবাসীদের দৃঢ় অবস্থানের মুখে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরে তাৎক্ষণিকভাবে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কমান্ডিং পর্যায়ে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিএসএফ তাদের পুশ ইনের চেষ্টা করা ১২ নারী ও শিশুকে ভারতীয় কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

পাটগ্রামে ককটেল বিস্ফোরণ

এদিকে পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি জানান, পাটগ্রামের সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টা প্রতিহত করেছেন বিজিবি সদস্য ও স্থানীয়রা। পুশ ইনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে সীমান্তে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। গত রোববার রাত সাড়ে ৯টায় এ ঘটনা ঘটে।

৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের (তিস্তা-২) সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক সোমবার সকালে বিএসএফ কর্তৃক পুশ ইনের চেষ্টার তথ্য নিশ্চিত করলেও ককটেল বিস্ফোরণের কোনো তথ্য জানা নেই বলে জানান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত