Ajker Patrika

খুলনা অঞ্চল: বিএনপির বিভেদে জামায়াতের উত্থান

  • ১০ জেলার ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী
  • বিএনপি জাতীয়ভাবে নিরঙ্কুশ জয় পেলেও এই বিভাগে পেয়েছে মাত্র ১১ আসন
  • মনোনয়নবঞ্চিতদের বিভেদের কথা বলছেন স্থানীয় ভোটার ও নেতারা
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা 
খুলনা অঞ্চল: বিএনপির বিভেদে জামায়াতের উত্থান

এবারের নির্বাচনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার ৩৬টি আসনের মধ্যে রেকর্ড ২৫টিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ভোটে জাতীয়ভাবে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও এই বিভাগে দলীয় প্রার্থীরা জয় পেয়েছে মাত্র ১১টি আসনে। বিভাগে ভোটের এই ফলকে এ অঞ্চলে জামায়াতের বড় উত্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেশির ভাগ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) ও আওয়ামী লীগের ভোট টানতে না পারা বিএনপির পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে তিনটি জেলায়—মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরায় একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে জামায়াত। আর যশোরের ছয়টি আসনের পাঁচটিতে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। একটিতে বিএনপি জয়লাভ করলেও জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান সামান্য।

এ অঞ্চলে বিএনপির ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে মনোনয়ন যথাযথ না হওয়ার পাশাপাশি মনোনয়নবঞ্চিতদের বিভেদের কথা বলছেন স্থানীয় ভোটার ও নেতারা।

যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘যশোরের মতো জায়গায় জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানটা আমাদের জন্য উদ্বেগের। বিষয়টি কষ্টকরও বটে। পরাজয় নিয়ে নানা কারণ খুঁজে বের করছি আমরা। কিছু কিছু নেতা মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে মাঠে না থাকার অভিযোগ আছে। আবার মাঠে না থাকার প্রভাবও পড়েছে।’

যশোর-১ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি। পরে তাঁকে বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনকে। এরপর ক্ষোভে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান তৃপ্তির অনুসারীরা। মাঠে সেভাবে কাজ করতে দেখা যায়নি সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধু ও বর্তমান সভাপতি হাসান জহিরের অনুসারীদের।

নেতা-কর্মীরা বলছেন, আসনটিতে অভিজ্ঞ ও পরিচিত প্রার্থী জামায়াতের আজিজুর রহমান। তাঁর বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী একেবারেই তরুণ নুরুজ্জামান লিটন। দলীয় নেতা-কর্মী ছাড়া সাধারণ ভোটারদের কাছে তেমন একটা পরিচিত নন। এ জন্য হেরেছেন।

প্রার্থী বদল করে যশোর-১-এর মতো বিএনপি ধরাশায়ী হয়েছে যশোর-৬ আসনেও। যশোর-৫, যশোর-২ এবং যশোর-৪ আসনেও একই কারণে পরাজয় বলে দলের নেতা-কর্মীদের মত।

এমনকি বিএনপির ‘দুর্গখ্যাত’ ঝিনাইদহের চারটি আসনেরও তিনটিতেই জয় পেয়েছে জামায়াত।

এ ছাড়া বাগেরহাটের তিনটি, কুষ্টিয়ার তিনটি এবং নড়াইলের একটিতে জামায়াতের কাছে হেরে যায় বিএনপির প্রার্থীরা। এসব আসনেও বিএনপির পরাজয়ের পেছনে একই ধরনের কারণের কথা জানালেন বিএনপি প্রার্থীদের অনুসারীরা।

দলীয় সূত্র বলছে, খুলনা-২ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী চারটি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছে। এবার আসনটি থেকে প্রার্থী হন মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের বিজয়ের সময়ও তিনি এমপি নির্বাচিত হয়ে সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করেছেন।

অন্যদিকে আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন দলটির মহানগর সেক্রেটারি শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। এর আগে খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন তিনি।

মঞ্জুর পরাজয়ের কারণ হিসেবে বিশ্লেষক ও দলের নেতারা বলছেন, বয়সে ১৭ বছর ছোট জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালকে নিয়ে নির্ভার ছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। বিএনপি নেতারাও একচেটিয়া বিজয়ের আশায় ছিলেন। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং দলের বড় একটি অংশের বিরোধিতার কারণে পরাজিত হয়েছেন মঞ্জু।

তবে দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নেতারা পরাজয়ের কারণ হিসেবে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের অভিযোগ তুলছেন।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক সেকেন্দার আলী খান সাচ্চু বলেন, ‘কোন্দলের জন্য ইফেক্ট পড়েছে বেশি। নির্বাচনের আগে আমরা দুই অংশ এক হলেও সবাই সেভাবে কাজ করেনি। এ ছাড়া ধর্মীয় কারণ, প্রতারণায় পড়ে অনেকে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘দুই পক্ষকে নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি করলেও নেতৃত্ব ছিল মঞ্জু অনুসারীদের হাতেই। তাঁরা ওয়ার্ড পর্যায়ের বর্তমান নেতাদের মূল্যায়নই করতেন না। কেন্দ্রভিত্তিক বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটের কাজ তেমন হয়নি।’

তবে মহানগর বিএনপির বর্তমান সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘দলের বিভেদের বিষয়টি সম্পূর্ণ মনগড়া। আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করছি। হারের কারণ আমরাও খুঁজছি।’

মঞ্জুর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘অনেক নেটওয়ার্ক মঞ্জুকে হারাতে কাজ করেছে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পোলিং অফিসারও এতে জড়িত।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত