Ajker Patrika

খুলনায় অপরাধ: পথে পথে চাঁদা, কথায় কথায় খুন

• চলতি বছর ১০ মাসে ৭৫ জন খুন হয়েছে।

• নগরীতে ৩৭ এবং জেলায় ৩৮ জন।

• সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি পুলিশ কর্মকর্তাও।

• চাঁদায় অতিষ্ঠ চিকিৎসকেরা চেম্বার বন্ধ করে আত্মগোপনে।

কাজী শামিম আহমেদ, খুলনা
খুলনায় অপরাধ: পথে পথে চাঁদা, কথায় কথায় খুন
প্রতীকী ছবি

খুলনা নগরীর কমার্স কলেজের পাশে এক চিকিৎসকের কাছে ৩ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল এই অঞ্চলের শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বি কোম্পানি’। ভয়ে থানায় কোনো অভিযোগ না দিয়ে চেম্বার বন্ধ রেখে আত্মগোপনে আছেন তিনি। ওই এলাকার আরও এক চিকিৎসকের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল; ভয়ে তিনি ভারতে চলে গেছেন। বড় অঙ্কের চাঁদা চাওয়ায় আরও এক চিকিৎসক আত্মগোপনে আছেন।

আবার সন্ধানী ক্লিনিকের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে ভাঙচুর ও গুলির ঘটনার পর ১ কোটি টাকায় ‘বি কোম্পানি’র সঙ্গে সমঝোতা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি। পরে খুলনা সদর থানা-পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। এ ছাড়া এক সাব-রেজিস্ট্রারকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মাসে মাসে চাঁদা দেওয়ার শর্তে তিনি ছাড়া পেয়েছেন বলে জানা যায়।

খুলনায় এ রকম অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চাঁদাবাজির শিকার। চাঁদাবাজদের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা। নগরী ও জেলার পথে পথে যেন চাঁদা চাইছে সন্ত্রাসীরা। না পেলে করা হচ্ছে গুলি। হাতে গোনা কেউ কেউ প্রাণে বাঁচলেও নিহতের সংখ্যাই বেশি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ১০ মাসে চাঁদাবাজি, মাদক, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা ঘটনায় নগরীতে ৩৭টি এবং জেলায় ৩৮টি খুনের ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি পুলিশ কর্মকর্তাও। গত ৯ অক্টোবর পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা।

চেষ্টা করেও খুলনার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের অভিযোগ, ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করতে চাইছে না। খুলনা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলছেন, সন্ত্রাসীরা জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধে যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৮ অক্টোবর ২০ লাখ টাকা ও ১০টি মোটরসাইকেল চাঁদা চেয়ে নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের ‘চয়নিকা’ ফার্মেসির ম্যানেজার বাবুকে হুমকি দেয় খুলনার শীর্ষ একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। এ ঘটনার পর ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে গা ঢাকা দিয়েছেন। দোকানটি বর্তমানে বন্ধ। একই দিনে সন্ধ্যায় নগরীর আহসান আহমেদ রোডের চায়নিজ প্যালেসে ভাঙচুর চালায় সন্ত্রাসীরা।

এ ছাড়া ২৪ অক্টোবর ১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে নগরীর বাবু খান রোডে সন্ধানী ক্লিনিকে ভাঙচুর ও গুলি চালানো হয়। পরদিন সোনাডাঙ্গায় সন্ধানী ক্লিনিকের দ্বিতীয় শাখায় সশস্ত্র মহড়া দেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার দুই দিন পর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আপস করে ক্লিনিক আবার চালু করে কর্তৃপক্ষ।

গত ২৬ অক্টোবর খুলনার পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহসানারা বিনতে আহমেদের কাছে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। ‘হয় অর্থ, নয় রক্ত’ এমন হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই কর্মকর্তা স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর পুলিশ দুজনকে আটক করে। বর্তমানে আতঙ্কে আছেন বলে জানান ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

গত ২৫ অক্টোবর মোটা অঙ্কের চাঁদা চেয়ে পাইকগাছা থানা আইনজীবী সমিতির সভাপতি জি এম আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক জি এম আক্কাস আলীকে আলাদাভাবে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়। তাঁরা দুজন থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

গত ২৪ অক্টোবর দুর্বৃত্তের গুলিতে ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু (৪৫) নামের এক প্রভাষক আহত হন। ২৭ অক্টোবর নিরালায় সিগারেট কোম্পানির পিয়ন সালমানকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ২৬ অক্টোবর জেলার বটিয়াঘাটায় যুবদল কর্মী সোহেল এবং ২৭ অক্টোবর যুবদল সভাপতি অহিদুল ইসলাম বাদলকে গুলি করা হয়। বর্তমানে তাঁরা ঢাকায় চিকিৎসাধীন।

এমনকি নারীদেরও গুলি করার ঘটনা ঘটেছে। গত ২২ অক্টোবর নগরীর লবণচরা থানার জিন্নাপাড়া এলাকায় ব্লেড বাবুর স্ত্রী খুশিকে গুলি করা হয়।

২২ সন্ত্রাসী গ্রুপ ও কিশোর গ্যাং

খুলনায় ২২টি সন্ত্রাসী সংগঠন, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিটি গ্রুপই পুলিশের তালিকাভুক্ত। সংগঠনগুলো হচ্ছে রনি চৌধুরী ওরফে বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন বি কোম্পানি, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, গোল্ডেন বয়েজ, টিপসি বয়েজ, কিং অব রূপসা, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, ডেঞ্জার বয়েজ, টেঙ্কি শাওন গ্রুপ, আরমান ওরফে আরমিন গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, সেভেন স্টার, নাইন্টিন বয়েজ, ব্লাড বয়েজ, ব্ল্যাক ইগল, ডার্ক নাইটস, সিন্ডিকেট, চিংড়ি পলাশ গ্রুপ, শিপলু ওরফে রকি গ্রুপ এবং সিনবাদ গ্রুপ। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে বি কোম্পানি।

খুলনার নাগরিক নেতা বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতিতে তাঁরা বাক্‌রুদ্ধ। প্রতিটি এলাকায় চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রায় প্রত্যেক নাগরিক চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। শহরে বেড়েছে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এমন কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না?’

বাবুল হাওলাদারের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতানুগতিক বক্তব্যে নগরবাসীর মনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে খুলনাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে এখানে প্রশাসনের জনবল বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

পুলিশ যা বলছে

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘খুলনায় মাদককেন্দ্রিক অপরাধপ্রবণতাই বেশি। অনেক ক্ষেত্রে বস্তি এলাকায় কিশোর-তরুণদের মাধ্যমে অপরাধ সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়। পুলিশ অপরাধীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে।’

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, জেলায় সন্ত্রাস দমনে ব্লক রেড, স্পট রেড এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালিকা ধরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। খুলনার সব হত্যাকাণ্ড মাদক কারবার নিয়ে ঘটছে। মাদক স্পটগুলোতে হানা দেওয়া হচ্ছে। দাগি আসামিরা যাতে দ্রুত জামিন না পায়, সে জন্য বিচার বিভাগের সাথে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

দ্রুততম সময়ে সব সন্ত্রাস দমন করে খুলনাকে শান্তির নগরীতে পরিণত করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত