Ajker Patrika

যশোর-সাতক্ষীরার ১০ আসন: অন্তঃকোন্দলে ‘ভরাডুবি’

  • ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ দুই জেলার ৯টি আসনই হাতছাড়া হয়ে গেছে বিএনপির
  • সাতক্ষীরার চারটি আসনের সব কটিতেই জামায়াতের জয়
  • সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতা-কর্মীদের বিভক্তিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা
জাহিদ হাসান, যশোর আবুল কাশেম, সাতক্ষীরা
যশোর-সাতক্ষীরার ১০ আসন: অন্তঃকোন্দলে ‘ভরাডুবি’
প্রতীকী ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিজয়ী হলেও কিছু কিছু এলাকায় দলের প্রার্থীদের পরাজয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনের চারটিতেই এবং যশোরের ছয়টি আসনের পাঁচটিতে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। এসব আসনে বিএনপির পরাজয় নিয়ে দলের নেতারাও উদ্বিগ্ন।

ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে চলছে দল দুটির প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ। যশোরের স্থানীয় ভোটার ও নেতা-কর্মীরা বলছেন, মনোনয়ন যথাযথ না হওয়া এবং মনোনয়নবঞ্চিতদের বিভেদে জেলায় বিএনপির প্রার্থীদের এই পরাজয়।

যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘যশোরের মতো জায়গায় জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানটা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কষ্টকরও বটে। পরাজয় নিয়ে নানা কারণ খুঁজে বের করছি আমরা।’ তিনি বলেন, কিছু কিছু নেতা মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে মাঠে না থাকার অভিযোগ উঠেছে। মাঠে না থাকার প্রভাবও পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যশোর-১ (শার্শা) আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি। পরবর্তী সময়ে তাঁকে বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনকে। এতে ক্ষোভে তৃপ্তির অনুসারীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান বলে জানা গেছে। মাঠে সেভাবে কাজ করতে দেখা যায়নি সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধু ও বর্তমান সভাপতি হাসান জহিরের অনুসারীদেরও।

নেতা-কর্মীরা বলছেন, আসনটিতে অভিজ্ঞ ও পরিচিত প্রার্থী জামায়াতের আজিজুর রহমান। তাঁর বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী একেবারেই তরুণ নুরুজ্জামান লিটন। দলীয় নেতা-কর্মী ছাড়া সাধারণ ভোটারদের কাছে তেমন একটা পরিচিত নন তিনি।

স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, শার্শার রাজনীতিতে তৃপ্তি, হাসান জহির, কিংবা মধুর মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মনোনয়ন না দেওয়ায় আসনটিতে ধরাশায়ী হয়েছে বিএনপি।

শার্শার মতো যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনেও প্রার্থী বদল করায় বিএনপির পরাজয় হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। আসনটিতে প্রথমে মনোনয়ন পান ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ। পরে তাঁকে বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় উপজেলা সভাপতি আবুল হোসেন আজাদকে। নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটাররা বলছেন, শ্রাবণ দলীয়প্রধান তারেক রহমানের আস্থাভাজন। তিনি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা উজ্জ্বীবিত হন। পরে আজাদ চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলে বিএনপির বড় একটি অংশ নাখোশ হয়।

যশোর-৫ মনিরামপুরে দলীয় মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল। পরবর্তী সময়ে তাঁকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয় জমিয়তে উলামায়ের কেন্দ্রীয় নেতা রশিদ আহম্মাদকে। দলের বড় একটি অংশের নেতা-কর্মীদের নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন শহীদ ইকবাল। এতে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন।

খুলনা বিভাগে বিএনপির একমাত্র নারী প্রার্থী ছিলেন যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে সাবিরা সুলতানা। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন হাফ ডজন নেতা। সাবিরার মনোনয়ন বাতিল চেয়ে বিক্ষোভ, দলীয় হাইকমান্ডের কাছে স্মারকলিপিও দেন মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা। ফলে দলীয় প্রার্থী ও বঞ্চিতদের মধ্যে ‘গ্রুপিং’ প্রকট হয়ে ওঠে। বঞ্চিত প্রার্থীরা সাবিরার পাশে ছিলেন না। দলীয় গ্রপিং ও মনোনয়নবঞ্চিতদের অসহযোগিতায় আসনটিতে জয় হয়নি বলে মনে করছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা।

সাবিরা সুলতানা বলেন, ‘প্রথম থেকেই জেলা ও উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব পর্যায়ের কারও সহযোগিতা পাইনি। দলীয় গ্রুপিংয়ের সঙ্গে ভোটের মাঠে জামায়াতের প্রার্থীর টাকার ছড়াছড়িতে আমার পরাজয় হয়েছে।’

যশোর-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন কৃষক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টি এস আইয়ুব। ঋণখেলাপিতে তাঁর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় কপাল খোলে অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার ফারাজীর। ফারাজী মনোনয়ন পেলে ভোটের মাঠে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান টি এস আইয়ুবের অনুসারীরা।

যশোর জেলায় একটি মাত্র আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। সেটি হলো যশোর-৩ (সদর)। এই আসনে দলের প্রার্থী ছিলেন খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

এদিকে সাতক্ষীরা জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মিজ্ আফরোজা আক্তার জানান, জেলায় ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

সাতক্ষীরায় বিএনপির প্রার্থীদের কেউই জয় না পাওয়ায় চলছে নানা আলোচনা। কারণ হিসেবে দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রান্তিক পর্যায়ের ভোটারদের মূল্যায়ন না করা, বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, ৫ আগস্টের আগে-পরে কর্মীদের খোঁজখবর না রাখা ও প্রার্থী নির্বাচন সঠিক না হওয়াকে দায়ী করছেন অনেকে।

জানতে চাইলে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমতুল্লাহ পলাশ বলেন, ‘চারটি আসনেই পরাজয় সাংগঠনিক দুর্বলতা বলে মানছি। কিন্তু অন্যান্য যেকোনো সময়ের তুলনায় চারটি আসনে অনেক বেশি ভোট পেয়েছে বিএনপি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত