Ajker Patrika

সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ: চর চান নেতা, স্থানীয়দের ক্ষোভ

  • ধাঁধার চরে ৪৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ
  • প্রায় ২৪০ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়েছেন বিএনপির সাবেক ওই নেতা
  • আবেদনে রয়েছে ৩০ একরের বেশি নদীর জমি
  • শত শত পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল ধাঁধার চরের ওপর
রাতুল মণ্ডল, শ্রীপুর (গাজীপুর)  
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ: চর চান নেতা, স্থানীয়দের ক্ষোভ
গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাণীগঞ্জে অবস্থিত ধাঁধার চর। এখানে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করতে চায় সাননোভা এনার্জি ওপিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘এই চর আমরা হাতছাড়া হতে দেব না’—শীতলক্ষ্যা-ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলে জেগে ওঠা ধাঁধার চর নিয়ে এমনই ক্ষোভ স্থানীয়দের। তাঁদের জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, গবাদিপশু পালন ও পাখির আবাসস্থল এই চরে ৪৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। আর এই প্রকল্পের জন্য ধাঁধার চরসহ প্রায় ২৪০ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন বিএনপির সাবেক নেতা ও সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে তাঁদের জীবিকা ও চরকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটনের সম্ভাবনা যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

গাজীপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সাননোভা এনার্জির পক্ষে পরিচালক কামাল জামান মোল্লা স্বাক্ষরিত পত্রে গত ১৬ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। আবেদনে অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত চাওয়া হয়। জেলার কাপাসিয়া উপজেলার ধাঁধার চর মৌজায় ৪৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করতে চান বিএনপির সাবেক এই নেতা। এ জন্য তিনি ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন। যার মধ্যে ৩০ একরের বেশি নদীর জায়গাও রয়েছে।

লিখিত আবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানিনীতি এবং সবুজ শক্তি প্রসারের রূপকল্প বাস্তবায়নে সাননোভা এনার্জি ওপিসি অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বৃহৎ প্রকল্প নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বৈদেশিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য নিম্ন তফসিলভুক্ত খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত প্রয়োজন।

জানা গেছে, কাপাসিয়ার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জ ধাঁধার চর মৌজার নদী শিকস্তি ও নাল শ্রেণির জমি রয়েছে। নদী শ্রেণির দুটি দাগে জমির পরিমাণ ৩০ দশমিক ৭০ একর, বালুচর শ্রেণির তিনটি দাগে ১৩ দশমিক ৬৩ একর, শিকস্তি ভূমি শ্রেণির ১০৬ দাগে ৪৫ দশমিক ৮২ একর এবং নাল শ্রেণির ৯০ দাগে ১৫২ দশমিক ১৫ একর জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ নাল, শিকস্তি ভূমি ১৯ শতাংশ, নদীর জমি প্রায় ১৩ শতাংশ এবং বালুচর ৬ শতাংশ।

সাননোভা এনার্জি ওপিসির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। গত সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পান তিনি। পরদিন সেটি স্থগিত করা হয়। পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোটে হারলে দল তাঁকে বহিষ্কার করে। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ছিলেন।

ঘিঘাট গ্রামের বাসিন্দা জাহিদুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘এই চর আমাদের রুটি-রুজির জোগান দেয়। এই চরে ৩০০ পরিবারের জীবন-জীবিকা। এখানে বিভিন্ন ধরনের কৃষি উৎপাদন করা হয়। এটি একটি পর্যটনকেন্দ্র। এখানে প্রচুর পরিমাণ পাখির আবাসস্থল। পাখির কিচিরমিচির শব্দে আশপাশ মুখরিত হয়। প্রশাসনের পক্ষে পাখির বংশবৃদ্ধির জন্য বাসা তৈরি করে দেওয়া হয়। এই চর আমরা হাতছাড়া হতে দেব না।’

বাসিন্দা জহিরুল হক আঙ্গুর বলেন, ‘সকাল হলেই অর্ধশতাধিক নৌকা নিয়ে ধাঁধার চরে যায় শত শত মানুষ। সেখানে ৫০০ পরিবারের জীবিকা। আম, জাম, পেয়ারা, বরইসহ বিভিন্ন ফল উৎপাদন হয়। ধান, গম, আখ, বাদামসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হয়। এই জমিতে কোনোভাবেই কিছু করতে দেওয়া হবে না।’

সরেজমিনে দেখা যায়, দুই পাশে নদী। মাঝখানে ঘন সবুজ গাছপালা। বিভিন্ন ফসলি জমি। জমিতে কাজ করছেন কৃষকেরা। নৌকাযোগে কৃষকেরা যাচ্ছে চরে। গবাদিপশুর জন্য তৈরি করা হয়েছে বেশ কিছু ছোট-বড় গোয়ালঘর। কেউ মাঠে কাজ করছেন। কেউ গবাদিপশুর যত্ন করছেন। কেউ কেউ ফসলের পরিচর্যা করছেন। কেউ কেউ ফলমূল সংগ্রহ করছেন বাজারজাত করতে। কোথাও ঘাস-লতাগুল্মে ঢাকা জায়গা, আবার কোথাও ঝোপঝাড় দেখা যায়। এসব ঝোপঝাড় ও গাছপালায় ছুটে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, ‘ধাঁধার চরের অধিকাংশ ভূমি নদী, বালুচর ও শিকস্তি ভূমি শ্রেণিভুক্ত। নদী ও নদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ ধরনের ভূমি জনস্বার্থ ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় অত্যন্ত সংবেদনশীল। নদী একটি পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি, তাই নদী ও নদীসংলগ্ন ভূমি কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে বন্দোবস্ত দেওয়ার আগে এর পরিবেশগত ও জনস্বার্থগত বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি। আইন অনুযায়ী নদী ও নদীর সংলগ্ন ভূমি বন্দোবস্তযোগ্য নয়। আমার বিশ্বাস, জেলা প্রশাসন এ ধরনের ভূমি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বন্দোবস্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন ও পরিবেশগত বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনা করবে।’

এ বিষয়ে জানতে সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লাকে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

কাপাসিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক বলেন, ‘ধাঁধার চর মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি রয়েছে। এসব জমির শ্রেণি নদী, শিকস্তি ভূমি, নাল, ছনখোলা, বালুচর ও লায়েক পতিত। বন্দোবস্তের জন্য আবেদনের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলমান। সেটি জেলা প্রশাসকের অনুকূলে পাঠানো হবে।’

জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘ধাঁধার চরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি বন্দোবস্ত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই ভূমি ইজারা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত