‘স্ত্রী আমার সঙ্গে থাকলে তাঁকে নিয়ে বের হতে পারতাম’

সকালে সবাই ঘুমাচ্ছিল। কারণ, রাতে সবাই জেগে আড্ডা দিয়েছিল। তাই সকালে আগুন নিচের দিক থেকে ওপরে ছড়িয়ে পড়লেও টুপটুপ রিসোর্টের অতিথিরা কেউ টের পাননি। আগুন যখন ছড়িয়ে পড়ে দোতলা ও তিনতলায়, তখন কেউ দরজা খুলে বের হতে পারেননি। কয়েকজন আগুনের মধ্য দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে দোতলা থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আশিকুর রহমান নামের একজন রয়েছেন। তিনি গুরুতর আহত হন। তিনি একজন প্রকৌশলী। এ সময় তাঁর স্ত্রীসহ একই পরিবারের ছয়জন নিহত হয়েছেন।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন আশিকুর রহমানের স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (২৯), মালিহার বোন লাইলা জাহান নাবিলা (২৫), মালিহার খালাতো বোন মেলিতা মেহজাবিন (২৩) ও ফারিহা কবির (৩৩), ফারিয়ার ছেলে ফাইজান নূর (৭) এবং তাঁর ভাই নাফিস তেহামি জেরিফ (২৪)। নিহত ব্যক্তিরা সবাই খালাতো ভাইবোন এবং তাঁদের সন্তান।
রিসোর্ট থেকে বের হতে পেরেছিলেন মেহেরুন নেসা মিলা, তাঁর স্বামী মাসুদ। তাঁরা দুজন ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন।
নিহত মালিহার স্বামী প্রকৌশলী আশিকুর রহমান লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন।

তাঁদের সবার বাসা রাজধানীর খিলগাঁও থানার পশ্চিম নন্দীপাড়ায়। ওই বাসায় আজ শনিবার রাতে গিয়ে তিনতলায় দেখা যায়, স্বজনেরা আহাজারি করছেন। নিহত মালিহার স্বামী আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা রাত সাড়ে ৪টার দিকে খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। সকালের দিকে সবাই ঘুমে ছিল। আমার স্ত্রী পাশের রুমে তাঁদের বোনদের সঙ্গে কথা বলার জন্য যায়। সকালে হঠাৎ আগুনের তাপ টের পাই। এরপর দরজা খোলার চেষ্টা করি। কিন্তু দরজা খুলতে পারছিলাম না। পরে গ্লাস ভেঙে দোতলা থেকে লাফিয়ে নিচতলায় পড়ি। আমার স্ত্রী পাশের রুমে যাওয়ায় তাঁকে আর বের করতে পারিনি। ভেতরে আগুন আর ধোঁয়ায় কোনো কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।’
আশিকুর রহমান বলেন, ‘স্ত্রী আমার সঙ্গে থাকলে তাঁকে নিয়ে বের হতে পারতাম। কিন্তু সে পাশের রুমে তাঁর বোনদের কাছে ব্যাগ আনতে গিয়েছিল। কারণ, আমাদের আজ শনিবার রাতে ঢাকায় ফিরে আসার কথা ছিল।’

গত বুধবার পশ্চিম নন্দীপাড়ার ওই বাড়ির খালাতো ভাইবোন এবং তাঁদের স্বামী-সন্তানসহ ১০ জন কক্সবাজারে ঘুরতে যান। বৃহস্পতি ও শুক্রবার তাঁরা দুই দিন কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় ঘুরে বেড়ান। আজ শনিবার সকাল ৭টা ২৫ মিনিটের দিকে কক্সবাজার ইনানী বিচের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ছয়জন মারা যান।
রাতে নন্দীপাড়ার ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা আহাজারি করছেন।
নিহত মালিহা ও নাবিলার মা রোকসানা আক্তার রিনা আজকের পত্রিকাকে বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাত ৪টার দিকে দুই মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। এ সময় মেয়েরা বলছিল, তারা খাচ্ছে। খাওয়া শেষ করে ফোন দেবে। তবে সেই ফোন ছিল শেষ ফোন। আর কোনো কথা হয়নি তাঁদের সঙ্গে। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

নিহত মালিহা ও নাবিলার বড় খালা কাজল রেখার মেয়ে ফারিহা কবির ও ছেলে নাফিস তেহামী এবং ফারিয়া কবিরের সাত বছর বয়সী ছেলে ফাইয়াজ নূর আগুনে পুড়ে মারা যায়। এই ঘটনার এক দিন আগে ফারিয়া কবিরের স্বামী নূরে আলম ঢাকায় ফিরে আসেন তাঁর অফিসের কাজ থাকায়। এতে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। ফারিয়া কবিরের গ্রামের বাড়ি বরগুনার তালতলীতে।
তাঁর বাবা মো. জিহাদুল ইসলাম যুব উন্নয়নের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘তাঁর বড় মেয়ে ফারিয়া কবির নিউরো সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁকে মানসিকভাবে সহায়তা দেওয়ার জন্য খালাতো বোনেরা সবাই মিলে কক্সবাজার সফরের আয়োজন করে। বোনকে সুস্থ করতে কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়ে সবাই মারা গেল।’ তিনি বলেন, তাঁর দুই ছেলেমেয়ে। ফারিয়া কবির ও ছেলে নাফিস তেহামী। নাফিস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিল।
নিহত মেলিতা মেহেজাবিন আলভী হলেন মালিহা ও নাবিলার ছোট খালা নুর নাহার স্বপ্নার বড় মেয়ে। মেলিতা ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
নিহতরা তিন বোনের সন্তান ও নাতি। বড় বোন কাজল রেখার এক মেয়ে, এক ছেলে এবং মেয়ের ঘরে নাতনি, মেজ বোন রোকসানা আক্তার রিনার দুই মেয়ে এবং ছোট বোন নুর নাহার স্বপ্নার এক মেয়ে।
তিন বোনের মধ্যে নন্দীপাড়ার পাঁচতলা বাড়ির তিনতলায় মেজ বোন ও চতুর্থ তলায় ছোট বোন তাঁদের পরিবার নিয়ে থাকেন। বড় বোন কাজল রেখা বরগুনায় থাকেন।
ঘটনার খবর শুনে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরা ওই বাড়িতে ভিড় করেন দুপুর থেকে। নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। লাশ দ্রুত যাতে ফেরত পান, সে জন্য তাঁরা প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।











