মৎস্য খাতে অবহেলিত প্রায় দুই কোটি শ্রমিক, আইনি সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের দাবি

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। প্রায় ১৪ লক্ষ নারীসহ এই বিশাল জনগোষ্ঠী সরাসরি মৎস্য আহরণ ও চাষে নিয়োজিত থাকলেও তাদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। আইনগত সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা অপ্রতুল থাকায় এই শ্রমজীবী মানুষগুলো সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূলস্রোত থেকে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকার একটি হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় সংলাপে’ এসব তথ্য জানানো হয়। সংলাপ আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং (এফইএস)।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিলসের সিনিয়র কর্মকর্তা রেজোয়ানুল হক আজম। তিনি বলেন, মৎস্য খাতে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মে নিয়োজিত হওয়ার বিষয়টি এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে শ্রম অধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘন ঘটছে। চিংড়ি ও ট্রলার ইন্ডাস্ট্রি ছাড়া অন্য কোনো সেক্টরে নির্দিষ্ট কোনো মজুরি কাঠামো নেই। সিংহভাগ শ্রমিকই শ্রম আইন ও শ্রম পরিদর্শনের বাইরে অবস্থান করছেন। এ ছাড়া অধিকাংশ শ্রমিকের জন্য কোনো নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা কিংবা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) নির্ধারিত না থাকায় তাদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মৎস্যজীবীদের সমস্যা বহুমাত্রিক ও গভীর। জীবনের ঝুঁকিতে লবণাক্ত পানিতে নারী শ্রমিকদের কাজ করা, অবরোধকালীন উপার্জন বন্ধ থাকা এবং পেটের দায়ে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেদের জেল-জরিমানা হওয়ার মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত অমানবিক।’ মাছ ধরা বন্ধের সায়েন্টিফিক সময় পুনর্মূল্যায়ন করা, হাওর, নদী ও সামুদ্রিক জেলেদের জন্য পৃথক নীতি প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে মৎস্যজীবীদের সুরক্ষায় নীতি ও আইন প্রণয়নের সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যতম সুপারিশের মধ্যে রয়েছে আইনগত স্বীকৃতি; সকল মৎস্য শ্রমিককে শ্রম আইনের আওতায় আনা এবং ‘মৎস্য শ্রমিক’ হিসেবে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও পরিচয় নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা; দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মনিটরিং জোরদার করা, নদ-নদী ও সাগরে ভাসমান হাসপাতাল স্থাপন এবং নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ; জাতীয় পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্তি, রেশনিং ব্যবস্থা চালু, বজ্রপাত ও দুর্ঘটনায় নিহত-আহতদের ক্ষতিপূরণ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করা। ট্রেড ইউনিয়ন ও আইনি অধিকার; শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও দর–কষাকষির সুযোগ সহজ করা এবং মাঠ পর্যায়ে অধিকার সচেতনতা সভা বৃদ্ধি করা। বিকল্প কর্মসংস্থান ও আবাসন; মাছ ধরা নিষিদ্ধের মৌসুমে বিকল্প আয়ের সুযোগ, নদীর পাড়ে আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং শিশুশ্রম সম্পূর্ণ দূর করা।
জাতীয় মৎস্য শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক নাইমুল আহসান জুয়েলের সভাপতিত্বে সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন বিলসের পরিচালক নাজমা ইয়াসমিন, আইএলও’র সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মাহমুদুল ইসলাম খান, বিলসের নির্বাহী সদস্য মুজিবুর রহমান, পুলক রঞ্জন ধর, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শামীম আরা, ন্যাশনাল ফিশিং ওয়ার্কার্স রাইট ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাকির হোসেন, বাংলাদেশ মুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ বাদল, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল প্রমুখ।









