Ajker Patrika

বিমানের সাবেক এমডির বাসায় শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের যে বর্ণনা দিলেন আদালত

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
বিমানের সাবেক এমডির বাসায় শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের যে বর্ণনা দিলেন আদালত
ছবি: সংগৃহীত

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য সাবেক এমডি সাফিকুর রহমানের বাসার শিশু গৃহকর্মীকে থাকতে দেওয়া হতো বাথরুমে। দীর্ঘক্ষণ পানির সংস্পর্শে থাকায় তার পায়ের নখগুলোতে পচন ধরেছে। আজ মঙ্গলবার ওই শিশুকে নির্যাতনের মামলার আসামিদের রিমান্ড শুনানির সময় এই নির্মমতার বর্ণনা তুলে ধরেন আদালত।

সাফিকুর রহমানসহ আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারক। এ ছাড়া পরবর্তী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে আদালতে হাজির করার নির্দেশও দেওয়া হয়।

ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন শিশুকে নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরার আগে আদালতে বলেন, ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর। চাঞ্চল্যকর। উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তার বাসায় এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা জাতির জানা প্রয়োজন।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রুবেল মিয়া ৮ ফেব্রুয়ারি চার আসামিকে সাত দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। সেই আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আজ তাঁদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। বিকেলে শুনানির সময় মাথায় হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে চার আসামিকে আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়।

এসআই রুবেল মিয়া প্রথমে বক্তব্য দেন। এরপর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়োজিত আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার রিংকিসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন। শতাধিক আইনজীবী আসামিদের রিমান্ডে পাঠানোর পক্ষে সমর্থন জানান।

আদালত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে শিশুটির শারীরিক অবস্থা বর্ণনা করেন।

বর্ণনায় দেখা যায়, ম্যাজিস্ট্রেট ১১ বছরের শিশুর শরীর পরীক্ষা করে দেখেছেন, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন। মাথা থেকে গলা পর্যন্ত গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ায় সেখানে ঘা হয়ে গেছে। হাতের বিভিন্ন অংশেও ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছে। মসলা পেষার নোড়া দিয়ে তার হাতের আঙুলগুলো থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। মাথার চুল টেনে তোলা হয়েছে। উরুতেও গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। পায়ের আঙুলের নখে পচন ধরেছে।

আদালত শিশুর জবানবন্দির কিছু অংশ পড়েও শোনান। জবানবন্দিতে শিশু বলেছে, কারণে-অকারণে তাকে মারধর করতেন গৃহকর্ত্রী বীথি। বাসার অন্যরাও তাকে মারধর করতেন। তাকে বাথরুমে থাকতে দেওয়া হতো। খেতে হতো বাথরুমের পানি। শীতের দিনে তাকে গরম কাপড় দেওয়া হতো না।

এ পর্যন্ত বলার পর উপস্থিত আইনজীবীরা আদালতকে জবানবন্দি আর না পড়ার অনুরোধ করেন। তাঁরা বলেন, এই নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা সহ্য করা যাচ্ছে না। একপর্যায়ে আদালত সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বীথিকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি শিশুটিকে নির্যাতনের কথা আংশিক স্বীকার করেন।

শিশুটিকে কেন নির্যাতন করা হতো—আদালতের এই প্রশ্নের জবাবে বীথি প্রথমে বলেন, ‘আমরা কোনো নির্যাতন করিনি। শিশুর গায়ে আগে থেকে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। অন্য এক বাসায় কাজ করার সময় তাকে ঝুলিয়ে পেটানো হতো বলে ওর বাবা এখানে কাজে দেওয়ার সময় বলেছিলেন।’

আদালত এ সময় জানতে চান, শিশুর গায়ে নির্যাতনের কয়টি চিহ্ন ছিল। বীথি জবাবে বলেন, একটি চিহ্ন ছিল। আদালত তখন বলেন, ‘এখন তো তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব জায়গায় নির্যাতনের চিহ্ন।’ বীথি জবাব দেন, ‘যেভাবে টিভিতে বা ছবিতে দেখানো হয়েছে, সেভাবে নির্যাতন করা হয়নি। আমি তাকে মাঝে মাঝে চড়-থাপ্পড় মেরেছি।’ তাহলে সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন কেন—আদালতের এই প্রশ্নে বীথি নিশ্চুপ থাকেন।

আদালত বীথিকে বলেন, শিশুকে আপনি বাথরুমে থাকতে দিয়েছেন। তিনি তখনো কোনো কথা না বলে নীরব থাকেন।

আদালত তখন গৃহকর্তা সাফিকুর রহমানকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘নির্যাতনের বিষয়ে আপনি নিশ্চুপ ছিলেন কেন? আপনি একটি দায়িত্বশীল পদে কর্মরত ছিলেন। আপনার বাসায় কেন এমন ঘটনা হবে?’ সাফিকুর রহমান জবাবে বলেন, ‘এভাবে নির্যাতন হয়নি। আগের বাসা থেকে সে নির্যাতিত হয়ে এসেছিল। তার চোখমুখ ফোলা ছিল।’

পরে আদালত রিমান্ডের বিষয়ে আদেশ দেন। সাফিকুর রহমানকে পাঁচ দিন, তাঁর স্ত্রী বীথিকে সাত দিন এবং বাসার অন্য গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমকে ছয় দিন এবং রুপালি খাতুনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে দেওয়া হয়।

সাফিকুর রহমানের উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসায় কাজ করত ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী। তার বাবা গোলাম মোস্তফা ১ ফেব্রুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে বাসা থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত