Ajker Patrika

রাজশাহী বিভাগে বিএনপি: অহংকারে পরাজয় ১১ প্রার্থীর

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জের সব আসনেই জামায়াতের কাছে হেরেছেন বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপিরা
  • হাতছাড়া হওয়া ১১টি আসনের মধ্যে দুটিতে জামায়াতের অবস্থান শক্তিশালী আগে থেকেই
  • প্রার্থীরা দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কাছে টানতে পারেননি বলে অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
রাজশাহী বিভাগে বিএনপি: অহংকারে পরাজয় ১১ প্রার্থীর

রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৮টিতে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। অন্য ১১টি আসনে জিতেছে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা। ভোটের ফল প্রকাশের পরপরই এই আসনগুলোতে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা সামনে এসেছে।

দলের নেতা-কর্মীরা বলেছেন, অহংকারের কারণে ডুবেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। তবে দুটি আসনে সাংগঠনিকভাবেই জামায়াত ছিল শক্তিশালী। এ দুটি আসনে বিএনপি তাদের মোকাবিলা করতে পারেনি।

ভোটের বেসরকারি ফলে দেখা গেছে, রাজশাহী বিভাগের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনের সবগুলোতেই জামায়াতের কাছে হেরেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনেও বিএনপি হেরেছে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে। এ ছাড়া রাজশাহী-১, রাজশাহী-৪, জয়পুরহাট-১, নওগাঁ-২, পাবনা-১, পাবনা-৩ ও পাবনা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থীরা পরাজিত হন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সবগুলো আসন হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টিই এখন বেশি আলোচিত হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে শাজাহান মিঞা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে হারুনুর রশীদ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে আমিনুল ইসলাম বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। তিনজনই সাবেক এমপি।

তাঁদের পরাজয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর নেতা-কর্মীরা চেয়েছিলেন নতুন মুখ। কারণ, তাঁরা তো আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন না। সেই পুরোনো মুখ এলে মানুষ গ্রহণ করতে পারেননি।’

সদরে পরাজিত বিএনপির হেভিওয়েট নেতা হারুনুর রশীদের দিকে ইঙ্গিত করে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি হলেন পীর। নির্বাচনী সভা যেসব করলেন, তাতে তিনি প্রধান অতিথি, স্ত্রী ও ছেলে বিশেষ অতিথি। অহংকার করে অন্য নেতা-কর্মীদের কাউকে ডাকলেন না। ফ্যাসিস্টের সুবিধাভোগীদের নিয়ে চলতে শুরু করলেন। তাঁকে পীর মেনে অন্য দুই আসনের প্রার্থীরাও একই কাজ করলেন। পার্শ্ববর্তী রাজশাহী-১ আসনেও এই বাতাস লাগল। এখানে বিএনপির ভোট বিএনপিরই আছে। কিন্তু প্রার্থীরা নিতে জানলেন না বলে হারলেন।’

এ বিষয়ে কথা বলতে বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদকে ফোন করা হয়। নেতা-কর্মীদের না নিয়েই নির্বাচন করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লোকজনের মধ্যে আছি ভাই। পরে এগুলো কথা হবে।’

রাজশাহী-১ আসনে প্রার্থী ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন। এলাকার নেতা-কর্মীরা জানান, শরীফ উদ্দীনের মাঝেও অহংকার দেখেছেন তাঁরা। তাঁর নির্বাচনে এক ছেলে ছাড়া পরিবারের পরিচিত মুখদের ভোটের মাঠে দেখা যায়নি। এমনকি শরীফের ভাই তিনবারের সাবেক এমপি প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হকের স্ত্রী আভা হককেও দেখা যায়নি। এ আসনে যাঁরা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তাঁদেরও সরব উপস্থিতি ছিল না ভোটের মাঠে। বরং, প্রচার চলাকালে আশপাশে গোদাগাড়ীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের দেখা গেছে।

রাজশাহী-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন ডিএমডি জিয়াউর রহমান। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তাঁকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি নেতা-কর্মীরা মানতেই পারেননি। তিনি মনোনয়ন পাওয়ার পর এলাকার জামায়াতের নেতা-কর্মীরাই মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন খুশিতে। তাই তিনি যে ভোটে হারছেন, তা আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল।

স্থানীয় একজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকবেই। কিন্তু জিয়া মনোনয়ন পাওয়ার পর অহংকারী হয়ে গেলেন। অন্য কাউকে ডাকলেন না।’

জয়পুরহাট-১ আসনে প্রার্থী ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ রানা প্রধান। তিনিও হেরেছেন। এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেকুন নাহার বিএনপির অনেকেই ভোট দিয়েছেন। বিএনপির একজন নেতা বলেন, ‘যাকে প্রার্থী করা হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ছোট। মনোনয়নবঞ্চিত দুজন নেতা ধানের শীষের জন্য কাজ করেননি। অহংকার করে দলের প্রার্থীও তাঁদের সেভাবে ডাকেননি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।’

নওগাঁ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সামসুজ্জোহা খান। ভোটের শুরুতে তাঁর অবস্থান ভালোই ছিল। কিন্তু ভোটের দিন যত এগিয়ে এসেছে ততই পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। পাবনা-৩ আসনেও শুরুতে বিএনপির অবস্থান ভালো ছিল। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন হাসান জাফির তুহিন। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় এখানে ধানের শীষ জেরবার হয়েছে। পাবনা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন হাবিবুর রহমান হাবিব। এ আসনেও ছিল বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। ফলে আসন দুটিতে সুবিধা পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা।

তবে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও পাবনা-১ আসনে জামায়াতের প্রয়াত আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাজিবুর রহমান আগে থেকেই ভোটের মাঠে এগিয়ে ছিলেন। আসন দুটিতে জামায়াত শক্তিশালী। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন এম আকবর আলী। বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত আকবর আলী ভোটের মাঠে দৌড়াতে পারেননি।

দলের প্রার্থীদের ভেতর অহংকারী মনোভাব ছিল কি না—জানতে চাইলে বিএনপির রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, ‘সেগুলোর বিষয় অধিকতর তদন্ত করে দেখব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত