Ajker Patrika

বড়পুকুরিয়া খনি: কয়লা এখন গলার কাঁটা

  • তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট বন্ধ।
  • কয়লা ব্যবহার কমলেও উৎপাদন চলছে।
  • খোলাবাজারে কয়লা বিক্রির সুযোগ নেই।
  • ভূগর্ভের নিরাপত্তায় উৎপাদনও বন্ধ করা যাচ্ছে না।
  • ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ২.২২ এবং মজুত ৫.২০ লাখ টন।
দিনাজপুর ও ফুলবাড়ী প্রতিনিধি
আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬: ৫৬
বড়পুকুরিয়া খনি: কয়লা এখন গলার কাঁটা
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে উত্তোলন করা কয়লার স্তূপ। ছবি: আজকের পত্রিকা

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি ইউনিটই এখন বন্ধ। চালু আছে মাত্র একটি ইউনিট। এ কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে কয়লার ব্যবহার কমে গেছে। অথচ দেশের একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়ায় উত্তোলন চলতে থাকায় এর ইয়ার্ডে কয়লার স্তূপ জমে গেছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খনি সূত্র বলছে, প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টন কয়লা উত্তোলন করা হলেও ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৭৫০ টন। তাতে দিনে প্রায় ৩ হাজার টন কয়লা বাড়তি থাকছে। দীর্ঘদিনের এই অব্যবস্থাপনায় ইয়ার্ডে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ কয়লার স্তূপ জমেছে। এতে ইয়ার্ডে আগুন লাগার ঝুঁকিসহ আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। খোলাবাজারে কয়লা বিক্রির সুযোগ না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

খনি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে খনির ভূগর্ভে ১৩০৯ নম্বর ফেইস থেকে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টন কয়লা উত্তোলন করা হলেও বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৭৫০ টন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে কয়লা উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে।

বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল) থেকে জানা যায়, কয়লাখনির ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ২ লাখ ২২ হাজার টন। অথচ কয়লাখনি ও তাপবিদ্যুৎ মিলিয়ে কয়লার মজুত রয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার টন। আগে ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুতের তিনটি ইউনিট চালু থাকায় দৈনিক ৪-৫ হাজার টন কয়লার চাহিদা ছিল। এখন মাত্র একটি ইউনিট চালু আছে, সে কারণে কয়লার চাহিদা নেমে এসেছে এক-তৃতীয়াংশে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৯ সালের পর থেকে বড়পুকুরিয়ার কয়লার একমাত্র ক্রেতা নির্ধারিত হয় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। এর ফলে খোলাবাজারে কয়লা বিক্রির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আগে টেন্ডারের মাধ্যমে বাইরের ক্রেতাদের কাছে কয়লা বিক্রি করা যেত, ফলে মজুত নিয়ন্ত্রণে থাকত। এখন সেই পথ বন্ধ থাকায় পুরো উৎপাদন নির্ভর করছে একমাত্র ক্রেতার ওপর। এ ছাড়া চাহিদা কমলেও উৎপাদন থামানো যাচ্ছে না। কারণ, বিদেশি ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন উত্তোলন চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

খনির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, মাঝপথে উত্তোলন বন্ধ করলে ভূগর্ভস্থ নিরাপত্তা ও কারিগরি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এদিকে দীর্ঘদিন স্তূপ করে রাখা কয়লায় মাঝে মাঝে নিজ থেকে আগুন জ্বলে উঠছে। এতে কয়লা পুড়ে ক্ষতি হচ্ছে। আবার কোল স্লাইডিং অতিরিক্ত উচ্চতায় স্তূপের ঢাল বাড়ায় ধসে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে, যাতে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

এই সংকটের জন্য খনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র একে অপরকে দোষারোপ করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের দাবি, তারা সাময়িকভাবে উত্তোলন বন্ধ রাখতে বললেও তা মানা হয়নি। খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, চুক্তি অনুযায়ী উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব নয়, বরং বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়মিত কয়লা না নেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে।

ইয়ার্ডে মজুত করা কয়লার মালিক বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। তারা বাইরে কয়লা বিক্রির পক্ষে নয়। এ কারণে খনি কর্তৃপক্ষ বাইরের ক্রেতাদের কাছে কয়লা বিক্রির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়লা বাইরে বিক্রি করার বিষয়টি সাময়িক সমাধান। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রয়োজন-উৎপাদন এবং ব্যবহার পরিকল্পনার সমন্বিত নীতিমালা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটগুলো দ্রুত চালু করা, একক ক্রেতানির্ভরতা কমানো।

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, বর্তমানে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১ নম্বর ইউনিট চালু রয়েছে, সেখানে প্রতিদিন ৭৫০ থেকে ৮০০ টন কয়লার প্রয়োজন হচ্ছে। ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩ নম্বর ইউনিটটি ওভারহোলিংয়ের কারণে বন্ধ থাকলেও আগামী মে মাসের শেষ নাগাদ এটি চালু হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ওই ইউনিট চালু হলে দৈনিক প্রায় তিন হাজার টন কয়লার চাহিদা তৈরি হবে এবং এতে বর্তমান মজুত কয়লা ৭-৮ মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কয়লা উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে খনি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হলেও তারা তা মানেনি। ফলে ইয়ার্ডে এ পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার টন কয়লা মজুত হয়ে গেছে। তাঁর মতে, কয়লা উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখলে এ ধরনের সংকট তৈরি হতো না।

অন্যদিকে, বিসিএমসিএলের মহাব্যবস্থাপক খান মো. জাফর সাদিক বলেন, সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী চীনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খনিতে কয়লা উত্তোলনের কাজ করছে। এই প্রক্রিয়া মাঝপথে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ, ভূগর্ভে খনির নিরাপত্তা ও নানা কারিগরি জটিলতার কারণে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী উত্তোলন চালিয়ে যেতেই হয়।

খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, বর্তমানে খনির ইয়ার্ডে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ কয়লা জমে গেছে। এতে বড় বড় স্তূপ তৈরি হয়েছে এবং প্রায়ই সেখানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি বিশেষ দল সার্বক্ষণিক কাজ করছে। তবে আগুনে পুড়ে কয়লা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫২৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২ নম্বর ইউনিটটি ২০২০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর যান্ত্রিক ত্রুটিতে ২৭৫ মেগাওয়াটের ৩ নম্বর ইউনিটও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১ নম্বর ইউনিটটি চালু থাকলেও সেখান থেকে মাত্র ৫৫-৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এর জন্য প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৭০০ টন কয়লা প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নীরবে পেট্রোডলার চুক্তি বাতিল সৌদির, পেট্রোইউয়ানের উত্থান ঠেকাতেই ইরান যুদ্ধ

বিসিবির অনুরোধে সাড়া না দেওয়ার ‘পুরস্কার’ জিম্বাবুয়ে-আয়ারল্যান্ডকে দিচ্ছে ভারত

কুষ্টিয়ায় পীরকে হত্যা: সাবেক শিবির নেতার হুকুমে হামলা চালায় আসামিরা

চট্টগ্রামে তোপের মুখে হাসনাত আবদুল্লাহ

অবরোধে ক্ষুব্ধ ইরান আটকাতে পারে আরেক জলপথ, সিদ্ধান্ত পাল্টাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদির চাপ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত