Ajker Patrika

মৌলভীবাজার: বোরো মৌসুমে সেচের পানির অভাবে বিপাকে কৃষক

  • বোরো মৌসুমে সেচের তীব্র সংকট, বিপাকে কৃষকেরা
  • প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ সম্ভব হয়নি
  • দুশ্চিন্তায় ৬০ হাজার কৃষক
মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজার: বোরো মৌসুমে সেচের পানির অভাবে বিপাকে কৃষক
পানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে বোরো ধানের আবাদ। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কেওলার হাওর থেকে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

মৌলভীবাজারে বোরো আবাদের ভর মৌসুমে সেচের তীব্র সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। পানির অভাবে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা যাচ্ছে না। আর যাঁরা আবাদ করেছেন, এমন অন্তত ৬০ হাজার কৃষক পর্যাপ্ত সেচ না পেয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে টাকা দিয়েও পানি পাচ্ছেন না। কোথাও চারা রোপণের পর জমি ফেটে চৌচির, কোথাও পানির অভাবে রোপণই শুরু করা যায়নি।

সরেজমিনে জেলার সাতটি উপজেলার হাওর ও নন-হাওর এলাকা ঘুরে প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, কেওলার হাওর থেকে শুরু করে কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর, জুড়ী, বড়লেখা—সবখানেই সেচ নিয়ে হাহাকার। অনেক জমিতে ধানের চারা রোপণের পরও শুকিয়ে যাচ্ছে। একরপ্রতি ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করেও পানির অভাবে ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার ৩৪৫ হেক্টর হাওর এলাকায় এবং ৩৫ হাজার ৫৫ হেক্টর নন-হাওর এলাকায়। কিন্তু সেচব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সেচের সংকট না থাকলে অন্তত আরও ৩০ হাজার হেক্টর জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হতো।

সেচ নালাগুলো নতুন করে খনন না করায় অনেক জায়গায় ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। কোথাও ক্রসবাঁধ ও স্লুইসগেট দিয়ে পানি আটকে চাষাবাদ করায় উজানের কৃষকেরা পানি পাচ্ছেন না। কাউয়াদিঘী হাওরে সেচ সুবিধা দিতে নির্মিত প্রায় ১০৫ কিলোমিটার নালার অনেক অংশই এখন অকার্যকর। কুদালী ছড়ায় দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর জমি সেচ সংকটে পড়েছে। রাজনগর ও সদর উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার কৃষক পানির অভাবে দুশ্চিন্তায় আছেন।

কমলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে লাঘাটা নদীতে উজান থেকে পানি কম আসায় সেচে টান পড়েছে। কুলাউড়ার হাজীপুর, শরীফপুর, পৃথিমপাশা এলাকায়ও একই অবস্থা। হাকালুকি হাওরের উঁচু অংশে পাইপে পানি টেনে আনতে হচ্ছে। এতে খরচ বাড়ছে, ঝুঁকিও বাড়ছে। জুড়ী ও বড়লেখাতেও বোরো আবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

কুলাউড়ার কৃষক সালমান মিয়া বলেন, মৌসুমের শুরুতে কিছু পানি পাওয়া যায়। পরে আর থাকে না। অনেক টাকা খরচ করে শেষে শূন্য হাতে ফিরতে হয়। কমলগঞ্জের মর্তুজ আলী জানান, ফসল বাঁচাতে অনেক দূর থেকে পানি আনতে হয়। মৌসুমের মাঝামাঝি একেবারেই পানি থাকে না।

জেলায় সরকারি উদ্যোগে ১৪টি সৌরচালিত সেচব্যবস্থা চালু আছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংখ্যা বাড়ানো গেলে কিছুটা স্বস্তি মিলত। পর্যাপ্ত নলকূপ ও সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনও বাড়ত। শুধু কুদালী ছড়ার নালা খনন করলেই কয়েক হাজার হেক্টর জমি আবাদে আনা সম্ভব।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, যেখানে সেচনালা আছে, সেখানে কমবেশি পানি পাচ্ছেন কৃষকেরা। নালায় সমস্যা হলে সমাধানের চেষ্টা করা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানির সংকট রয়েছে। বিভিন্ন নালা ও ছড়া দিয়ে পর্যাপ্ত পানি যাচ্ছে না, ফলে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া নলকূপের সমস্যার কারণে পানি পাচ্ছেন না কৃষকেরা। পর্যাপ্ত নলকূপ বা সেচের ব্যবস্থা করলে জেলায় অন্তত আরও ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা যাবে। যেসব ছড়া বা নালা দিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলো খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত