Ajker Patrika

সংস্কৃতিচর্চায় হুমকি-বাধা: শঙ্কায় সাংস্কৃতিক অঙ্গন, কর্তৃপক্ষের আপসে প্রশ্ন

শরীফ নাসরুল্লাহ, ঢাকা
সংস্কৃতিচর্চায় হুমকি-বাধা: শঙ্কায় সাংস্কৃতিক অঙ্গন,
কর্তৃপক্ষের আপসে প্রশ্ন

প্রেমের নাটক-সিনেমা বানানো যাবে না, দেখানো যাবে না। এতে সমাজের অবক্ষয় হয়—এমন দাবি জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বিভাগে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন এক আইনজীবী।

দেশে শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি হুমকি দিন দিন কোন পর্যায়ে যাচ্ছে, তার সর্বশেষ এই উদাহরণ গত বৃহস্পতিবারের। গত ১০ দিনে কিশোরগঞ্জে ‘তৌহিদি জনতার’ আপত্তির মুখে বাতিল হয়েছে কনসার্ট, বাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে মাদ্রাসাছাত্রদের। এমনকি সিলেটের বিয়ানীবাজারে একটি নৌকাবাইচের আয়োজন নিয়েও আপত্তি তুলেছিল তৌহিদি জনতা। পরে অবশ্য নৌকাবাইচটি হয়েছে।

শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি এমন হুমকি- আক্রমণ নিয়ে একরকম আতঙ্কের মধ্যে আছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীরা। তাঁরা বলছেন, এমনটা চলতে থাকলে সাংস্কৃতিক আয়োজন সংকুচিত হয়ে পড়বে। কিন্তু পরিস্থিতি উন্নতিতে সরকারের পদক্ষেপ আশাবাদী করছে না তাঁদের; বরং কর্তৃপক্ষের নীরবতাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন তাঁরা।

বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান লাল্টু আজকের পত্রিকাকে বলেন, দেশে প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতির আবহ ক্রমাগতভাবে মানুষের চিন্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা এক দিনে হুট করে হয়নি। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এটা ঘটে চলেছে ধীরে ধীরে।

মফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘এটা গুরুতরভাবে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। তারা চাইলে পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু তারা এই ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সংকুচিত হয়ে যাবে। সাধারণ জনগণ আমরা যারা আছি, তাদের রুখে দাঁড়াতে হবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন ঘটনা নতুন নয়। সেখানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বাদ্যযন্ত্রের জাদুঘর তছনছ করা হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘অথচ সরকারের তরফ থেকে যখন বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জায়গাটাই এমন, সেখানে গান ইত্যাদি নিষিদ্ধ।

তাহলে তো বোঝা যায়, মবের উৎস কোথায়। আর কিছু বলার থাকে না।’

সংস্কৃতিকর্মী সব সময় এসব ঘটনার প্রতিবাদ করে এসেছেন জানিয়ে জামশেদ আনোয়ার বলেন, ‘আমরা সব সময় চাই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হবে অবাধে। সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে নিস্পৃহ। তারা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য উগ্র ধর্মীয় যে গোষ্ঠীগুলো আছে, তাদের সঙ্গে সব সময় সমঝোতা করে, আপস করে চলে। এর পরিণতিতে এই ঘটনাগুলো ঘটছে।’

সংস্কৃতিকর্মীদের কেউ কেউ বলছেন, তৌহিদি জনতা বিষয়টা আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার। যে কেউ একজন এই নামে একটা চিঠি দিয়ে দিল আর অমনি সব বন্ধ হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না।

সংস্কৃতিকর্মী ও নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার অবস্থা যেহেতু খারাপ, তাই এ ধরনের ঘটনাগুলো অহরহ ঘটছে। তৌহিদি জনতা কারা? এটাই পরিষ্কার না। একজন একটা চিঠি দিল, অমনি গান বন্ধ হয়ে গেল। সুতরাং এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ থাকতে হবে।’

ডানপন্থীরা অন্যায্য কথা যা বলবে আর তা মেনে নিতে হবে—এমনটা চলতে পারে না মন্তব্য করে আলী হায়দার আরও বলেন, ‘এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না। এমন হলে, একসময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইসক্রিমও খাওয়া যাবে না।’

প্রেমের নাটক-সিনেমা বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, সংস্কৃতিবিষয়ক সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর ডাকযোগে নোটিশটি পাঠান। নোটিশে দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটকে প্রেম এবং অতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের আধিক্যের অভিযোগ তুলে বলা হয়, এর ফলে সাংস্কৃতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। সমাজের প্রচলিত নৈতিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

আইনি নোটিশ দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে টেলিভিশন নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাতটি সংগঠন। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গতকাল বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘রোমান্টিক নাটক বা সিনেমা নির্মাণকে সামগ্রিকভাবে বন্ধ করার দাবি কোনোভাবেই সৃজনশীল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

দেশের নাটকের দলগুলোর মোর্চা সংগঠন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের মহাসচিব কামাল বায়জীদ বলেন, ‘সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি এই হুমকি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এ ব্যাপারে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের নীরবতা আমাদের শঙ্কিত করছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত