Ajker Patrika

ফরেন পলিসির নিবন্ধ /যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় পাওয়ার ক্লাস নিচ্ছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

ইতিহাস বলে, শক্তিশালী দেশগুলোর সাধারণত বন্ধু কম থাকে। রাশিয়ার উত্থানে তার প্রতিবেশীরা ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে, চীনের উত্থানে এশিয়ায় ভারত-জাপান-ভিয়েতনাম একে অপরের কাছাকাছি এসেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে গত ৮০ বছর ধরে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা না করে বরং তার সঙ্গে মিত্রতা করেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে শুধু শক্তিধর হিসেবে নয়, বরং ‘নিয়ম ও নীতির’ বাহক হিসেবে তুলে ধরেছিল। ঠিক যেমন শিক্ষক ছাত্রদের শেখায়।

তবে ট্রাম্পের বর্তমান ‘ভেনেজুয়েলা নীতি’ যুক্তরাষ্ট্রের অর্জিত সেই মহৎ ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। এখন আর গণতন্ত্র বা বিশ্ব নিরাপত্তার দোহাই নয়, বরং ‘জোর যার, মুল্লুক তার’—এই নীতিতেই বিশ্বকে শাসন করতে চাইছে ওয়াশিংটন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তিকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে কিছু আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান (যেমন জাতিসংঘ, ন্যাটো) গড়ে তুলেছিল। এমনকি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের (যা একতরফা পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচিত) আগেও জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দৌড়ঝাঁপ করেছিল এবং ৪৯টি দেশের সমর্থন নিয়ে একটি কোয়ালিশন গঠন করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র তখন বুঝতে পেরেছিল, শুধু ভীতি দিয়ে নয়, বরং অন্যের ‘সম্মতি’ নিয়ে নেতৃত্ব দিলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই পথ থেকে সরে এসেছে। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার সম্প্রতি সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সগর্বে ঘোষণা করেছেন—যুক্তরাষ্ট্র এখন ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারকে তুচ্ছজ্ঞান করে বলেছেন, পৃথিবী চলে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার মাধ্যমে—ইতিহাসের তথাকথিত ‘লোহার আইন’ অনুযায়ী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও স্পষ্ট করেছেন, ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতা পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্র সেখানকার তেলের নিয়ন্ত্রণ নেবে। এটি কোনো নীতি বা আদর্শের লড়াই নয়, বরং সরাসরি অন্যের সম্পদ দখলের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

ট্রাম্পের এই আচরণ শুধু শত্রু নয়, বরং কানাডা, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া বা মেক্সিকোর মতো পরম মিত্রদের মনেও ভয়ের সৃষ্টি করছে। কিন্তু কেন?

আগে মিত্ররা জানত, যুক্তরাষ্ট্র শক্তি ব্যবহার করে কোনো একটি বড় আদর্শ (যেমন গণতন্ত্র রক্ষা) রক্ষা করার জন্য। এখন ট্রাম্প বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র শক্তি ব্যবহার করছে, কারণ, সে তা ‘পারে’।

ট্রাম্প ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’ বা মনরো মতবাদ ব্যবহার করে লাতিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপের বৈধতা খুঁজছেন। কিন্তু এই মতবাদ মূলত তৈরি হয়েছিল ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ঠেকাতে, অন্য দেশের তেল দখল করতে নয়।

চার দশক ধরে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলই লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে একধরনের অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছিল। মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের চরম প্রতিপক্ষ থেকে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক পার্টনারে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের শিকারিসুলভ আচরণ সেই দীর্ঘদিনের বিনিয়োগকে ধূলিসাৎ করছে।

এখন যুক্তরাষ্ট্রও যদি পুতিনের রাশিয়ার মতো (ইউক্রেন আগ্রাসন) নগ্ন স্বার্থের পেছনে ছোটে, তবে সে শক্তিশালী হবে না, বরং ‘একাকী’ হয়ে পড়বে। মিত্ররা তখন বিকল্প খুঁজবে, নিরপেক্ষ দেশগুলো দূরে সরে যাবে। এমনটা হবে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল হওয়ার কারণে নয়, বরং তার শক্তির প্রকৃত উৎস—অর্থাৎ নৈতিক নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা ভুলে যাওয়ার কারণে।

কিন্তু এই ঝুঁকি সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন পৃথিবীকে যে বার্তা দিচ্ছে, তা হলো—এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করবে না। এতে বিশ্ব হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় পাবে, কিন্তু কেউ আর তাকে মন থেকে ‘নেতা’ হিসেবে মানবে না। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কীইবা আসে-যায়! স্টিফেন মিলার ঠিকই বলেছেন, ইতিহাসে শক্তিধররা এভাবেই আচরণ করেছে।

গত আট দশক ধরে ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র একটি ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছিল এবং সেই পথেই একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। আজ সেই ব্যবস্থাই বেপরোয়া হাতে ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বনশ্রীর ছাত্রীকে খুন করেন তার বাবার হোটেলের কর্মচারী: র‍্যাব

বিএনপি-জামায়াত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিল নতুন জরিপ

ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যে সৃষ্ট ধোঁয়াশা পরিষ্কার করল বিসিবি

‘বাংলাদেশকে নিয়ে তিনটি আশঙ্কা, ভারতে খেলার পরিস্থিতি নেই’

বিজয় আমাদের হয়েই গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু আনুষ্ঠানিকতা: নুর

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত