ট্রাম্পের সঙ্গে মাখামাখি করা প্রযুক্তি বিলিয়নিয়াররা এখন কী করবেন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে সিলিকন ভ্যালির তিন শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস ও মার্ক জাকারবার্গের পাশাপাশি বসে থাকার ছবিটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য অস্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের এবার কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় সাফল্যের পর এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নিজেদের ব্যবসায়িক ভবিষ্যতের জন্য লাভজনক মনে করেছিলেন প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা। ট্রাম্পের ডানপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থের সমন্বয় ঘটিয়ে তাঁরা আরও সম্পদশালী হয়েছেন। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তারে তাঁদের সম্পদ বেড়েছে অভাবনীয় হারে। ইলন মাস্কের সম্পদ ছাড়িয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলার।
কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য সেই রাজনৈতিক হিসাব পাল্টে দিয়েছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। গভর্নর নির্বাচনে টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যেও দলটির সাফল্য এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে—দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনীতিতে অতি ধনীদের প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এআই ব্যবসা, বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে।
টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগ কাসার বলেন, এআই বিলিয়নিয়ারদের অর্থে পরিচালিত রিপাবলিকানদের ভোটারেরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ডেমোক্র্যাটদের উচিত তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ বলেন, সিলিকন ভ্যালির ধনকুবেররা নিজেদের জন্য সুরক্ষিত আশ্রয় তৈরি করছেন, অথচ তাঁদের উদ্ভাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে নিজেরাই সতর্ক করছেন। তিনি বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার অঙ্গীকার করেন। ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এড মার্কি বলেন, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তে বিপুলসংখ্যক সমন জারি করা হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদন্ত এবং বড় ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এআই পরিচালনায় বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন হওয়ায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বড় বড় ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে। এসব স্থাপনা বিদ্যুৎ ও পানির বিপুল ব্যবহার, শব্দদূষণ এবং পরিবেশগত প্রভাবের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতার মুখে পড়ছে। টেক্সাসের জিনা হিনোজোসা, ওহাইওর অ্যামি অ্যাকটন এবং জর্জিয়ার কেইশা ল্যান্স বটমস ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিরতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এ ছাড়া এনভিডিয়া ও অ্যামাজনের কাছে ভবিষ্যৎ তদন্তের জন্য নথিপত্র সংরক্ষণের চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে ইলন মাস্ক ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের বড় লক্ষ্য হতে পারেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে সরকারি ব্যয় সংকোচন বিষয়ক উদ্যোগ ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি বা ডজের কার্যক্রম এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রম সংকুচিত করার বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিলেন মাস্ক। কিন্তু টেক্সাসে তাঁর সমর্থিত কেন প্যাক্সটন বড় ব্যবধানে হেরে যান। নির্বাচনের ফল আসার পর দীর্ঘ সময় নীরব ছিলেন মাস্ক। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন করে তাঁর ‘ভোট রেড টুডে’ পোস্টটিও মুছে ফেলেন। পরদিন মহাকাশে ডেটা সেন্টার নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি।
মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গও নতুন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ডানপন্থী অবস্থানের দিকে ঝুঁকেছেন এবং প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক কর্মসূচি (ডিইআই) বাতিল করেছেন। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে মানুষের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন তিনিও।
তবে প্রযুক্তি বিশ্বের ধনকুবেরদের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। সাধারণ মানুষের কাছে তাঁরা এখন চরম সম্পদবৈষম্য ও অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতীক। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ ভোটারদের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ফেরানো কঠিন হতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্যের পর প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের ওপর রাজনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক চাপ আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।









