Ajker Patrika

ট্রাম্পের হাত ধরে নগ্নরূপে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সর্বশেষ উদাহরণ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সর্বশেষ উদাহরণ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণের পর দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ক্ষমতা যথাযথভাবে হস্তান্তরের আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই দেশটি পরিচালনা করবে। একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য আর কোনো দিন প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে প্রতিবেশী দেশে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে চাপ প্রয়োগ করলেও ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি নজিরবিহীন। কারণ, এভাবে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নেওয়া এবং সরাসরি সে দেশ পরিচালনার ঘোষণা দেওয়ার মতো নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের উদাহরণ আর নেই।

রিও ডি জেনেইরোর স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মাউরিসিও সান্তোরো বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে মার্কিন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। ওই কৌশলে আমেরিকা অঞ্চলে মার্কিন সেনার উপস্থিতি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ১৮২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ‘আমেরিকা কেবল আমেরিকানদের জন্য’ নীতিকেই সামনে আনা হয়েছে। বলাই বাহুল্য, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা মহাদেশের একাধিক অভ্যুত্থানে মার্কিন হস্তক্ষেপের বৈধতা দিতে ওই নীতির অজুহাত দিয়েছে হোয়াইট হাউস।

যুক্তরাষ্ট্রের এমন আধিপত্যবাদী নীতি দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। গত কয়েক দশকে আমেরিকা অঞ্চলে প্রকাশ্য বা গোপন মার্কিন হস্তক্ষেপের কয়েকটি উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

পানামা

১৯০৩ সালে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে পানামার স্বাধীনতাসংগ্রামে সামরিকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। স্বাধীনতার পরও দেশটির ওপর প্রভাব বজায় রাখে তারা। প্রায় ৯ দশক পর ১৯৮৯ সালে দেশটির শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের আদেশে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন সেনা পানামায় অনুপ্রবেশ করে। সিআইএর সাবেক ঘনিষ্ঠ নরিয়েগাকে মার্কিন আদালত যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। ওই হামলায় ২০০ থেকে ৫০০ বেসামরিক নাগরিক এবং পানামার প্রায় ৩০০ সেনা নিহত হন। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানামার নির্বাচনে জয়ী ঘোষিত গিয়ের্মো এন্দারাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসায় যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৯০ সালের ৪ জানুয়ারি সি-১৩০ বিমানে পানামার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে কোমরে শিকল পরিয়ে নিয়ে যায় মার্কিন সেনারা। ছবি: এপি
১৯৯০ সালের ৪ জানুয়ারি সি-১৩০ বিমানে পানামার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে কোমরে শিকল পরিয়ে নিয়ে যায় মার্কিন সেনারা। ছবি: এপি

মেক্সিকো

বর্তমান মার্কিন অঙ্গরাজ্য টেক্সাস ছিল মেক্সিকোর অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ দেখা দেয়, যার জেরে ১৮৪৭ সালে মেক্সিকোতে অনুপ্রবেশ করে রাজধানী মেক্সিকো সিটির দখল নেয় মার্কিন বাহিনী। শেষপর্যন্ত দেশের ৫৫ শতাংশ অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধের অবসান ঘটায় মেক্সিকো। ১৮৪৮ সালের ওই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়া অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা ও ওটার রাজ্য এবং অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো ও ওয়াইয়োমিংয়ের অংশবিশেষ।

১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে অপারেশন জাস্ট কজের দ্বিতীয় দিনে পানামায় মার্কিন এম-৩৩৩ সাঁজোয়া যান। ছবি: সংগৃহীত
১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে অপারেশন জাস্ট কজের দ্বিতীয় দিনে পানামায় মার্কিন এম-৩৩৩ সাঁজোয়া যান। ছবি: সংগৃহীত

কিউবা

১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধে কিউবাকে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। স্পেনের থাবা থেকে বের হওয়ার পর মার্কিন খপ্পরে যায় পুয়ের্তা রিকো। ১৯০২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দখলে থাকে কিউবা। ওই বছর চুক্তির মাধ্যমে গুয়ানতানামো উপসাগরের ওপর স্থায়ী মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর অবশ্য দুই দফায় দেশটি দখলে নেয় মার্কিন সেনারা, প্রথমবার ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সাল এবং দ্বিতীয়বার ১৯১৭ থেকে ১৯২২ সাল। ১৯৫৯ সালে বিপ্লবের পর কিউবার নেতৃত্ব যায় ফিদেল কাস্ত্রোর হাতে। তাঁকে উৎখাত করতেও ‘বে অব পিগস’ নামে গোপন অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র, যা ব্যর্থ হয়।

হাইতি

দেশটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার অজুহাতে ১৯১৫ সালে হাইতিতে অনুপ্রবেশ করে মার্কিন সেনাবাহিনী। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত দেশটির শুল্ক বিভাগ, কোষাগার ও জাতীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৫৯ সালে স্বৈরশাসক ফ্রাঁসোয়া ‘পাপা ডক’ দুভালিয়েরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আশঙ্কা দেখা দিলে তাঁকে টিকিয়ে রাখতে গোপনে হস্তক্ষেপ করে সিআইএ। কারণ, কিউবার বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দুভালিয়েরকে বাজির ঘোড়া বানিয়েছিল হোয়াইট হাউস।

ব্রাজিল

১৯৬৪ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হুয়াও গুয়ার্তোকে উৎখাত প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য প্রতিরোধ ঠেকাতে ব্রাজিলের উপকূলে মার্কিন নৌবহর মোতায়েন করা হয়েছিল। এ ছাড়া ১৯৭০-এর দশকে ‘অপারেশন কনডর’ নামে পরিচিত অভিযানের আওতায় ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন ও হত্যার কাজে সিআইএ ও এফবিআই সরাসরি শাসনযন্ত্রকে পরামর্শ ও সহায়তা দেয়।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আচরণের সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে মাদুরোর অপহরণ। এ বিষয়ে টেম্পল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক অ্যালান ম্যাকফারসন বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসে হয়তো অনেকেই ভেবেছিলেন, লাতিন আমেরিকায় নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের যুগের অবসান হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বিরল উল্লেখ করে অ্যালান ম্যাকফারসন বলেন, মার্কিন হস্তক্ষেপ প্রায় সব সময়ই ক্ষমতা হস্তান্তরে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত