Ajker Patrika

ইসরায়েলের নির্বাচন ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন আনবে কি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫: ৫৩
ইসরায়েলের নির্বাচন ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন আনবে কি
ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন হলেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন খুব একটা আসবে না। ছবি: সংগৃহীত

যদিও অধিকাংশ ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি অসলো চুক্তির ভিত্তিতে থাকা মৌলিক নীতিগুলো থেকে সরে এসেছেন, তবু অধিকাংশ আন্তর্জাতিক দাতা এখনো ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’ প্রতিষ্ঠার অস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাহীন ধারণাটি আঁকড়ে ধরে আছেন।

চলতি শীতের কোনো এক সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ইসরায়েলের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত আবারও তাদের ‘শান্তির বিনিময়ে সমৃদ্ধি’ পরিকল্পনা নিয়ে সামনে আসবে। রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ তৈরি হবে, এমন আশায় ফিলিস্তিনের অর্থনীতিকে আধুনিকায়নের জন্য দাতাদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। হোয়াইট হাউসের অন্যতম লক্ষ্য হবে গাজাকে রূপান্তরিত করার প্রায় অসম্ভব কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে পশ্চিম তীরে নতুন সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি ফেরানো। এর মাধ্যমে ‘বোর্ড অব পিস’-এর ভাবমূর্তি রক্ষা এবং সংস্থাটির কার্যপরিধি ও দায়িত্ব বহাল রাখার চেষ্টা করা হবে।

ইসরায়েলের বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের ‘পরিবর্তনপন্থী’ নেতাদের কেউই এমন শান্তি আলোচনার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী নন, যার পরিণতিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হতে পারে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো তাঁরা এই উদ্যোগের বিরোধিতায় এতটা অনমনীয় নন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। এ জন্য তিনি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আটকাদেশ পুনর্বহাল, ইহুদি উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অধিক আগ্রহী ব্যক্তিদের দিয়ে নিরাপত্তা বিভাগের প্রধানদের প্রতিস্থাপন এবং নতুন ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারেন।

তবে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলেও ‘শান্তির বিনিময়ে সমৃদ্ধি’ উদ্যোগটি আবারও চালু হতে পারে। নির্বাচনের পর তাঁকে ঘিরে থাকা নানা সংকট ও চাপ থেকে জনসাধারণের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এসব সংকটের মধ্যে রয়েছে:

১. একাধিক রণাঙ্গনে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন: বিভিন্ন ফ্রন্টে দীর্ঘ সময় ধরে সেনা মোতায়েন রাখার ফলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

২. রিজার্ভ সেনাদের ক্লান্তি ও জনঅসন্তোষ: রিজার্ভ সেনারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায় ‘হারেদিম’-এর সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

৩. গোয়েন্দা ব্যর্থতার জবাবদিহির অভাব: ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সন্ত্রাসী হামলার আগে সংঘটিত গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য এখনো কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।

৪. দুর্নীতির তদন্ত নিয়ে গণমাধ্যমের চাপ: দুর্নীতির তদন্তের বিষয়ে অন্তত কোনো না কোনোভাবে দায় স্বীকার করার জন্য গণমাধ্যমের চাপ বাড়ছে।

৫. পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলি দেওয়ানি আইনের আওতায় আনার দাবি: ধর্মীয় দলগুলো পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের দেওয়ানি আইনের অধীনে নিয়ে আসার দাবি জানাচ্ছে।

একই ধরনের বিবেচনা থেকে হোয়াইট হাউসও নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তব পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, এখনই উদ্যোগটি পুনরায় চালুর উপযুক্ত সময়। এর পেছনে উদ্দেশ্য হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মনোযোগ অভ্যন্তরীণ সংকট ও দুর্ভোগ থেকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া।

ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট সেন্টারের সর্বশেষ প্রতিবেদন ‘শান্তির বিনিময়ে সমৃদ্ধি ২.০: নির্বাচনের পর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্ক’-এ সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া ইয়াফে এবং দুবাই পাবলিক পলিসি রিসার্চ সেন্টার ‘বুহুথ’-এর মহাপরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।

পশ্চিম তীরে বিনিয়োগের জন্য তহবিল দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করার আগেই আন্তর্জাতিক দাতারা কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণের প্রত্যাশা করবেন। শর্তগুলো হলো:

১. ইসরায়েলি সামরিক অভিযান সীমিত করা: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কেবল তখনই অভিযান চালাতে পারবে, যখন জীবন ও সম্পত্তির ওপর তাৎক্ষণিক ও সরাসরি হুমকি থাকবে।

২. বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কমানো: ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের আগ্রাসন বন্ধ করতে ইসরায়েলি পুলিশকে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৩. ভূখণ্ড সংযুক্তির দিকে অগ্রযাত্রা বন্ধ করা: ইসরায়েল সরকারকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, পশ্চিম তীরের আর কোনো অংশকে ইসরায়েলের দেওয়ানি আইনের আওতায় আনা হবে না এবং নতুন ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের অনুমতিও দেওয়া হবে না।

৪. ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওপর তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা: প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি পর্যবেক্ষণের জন্য ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) ওপর তৃতীয় পক্ষের একজন নিরীক্ষক নিয়োগ করতে হবে।

এ ছাড়া ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত দাতারা একটি ডলারও দিতে রাজি হবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ ইসরায়েল সরকার কিংবা হোয়াইট হাউস, কোনো পক্ষই এই বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে আসতে আগ্রহী নয়। ইসরায়েলের অনিচ্ছা, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিধা, ফিলিস্তিনিদের অনমনীয় অবস্থান এবং আরব দেশগুলোর অনড় দাবির মধ্যে সমন্বয় সাধনের কোনো সহজ পথ নেই। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানগুলোর মধ্যে সমাধান খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন।

তবু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো চাইলে কিছু ছোট পদক্ষেপ নিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:

১. কোনো ঘনিষ্ঠ আরব অংশীদার দেশের মুদ্রার সঙ্গে বিনিময়মূল্য সংযুক্ত রেখে একটি ডিজিটাল মুদ্রা চালু করা।

২. ফিলিস্তিনিদের ভ্রমণ নথির পরিবর্তে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র চালু করা।

৩. ইন্টারনেট যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে পশ্চিম তীরের জন্য একটি ‘আন্তর্জাতিক গেটওয়ে’ প্রতিষ্ঠা করা।

৪. ফিলিস্তিনি গ্রাম ও ইসরায়েলি বসতির কাছাকাছি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা।

৫. পশ্চিম তীরকে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য করিডরের সঙ্গে যুক্ত করতে আমদানি-রপ্তানি অবকাঠামো নির্মাণ করা।

আরব ও মুসলিম দেশগুলোর হাতে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের মতো কার্যকর কোনো প্রভাব নেই। একইভাবে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি যে আলোচ্যসূচিতে রাখতেই হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর সক্ষমতাও তাদের খুবই সীমিত। এ কারণে দেশগুলোকে নমনীয় ও বাস্তববাদী কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

এর একটি উপায় হতে পারে ‘নেগেভ ফোরাম’ পুনরুজ্জীবিত করা এবং এতে জর্ডান ও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিদলকে অন্তর্ভুক্ত করা। এর মাধ্যমে চূড়ান্ত মর্যাদা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সামনে এগোনোর পথ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। একই সময়ে, পশ্চিম তীরের পুনর্গঠনে দাতা হিসেবে অবদান রাখতে আগ্রহী আরও বিস্তৃত পরিসরের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে বৈঠকের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে ‘বোর্ড অব পিস’। এর মাধ্যমে পশ্চিম তীর পুনর্গঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন পক্ষকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত