Alexa
শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১

সেকশন

 

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা: অদূরদর্শী প্রশাসন

দলীয় স্বার্থ বিবেচনায় ভ্রান্তপথে নিয়োগ কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে আছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। নিয়োগ বাণিজ্য একটি নির্মম সত্যে পরিণত হয়েছে। কোভিডের কারণে অনেক দিন নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ ছিল।

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৯:০১

পরীক্ষার্থীরা অঙ্কও নাকি মুখস্থ করে নেন। ছবি: আজকের পত্রিকা বিসিএসসহ সব পরীক্ষা পদ্ধতিতে একটা বড় ধরনের সংকট দেখা দিচ্ছে। ব্যাংক, অডিটসহ সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় লাখ লাখ প্রার্থী অংশগ্রহণ করে থাকেন এবং একটি এমসিকিউর নিয়মে এই পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। প্রাথমিক যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাগুলোর একটি সহজ উপায় বের করা হয়েছে। কিন্তু এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে গেলে লাগে প্রবল মুখস্থনির্ভর স্মরণশক্তি। দেশে হাজার হাজার কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। এই কোচিং সেন্টারগুলো অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। কোভিডের কারণে ইতিমধ্যে যেহেতু ক্লাস করা সম্ভব হয়নি, তাই অনলাইনে কোচিং মাস্টাররা অনর্গল বক্তৃতা ঝেড়ে থাকেন এবং ছাত্রছাত্রীরা যথাসাধ্য গলাধঃকরণ করে।

শেখার মূল উদ্দেশ্যটি ব্যাহত হয় এবং এঁদের মধ্যে যাঁরা না বুঝে মুখস্থবিদ্যায় পটু, তাঁরা পাস করে যান। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার—অঙ্কও নাকি মুখস্থ করে নেন। একই কায়দায় পরবর্তীকালে লিখিত পরীক্ষায়ও এঁরা পাস করে যান। শেষ পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে এঁদের কেউ কেউ কৃতকার্য হয়ে সরকারি, আধা সরকারি এবং ব্যাংকের পরীক্ষায় পাস করে নিয়োগ পেয়ে যান। এর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা আছে কি না, বছরের পর বছর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিজ্ঞ সদস্যরা এবং অন্য নিয়োগকর্তারা ভেবে দেখেননি। যে সিলেবাস অনুযায়ী পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে, তা-ও খুব অবাস্তব। উচ্চতর গণিত, উচ্চতর ইংরেজি চাকরিজীবনের কোন ক্ষেত্রে কাজে লাগবে, তা-ও তাঁরা কখনো ভেবে দেখেননি।

পাকিস্তান আমলে এ ধরনের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সীমিত ও প্রয়োজনীয় সিলেবাসের মধ্যেই পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন হতো এবং যোগ্য ব্যক্তিরা নিয়োগ পেয়ে প্রশাসনে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করতেন। বাংলাদেশেও ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। যার ফলে অনেক মেধাবী কর্মকর্তাকে পরবর্তীকালে পাওয়া গেছে। এখন সমস্যা হচ্ছে, এই বিশাল সিলেবাস হজম করতে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অনেকেরই মনোবৈকল্য দেখা দেয়। একটি চাকরির কারণে প্রার্থীরা অমানবিক হয়ে পড়েন এবং এই রকম একটি মানসিকতা নিয়ে পরবর্তীকালে কেউ কেউ চাকরিজীবনে প্রবেশ করেন। সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা প্রবল দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন। তাঁদের বিবেকহীন এবং অমানবিক আচরণে প্রশাসন দুর্নাম কুড়াচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মুখস্থবিদ্যায় কোনো শিক্ষা হয় না। শিক্ষার প্রক্রিয়াটিই হচ্ছে বিষয়টিকে বোঝা এবং সেই ক্ষেত্রে যতবার বোঝা না যায় ততবারই চেষ্টা করে যাওয়া। আর অঙ্কের বিষয় তো বুঝতেই হবে। অঙ্কের মূল সূত্র হচ্ছে—যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ। এই চারটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে না পারলে কোনো অঙ্কই মিলবে না। প্রাথমিক শিক্ষায় এসব বিষয়ে শিক্ষকেরা খুব একটা নজর দেন না। এ থেকেই মুখস্থবিদ্যার সূচনা। এটাও অসম্ভব মনে হয়, অনেক ছাত্রই নাকি অঙ্কে মুখস্থবিদ্যা প্রয়োগ করে এসএসসি পরীক্ষা পাস করে যায়, এমনকি ইংরেজিও।

প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকে প্রচুর পরিমাণে দক্ষ ইংরেজি শিক্ষক নেই। প্রচুর পরিমাণে বলা ভুল হবে। খুবই নগণ্যসংখ্যক শিক্ষক দক্ষ হয়ে ছাত্রদের পড়াতে পারেন। সেখানেও মুখস্থবিদ্যার প্রয়োগ। বাক্যগঠন এবং বানানের সূত্রগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান না থাকলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইংরেজিতে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। বাংলা মাতৃভাষা; কিন্তু প্রমিত বাংলায় একটি বাক্যগঠন অত সহজ নয়। বাংলায় দেখা গেছে, কলেজ তো বটেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পর্যন্ত সঠিক বাংলা বাক্য রচনা করতে পারেন না। বানানবিভ্রাট থেকে যায় এবং সেই সঙ্গে বাক্যগঠনের এক জটিলতা থেকেই যাচ্ছে। মুখস্থনির্ভর এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে তাঁরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। তাঁদের স্মৃতিশক্তির ওপর যে প্রবল চাপ পড়ছে, তাতে কেউ কেউ হয়তো কৃতকার্য হতে পারেন; কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার মধ্য থেকে যে মেধা বাছাই করার বিষয়, তা একেবারেই অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে। আশির দশকের পর থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একটা অংশ অমানবিক, দুর্নীতিপরায়ণ এবং অদক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে কেউ কেউ সাজা ভোগ করছেন আবার কেউ কেউ ভাগ্যগুণে বেঁচে যাচ্ছেন। এ কথা প্রায় সবাই বলে থাকেন, এমনকি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বলে থাকেন, নিয়োগের ত্রুটির এবং শিক্ষাব্যবস্থার কারণে প্রশাসনিক দক্ষতা কমে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এসব দেখভাল করার জন্য সরকার তার বিবেচনায় পাবলিক সার্ভিস কমিশনে অত্যন্ত মেধাবী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। সেই নিয়োগগুলোও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। জানা গেছে, অতীতে এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে নানা ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল।

সেই বিবেচনার কারণে পরীক্ষায়ও দুর্নীতি হয়েছে। দলীয় স্বার্থ বিবেচনায় ভ্রান্তপথে নিয়োগ কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে আছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। নিয়োগ-বাণিজ্য একটি নির্মম সত্যে পরিণত হয়েছে। কোভিডের কারণে অনেক দিন নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ ছিল। কিন্তু শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগ-বাণিজ্যের দালালেরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। এমনই সক্রিয় যে, পদ অনুযায়ী ঘুষের পরিমাণ নির্ধারিত হয়ে যায় এবং ওই টাকা দিলে পরীক্ষায় শুধু অবতীর্ণ হতে হবে; কিন্তু লেখা যাবে না। লেখার কাজটা ওই দালালের লোকজনই করে ফেলবেন। এই দালালেরা খুবই সততার সঙ্গে চাকরিগুলোর ব্যবস্থা করে থাকেন। বছরের পর বছর তাই এসব দালাল তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে চলেছেন। পুলিশ, প্রাথমিক শিক্ষক, ব্যাংক কর্মচারী-কর্মকর্তা, বিভিন্ন অফিস-আদালতে ড্রাইভার, পিয়ন, নিরাপত্তাকর্মীসহ সব জায়গার জন্যই একটা অর্থমূল্য প্রচলিত হয়ে আছে। অনেক প্রার্থী বাড়িঘর, জমিজমা বিক্রি করে, ধারদেনা করে এই অর্থের সংস্থান করে থাকেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা কৃতকার্য হন। তবে এর মধ্যে একটা অংশ যে দুর্ভাগ্যে পতিত হয় না, তা নয়। আদর্শ ব্যাপারীর হাতে নিঃস্ব হয়ে তাঁরা পথে পথে ঘুরতে থাকেন। শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া একটা ঐতিহ্যে দাঁড়িয়ে গেছে।

সরকার এ বছর প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য একটি সাজাও ঘোষণা করেছে। সাজার ঘোষণা এ ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নয়। এর চেয়েও গুরুতর ব্যবস্থার কথা ভাবা প্রয়োজন। কারণ, আইনের সঙ্গে সঙ্গে আইনের ফাঁকও থাকে প্রচুর। যাঁরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গর্হিত কাজ করতে পারেন, তাঁদের পক্ষে আইনের ফাঁক বের করা কঠিন কোনো কাজ নয়। 
যাঁরা নিয়োগ-বাণিজ্যের বদৌলতে চাকরি পান, তাঁদের পক্ষে যেকোনো অনৈতিক কাজ করার অধিকার জন্মে যায়। কারণ, অর্থের বিনিময়ে তিনি চাকরিটি পেয়েছেন এবং চাকরিদাতাদের নৈতিকতা সম্পর্কে প্রথমেই তাঁর একটা ধারণা জন্মে যায়। সেই ধারণা তাঁকে উচ্চতর দুর্নীতি করার সাহস জোগায়। এখানে ওই মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাই দায়ী। জীবনের শুরু থেকে তিনি কোনো প্রকৃত শিক্ষা পাননি। যে শিক্ষক নিয়োগ-বাণিজ্যের ফলে চাকরি পেয়েছেন, সেই অর্থ তাঁকে যেকোনোভাবেই হোক তুলতে হবে। এখানে কোনো নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই। বিষয়টি যেকোনো অর্থে রাজনৈতিক। কারণ, ভ্রান্ত রাজনীতিই এসব লোককে যুক্ত করে থাকে। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, সাংসদদের মনোনয়ন নিতে প্রকারভেদে লাখ থেকে কোটি টাকা লাগে শোনা যায় এবং হয়তো সত্য। কোটি কোটি টাকা দিয়ে যেহেতু তাঁকে মনোনয়ন নিতে হয়, ক্ষমতায় বসার পর তিনি যেকোনো অনৈতিক কাজের অধিকার পেয়ে যান। নিয়োগ-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি একই। বর্তমান রাজনীতি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কোনো কাজ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। বিষয়টি ঠিক না হলে একটি পঙ্গু প্রশাসনেরই জন্ম হতে থাকবে।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

    কর আহরণ ও কর প্রদান: বিবেচনার কয়েকটি বিষয় 

    নতুন ধারার বিনোদন

    ‘দুনিয়াডা বেদ্দপের’

    সিরাজদিখানে ৫০ বছরের টেঁটা যুদ্ধ অবসানে মতবিনিময় সভা

    প্রথম অনুপস্থিত ২৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১০ জনেরই বিয়ে

    ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রক্তের সম্পর্কটা অক্ষুণ্ন থাকবে: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী 

    কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের ওপর মোবাইল চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন

    খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ইউপি নির্বাচনে আ. লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত  

    মেসির ৩০০ কোটির হোটেল ভেঙে ফেলার নির্দেশ