Ajker Patrika

নিজস্ব ‘আদালতে’ বিচার করেন তহিদুল-শাহিন

সাগর খান, আদমদীঘি (বগুড়া)
আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৩, ১০: ০৩
নিজস্ব ‘আদালতে’ বিচার করেন তহিদুল-শাহিন

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রাম। এই গ্রামের লক্ষ্মীকে বিদায় করে দিয়ে দখলে নিয়েছে ‘অসুর’। এটা এখন ‘অসুরপুর’। আর ‘অসুরের দলের’ নাম তহিদুল-শাহিন বাহিনী। গ্রামের মানুষের অভিযোগ, পান থেকে চুন খসলেই নির্যাতন শুরু করেন এ গ্রুপের সদস্যরা। তাঁদের স্লোগান একটাই—‘মাইরের ওপর ওষুধ নাই, আগে মার তারপর জরিমানা’। আর সব কর্মকাণ্ডকে বৈধ করতে রয়েছে তাঁদের নিয়েই গঠিত ১৪ সদস্যের বিচারক কমিটি। সেই কমিটির আদেশই এ গ্রামের আইন।

সম্প্রতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কাশেমের ছেলে আমিনুল ইসলামকে (৪০) কুপিয়ে হত্যা করার পর সামনে আসে তহিদুল-শাহিন গ্রুপের নির্যাতনের চিত্র। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাঁদের দৌরাত্ম্যে টিকতে না পেরে গ্রামছাড়া হয়েছে প্রায় ৪০ পরিবার। আমিনুলও সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য ছিলেন। সম্প্রতি এক জমি বেচাকেনা নিয়ে এই চক্রের হাতে আসে দুই লাখ টাকা। টাকাগুলো দলনেতা শাহিনের কাছেই গচ্ছিত ছিল। ভাগাভাগি নিয়ে ২২ মার্চ রাতে গ্রামের একটি ক্লাবঘরের সামনে সালিস বসে। সালিসে আমিনুলের সঙ্গে শাহিনের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এর জেরে বৈঠক শেষে শাহিন ও তাঁর সহযোগীরা মিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন আমিনুলকে। ক্লাবঘরটি ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করে এ চক্র।

এ ঘটনায় আমিনুলের বড় বোন আফরোজা বেগম বাদী হয়ে তহিদুল, শাহিনসহ ৩৭ জনকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার পর ইসলাম, আবু বকর ও ওয়াহেদ নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া জেলহাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। কিন্তু ঘটনার পাঁচ দিন অতিবাহিত হলেও হত্যা মামলার মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। বর্তমানে হত্যার মূল আসামিসহ অন্যরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে রয়েছেন।

গতকাল সোমবার ওই গ্রামে গেলে একের পর এক মানুষের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে তহিদুল-শাহিন গ্রুপের লুটপাট, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের কাহিনি। তুচ্ছ ঘটনায়ও তহিদুল-শাহিন গ্রুপ বিচার-সালিস বসিয়ে মোটা অঙ্কের জরিমানা আদায়সহ বিভিন্ন চাঁদাবাজির টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেন। এ নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে ৩০-৪০টি পরিবার প্রাণভয়ে গ্রাম ছেড়ে আদমদীঘি, মুরইল, সান্তাহার, নওগাঁসহ বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে।

চক্রের সদস্যরা পলাতক থাকার কারণে গ্রামের লোকজনের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। গ্রামছাড়া লোকজন একের পর এক নিজ গ্রামে ফিরতে শুরু করেছেন। ফিরে দেখেন, তাঁদের বাড়িতে দরজা-জানালা ভাঙাসহ জিনিসপত্র তছনছ হয়ে পড়ে আছে। ফিরে আসা আলিম উদ্দিন জানান, তাঁর কাছ থেকে তহিদুল-শাহিন গ্রুপ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। চাঁদা না দেওয়ায় তাঁকে গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল। গার্মেন্টস ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম জানান, ওই গ্রুপের অত্যাচারে তাঁর ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি এখন নিঃস্ব।

আফজাল হোসেন নামের একজন জানালেন, তিনি শুক্রবার বাড়ি ফিরেছেন। তাঁর কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তিনি দেড় বছর আগে নিজ গ্রাম ছেড়ে আদমদীঘি সদরে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে তহিদুল-শাহিন গ্রুপের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। আমিনুলের স্ত্রী রুখসানা বেগম বলেন, ‘গ্রামের দুই গ্রুপের মধ্যে আমার স্বামী প্রথম দিকে ছেদ্দা গ্রুপে ছিলেন, পরে শাহিন গ্রুপে যোগ দেন। ২২ মার্চ মোবাইলে কল করে তাঁকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। ওই দিন রাত সাড়ে ১০টার সময় আমি মোবাইলে জানতে পারি, আমার স্বামীকে খুন করে ক্লাবঘরের পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে দেখি, আমার স্বামীর শরীরে বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে আদমদীঘি থানার পরিদর্শক রেজাউল করিম রেজা আজকের পত্রিকাকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকে ওই দুই গ্রুপের দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। সম্প্রতি পুলিশ সুপারের নির্দেশে দুই পক্ষের সেসব দ্বন্দ্বের মীমাংসা করা হয়। কিন্তু তারপরও দুই লাখ টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এলাকায় তহিদুল-শাহিন গ্রুপের নির্যাতনের ব্যাপারে তিনি জানতে পেরেছেন।এদিকে ছেলে হত্যার বিচার না পেয়ে হাহাকারে দিন কাটছে আমিনুলের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কাশেমের।

১৯৭১ সালে সহযোদ্ধা বন্ধু মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের হারিয়ে যে দুঃখ-বেদনা-যন্ত্রণা হয়েছিল, আজ ৫২ বছর পর ছেলে হত্যার পর আবার নতুন করে সেই শোক-যন্ত্রণা জাপটে ধরেছে। তিনি বলেন, ‘’৭১-এর ঘাতকদের চেয়েও নির্মম ওরা।’ কমান্ডার আবুল  কাশেমকে সান্ত্বনা দেওয়ার যেন কেউ নেই। কিছুদিন আগেই হারিয়েছেন স্ত্রীকে। এবার হারালেন ছেলেকে। আর সেই মৃত্যু কোনো রোগে-শোকে নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভয়াবহ নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা।

আরও খবর পড়ুন:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এখন টিভির ঘটনা সমঝোতার চেষ্টা করবেন তথ্যমন্ত্রী

ড. ইউনূস এখন কোথায় আছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী উঠবেন কোথায়?

২৬ ফেব্রুয়ারি বসতে পারে সংসদের প্রথম অধিবেশন, সভাপতিত্ব করবেন কে

ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করবে সরকার, হবে সর্বজনীন

বৈধ সুবিধাকে অস্বীকার করে জনগণের সামনে সাধু সাজা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত