Ajker Patrika

বছর শেষ হয়, দুঃস্বপ্ন শেষ হয় না

মইনুল হাসান 
বছর শেষ হয়, দুঃস্বপ্ন শেষ হয় না

বিপজ্জনক রাজনৈতিক খেলায় মত্ত পুতিন তাঁর নিজ দেশকে জড়িয়ে ফেলেছেন একটি দীর্ঘস্থায়ী, বিশাল ব্যয়বহুল ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। আক্ষরিক অর্থে পরাস্ত ও অবমানিত না হলেও, পুতিনের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে।

৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২২, গুনে গুনে ঠিক ২৩ বছর। বরিস ইয়েলৎসিনের পদত্যাগের পর রাশিয়ান ফেডারেশনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব বর্তায় ৪৭ বছর বয়সের ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর। এরপর তিনি ৭ মে ২০০০ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। সেই থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশটির ক্ষমতার মসনদে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন পাকাপোক্তভাবে। বিশ্বের বহু দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছে, বহু নেতা মহাকালে বিলীন হয়ে গেছেন। নেতা আসে, নেতা যায়। অথচ প্রায় দুই যুগ ধরে দিব্যি আছেন পুতিন।

পুতিনকে ক্ষমতার সিঁড়ির কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন ভালেনতিন ইউমাশেভ, বরিস ইয়েলৎসিনের জামাতা। ১৯৯৭ সালে ক্রেমলিনের সদর দরজা ঠেলে তাঁকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের সামনে উপস্থিত করেন ইউমাশেভ। আইনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করা গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির এই তরুণ কর্মকর্তাকে প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন পছন্দ করলেন এবং তিনি তাঁকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সার্ভিসের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। ভ্লাদিমির পুতিন এই সুযোগ কাজে লাগাতে মোটেই কালক্ষেপণ করলেন না। কর্মদক্ষতায়, পরিকল্পনায়, স্বল্প সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেকে আলাদা মহিমায় উপস্থিত করতে সক্ষম হলেন। আর অনেকটা সে কারণেই ইয়েলৎসিন তাঁর ওপর বিশাল, বিস্তৃত শক্তিধর রাষ্ট্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার দিয়ে রাজনীতি থেকে বিদায় নেন।

রাশিয়ার বরিস ইয়েলৎসিন, ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক এবং বেলারুশের নেতা স্তানিস্লাভ শুশকেভিচ এক বৈঠকে বসেন এবং এই বৈঠকের জের ধরেই আকস্মিকভাবে পতন ঘটে সোভিয়েত ইউনিয়নের। বৈঠকের দিনটিও ছিল ডিসেম্বর মাসে, ১৯৯১ সালের ৭ ডিসেম্বর। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তিতেও ইয়েলৎসিনের হাত ছিল। আর এই ইয়েলৎসিনের হাত ধরেই রাজনীতির মঞ্চে সদম্ভে উত্থান ঘটে পুতিনের।

তিনি একাধারে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২৩ বছর ধরে দোর্দণ্ড প্রতাপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চ। দমন-নিপীড়ন চালিয়ে বিরোধী দল ও মতকে নিশ্চিহ্ন করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন পুতিন। ভিন্নমতাবলম্বীদের যাঁকেই তিনি পথের কাঁটা মনে করেছেন, তাঁকে সরিয়ে দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি। পুতিন নিপুণ দক্ষতায় নিজের চারদিকে একটি অভেদ্য ক্ষমতার বলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। মোটকথা, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার চর্চার ক্ষেত্রটি সংকুচিত করে সেখানে দুর্নীতিবাজদের আশকারা দিয়েছেন এবং স্বৈরাচার, কর্তৃত্ববাদের নিষ্ঠুর রাজত্ব গড়ে তুলেছেন। আজীবন ক্ষমতায় থাকার অভিপ্রায়ে রাশিয়াকে একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন।

পারমাণবিক অস্ত্রে হাত রেখে রুশ সাম্রাজ্য পুনঃপত্তন এবং সমগ্র বিশ্বের ক্ষমতাধরদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর অলীক স্বপ্নে বিভোর হয়ে গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সৈন্য, ১ হাজার ২০০ ট্যাংক, ২০০ যুদ্ধবিমান, অসংখ্য সাঁজোয়া যান এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে দুর্বল প্রতিবেশী, স্বাধীন দেশ ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়েছে। ভাবনায় ছিল মাত্র ১০ দিনে কিয়েভের পতন ঘটবে, ইউক্রেন জয়ের উল্লাসে রুশ সেনারা দেশে ফিরে যাবে। অথচ তা হয়নি। ইউক্রেনের সর্বস্তরের জনগণের ক্রমাগত ও তীব্র প্রতিরোধের কারণে রুশ বাহিনী ভীষণ রকম বেকায়দায় পড়ে।

রাশিয়ার বিরাট সেনা কনভয় পিছু হটতে বাধ্য হয়, কিয়েভ পৌঁছাতে পারেনি। রুশ সেনারা, যাদের বিজয়ীর বেশে দেশে ফেরার কথা ছিল, সেখানে বিপুলসংখ্যক রাশিয়ান সেনার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ পড়ে থাকে বনে-বাদাড়ে, রাস্তাঘাটে, ধ্বংসস্তূপের নিচে। ভয়াবহ যুদ্ধের বোবা সাক্ষী হিসেবে রাশিয়ানরা ফেলে যায় বহু সাঁজোয়া যান ও সরঞ্জাম। ইউক্রেনের সেনারা ডুবিয়ে দেয় রাশিয়ার বিশাল এবং অত্যাধুনিক দুই যুদ্ধজাহাজ। সাইবার লড়াইয়েও অনেকখানি এগিয়ে আছে ইউক্রেন। ফলে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। সে দেশের তরুণদের জোর করেও যুদ্ধক্ষেত্রে লাশ বানানো যাচ্ছে না, প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে অনেকেই।

এমন তীব্র যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হতে পারে, পুতিন তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়ে, অবকাঠামো ধ্বংসের ক্রেমলিনের পোড়ামাটি নীতি ইউক্রেনের নাগরিকদের মনোবল খর্ব করতে পারেনি; বরং তাঁদের প্রতিরোধ, প্রতিশোধস্পৃহাকে তীব্র করেছে। বিপজ্জনক রাজনৈতিক খেলায় মত্ত পুতিন তাঁর নিজ দেশকে জড়িয়ে ফেলেছেন একটি দীর্ঘস্থায়ী, বিশাল ব্যয়বহুল ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। আক্ষরিক অর্থে পরাস্ত ও অবমানিত না হলেও, পুতিনের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন নিশ্চিত একটি অপমানজনক এবং নিশ্চিত করুণ পরিণতির দিকে।

ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি করতে নির্লজ্জ ছলচাতুরী, নিরন্তর অপচেষ্টা নতুন নয়। একবার ক্ষমতার স্বাদ পেলে, বিশ্বের অনেক দেশের নেতাই অতীতে তা করেছেন এবং বর্তমানে তা করে চলছেন। তবে সমস্যা তখনই প্রকট হয়, বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ের কারণ হয় যখন একটি পরাশক্তির শীর্ষ থাকা ব্যক্তিটি সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দানব হয়ে ওঠেন। নিজ দেশে একক কর্তৃত্ব, একক আধিপত্যের সুকঠিন জাল বিস্তার করেও মন ভরে না। মোহ জাগে বিশ্বকে মুঠোয় নিতে। নানা অজুহাতের আড়ালে বেপরোয়া হয়ে ওঠে এমন ক্ষমতালোভী দানবেরা, যেমন হয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন।

পুতিন লাশের পর্বতের ওপর দাঁড়িয়ে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের অলীক স্বপ্ন দেখছেন। ক্ষমতার দম্ভে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ ইতিহাস তার আপন নিয়মেই চলে। এ কথাটি তিনি যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, ততই মঙ্গল। তা না হলে কারও জন্যই তা মোটেই সুখকর হবে না।

ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ঢাবি ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার, শিক্ষক ও বন্ধু পুলিশ হেফাজতে

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনার আড়ালে ঢাকাকে কী বার্তা দিল দিল্লি

হোয়াইট হাউসের ডিনারে হামলা: মেধাবী প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক অ্যালেন কেন অস্ত্র তুলে নিলেন

ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে গুলি: আটক যুবক সম্পর্কে যা জানা গেল

গুরুকে হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস, শিষ্য রকি প্রকাশ্যে খুন: বগুড়ায় সন্ত্রাসী চক্রের দ্বন্দ্ব ভয়ংকর

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত