দেশে এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের মেরামত। আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মেরামত। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই মেরামতের জন্য ২৭ দফাসংবলিত একটি রূপরেখা ঘোষণা করে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। আমাদের এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পশ্চাৎপটে রয়েছে দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছরের স্বাধীনতাসংগ্রাম। এর পরিণতিতে ১৯৭১ সালের মহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীন সার্বভৌম এই রাষ্ট্র দুরাচারের শিকার হয়ে এতবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে যে এর মেরামতের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
একইভাবে যে আঘাতগুলো এই রাষ্ট্রের কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠার ভিত্তিমূল সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত করে রেখেছে, রাষ্ট্র মেরামতে সেগুলোর অগ্রাধিকার পাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর প্রথম আঘাত আসে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই। যুদ্ধবিধ্বস্ত নবগঠিত রাষ্ট্রে যখন দরকার ছিল পুনর্গঠন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, তখন সৃষ্টি করা হয় রাজনৈতিক গোলযোগ। এর মধ্যে ছিল সশস্ত্র ধারাও। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পথও প্রশস্ত করেছিল ওই গোলযোগ।
এই রাষ্ট্রের ওপর আসা সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল সপরিবারে জাতির পিতার হত্যা। তারপর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা। এই রাষ্ট্রের অবস্থা তখন কান্ডারিবিহীন নৌকার মতো দিশাহীন। রাষ্ট্রে তখন সামরিক শাসন। এর মধ্যে সামরিক-বেসামরিক অসংখ্য হত্যাকাণ্ড। সেই পথে ১৯৮১ সালে আবার এক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড।
হ্যাঁ, জাতির পিতার হত্যার বিচার হয়েছে। আরও কিছু বিষয়ের সুরাহা করা হয়েছে আইন-আদালত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়। কিন্তু তাতেই কি সব ক্ষত ঘুচে গেছে! রাষ্ট্রের শরীরে এবং জাতির অন্তরে এসব ক্ষত কিন্তু রয়ে গেছে। এসব অনপনেয় ক্ষত মেরামত হবে কীভাবে?
বিএনপির রূপরেখায় অন্তত ছয়টি নতুন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম হচ্ছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সংবিধানে অনেক সংশোধন ও সংযোজন হয়েছে। সংবিধান যেহেতু কোনো অপরিবর্তনীয় দলিল নয়, সেহেতু এটা হতে পারে। কিন্তু এর কিছু কিছু করা হয়েছে অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। স্বাধীন বাংলাদেশের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বদলে দেওয়ার জন্য। যেমন রাষ্ট্রধর্ম। বিএনপি সংবিধান সংস্কার কমিশন করে সাংবিধানিক সংস্কারের যেসব বিষয় উল্লেখ করেছে, তাতে এই বিষয়টি নেই।
আবার জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থা প্রবর্তন; গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ব্যবস্থা প্রবর্তন; রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদে পরপর দুইবারের বেশি দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন প্রভৃতি স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ সংবিধান সংস্কার কমিশন করা হবে ঠিকই; কিন্তু সেই কমিশন কী কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা-ও স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে।
একই কথা প্রযোজ্য জুডিশিয়াল সংস্কার কমিশনের ক্ষেত্রেও। কমিশন গঠন করা হবে ঠিকই; কিন্তু কী কী করা হবে, তা রূপরেখায় বলে দেওয়া হয়েছে। যেমন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষেত্রে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ পুনঃপ্রবর্তন। বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় স্থাপন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, বিচারবোধ ও সুনামের কঠোর মানদণ্ডে যাচাই করে বিচারক নিয়োগ প্রভৃতি।
আমাদের দেশে একটা বড় সমস্যা হলো ক্ষমতার বাইরে থাকলে সব ন্যায়-নীতিবোধ ডালপালা ছড়িয়ে বিস্তার লাভ করে। তা যেমন রাজনীতিবিদদের, তেমনি আমলাদের। বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। তখন বিচারপতি নিয়োগ, বিচারব্যবস্থার প্রতি তাদের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি আমরা যারা দেখেছি, তাঁদের কাছে এসব আপ্তবাক্যই মনে হয়। তবে ভবিষ্যৎ যে অতীতের মতো হবে, তেমন কোনো কথা নেই। তাই ভবিষ্যতে যদি তারা এগুলো করে, সেটা দেশ ও জাতির জন্য নিঃসন্দেহে মঙ্গলজনক হবে।
বিএনপির রূপরেখায় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন এ দেশে আগেও একাধিক হয়েছে। বিএনপির শাসনামলেও হয়েছে। ডাকসাইটে আমলাদের নেতৃত্বে গঠিত সেই সব কমিশন গাদা গাদা সুপারিশসহ প্রতিবেদনও দিয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি। সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন সবই রাজনৈতিক সরকারের আজ্ঞাবহ করে রাখার প্রবণতা সব সময়ই দেখা গেছে। তবে ভবিষ্যতে যদি অন্য রকম হয়, সেটা রাষ্ট্রের জন্য একটা বড় মেরামতি কাজই হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের সংস্কারের পাশাপাশি ন্যায়পাল নিয়োগের সদিচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখায়। একই সঙ্গে ‘গত দেড় দশকে’ সংঘটিত দুর্নীতি উদ্ঘাটনের বিষয়ে যে বিএনপি কোনো রকম আপস করবে না, তা-ও স্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এই রাষ্ট্রে দুর্নীতি তো শুধু গত দেড় দশক হয়নি, এর আগেও হয়েছে। পরপর কয়েক বছর সারা পৃথিবীতে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন অভিধাও আমাদের কপালে জুটেছিল। সেগুলো কি এখন তাহলে ভুলে যেতে হবে!
বিএনপির রূপরেখার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বোধ হয় এই, তারা নিজেরা ন্যায়পালের আসনে বসে অন্যের অন্যায়ের বিচার, প্রতিকার বা সুরাহা করতে চায়। তাতে কি রাষ্ট্রের মেরামত হবে! এক পাশ মেরামত করে আরেক পাশ ক্ষতবিক্ষত রেখে তো চলার পথ মসৃণ করা যায় না। রূপরেখায় বলা হয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সুসংগঠিত, যুগোপযোগী এবং সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে গড়ে তোলা হবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রকে সব সময়ই এই কাজ অব্যাহতভাবে করে যেতে হয়। প্রতিরক্ষা বাহিনী এখনো সুসংগঠিত এবং সব সময়ই দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত। এর অন্যথা ভাবার কোনো কারণ নেই।
বিএনপির রূপরেখায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিভেদ উসকে দেওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষণীয়। বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা হবে। এটি করা হয়েছে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গ্রহণ করা কোনো বিষয় নিয়ে নতুন করে বিভেদ উসকানোর ফল ভালো হয় না। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটি তেমন নয়। এটি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক আছে।
সুতরাং সেটি নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে। সেটি করা গেলে রাষ্ট্রের সামান্য কিছু হলেও মেরামত হবে। ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে বিএনপির রূপরেখায়। এই লক্ষ্যে একটি ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিএনপির অনেক নেতা বক্তৃতায় বলছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে কয়েক লাখ লোক মারা যাবে। এই বৈপরীত্য নীতিনিষ্ঠ নয়। এভাবে ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন সম্ভব হবে না। আর সম্প্রীতি তো মানুষের অন্তরের বিষয়। অন্তরে বিষ নিয়ে মুখে নীতিকথা বলে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
রূপরেখায় মিডিয়া কমিশন, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন এবং নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। এগুলোতে এমন কিছু নেই, যা সচরাচর বলা হয় না।
তবে বিএনপির ঘোষিত রূপরেখা অসার বলার কিংবা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র মেরামতের জন্য এর মধ্যে অনেক বিষয়ই প্রযোজ্য। কিন্তু এই রূপরেখা বাস্তবে রূপায়িত করতে হলে দরকার হবে আরও রাজনৈতিক উদারতা এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা। এখন দরকার সেই প্রক্রিয়া শুরু করা। না হলে তিন জোটের রূপরেখা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলিলের মতো এটিও একটি কাগুজে রূপরেখা হয়েই থাকবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুগন্ধি খুব পছন্দ করতেন এবং নিয়মিত ব্যবহার করতেন। সুগন্ধির প্রতি প্রিয় নবী (সা.)-এর বিশেষ অনুরাগ ছিল। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘চারটি বস্তু সব নবীর সুন্নত—আতর, বিয়ে, মেসওয়াক ও লজ্জাস্থান আবৃত রাখা।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২২৪৭৮)
০৭ মার্চ ২০২৬
গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে সর্বশেষ (৫৪ তম) সাক্ষীর জেরা শুরু হয়েছে। এই মামলাটির বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ।
০৬ অক্টোবর ২০২৫
‘দুই দিন আগেই বাড়ি থেকে পাথরঘাটায় চলে এসেছি। এখন পুরোনো জাল সেলাই করছি। এক সপ্তাহের বাজারও করে এনেছি। আজ বিকেলে সাগর মোহনায় যাব, গভীর রাত থেকে জাল ফেলব।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদরের বাইনচটকী এলাকার জেলে হোসেন আলী। গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কথা হয় তাঁর...
১২ জুন ২০২৫
ভারতের স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞার পর সীমান্তে আটকে থাকা তৈরি পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকগুলো ফেরত আনছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে যেসব ট্রাক বন্দরে ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলো ভারতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ট্রাক ঢুকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
১৯ মে ২০২৫