Ajker Patrika

আমাদের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল

অর্চি হক, ঢাকা
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২২, ১১: ১৯
আমাদের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল

কারও চোখে অবলম্বন, কারও চোখে ধূসর তার স্মৃতি। শহরে বসবাসের একমাত্র ঠিকানা অনেকের। এগুলো ঘিরে প্রচুর স্মৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে বিস্তর অভিযোগ। তারপরও কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলগুলো নারীদের এক দারুণ ঠিকানা।  

বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে ও বিচ্ছেদ দুটোই হয়েছিল তানিয়া আক্তারের। মাদকাসক্ত স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ফিরেছিলেন বাবার বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও মেলেনি স্বস্তি। পরিবারে নরক যন্ত্রণার মধ্যে থেকেই স্নাতক শেষ করে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও পেয়ে যান। ২০১৭ সালে ওঠেন রাজধানীর নীলক্ষেতের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে। এরপর থেকে দুজন রুমমেটের সঙ্গে সেখানেই আছেন তানিয়া। রুমের সঙ্গে লাগোয়া ছোট্ট বারান্দায় তিনজন মিলে ফুল আর সবজির বাগান করেছেন।

তানিয়ার মতোই প্রায় ৫০০ নারী থাকেন রাজধানীর নীলক্ষেতের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয় এই হোস্টেল। নামে কর্মজীবী হলেও হোস্টেলের সব বাসিন্দাই কর্মজীবী নন। অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়ে দিচ্ছেন চাকরির পরীক্ষা।হোস্টেলের বাসিন্দা তামান্না স্বর্ণা নামের এক তরুণী বলছিলেন, ‘পড়াশোনা শেষ। বাড়িতে গেলে বিয়ে নিয়ে ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে হয়। এর চেয়ে ভালো এখানে থেকে বিসিএসের জন্য পড়ছি।’ তামান্না জানান, দেড় বছর ধরে নিজের বাড়িতে যান না তিনি। হোস্টেলটাই এখন তাঁর বাসা, বাসিন্দারা পরিবারের সদস্য।

 ঢাকার অবস্থা
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে বর্তমানে আসনসংখ্যা ৫২০। এর মধ্যে ৫০৩টি নিয়মিত বাসিন্দাদের জন্য। বাকি ১৭টি অতিথি আসন। সম্প্রতি এই হোস্টেলে ১০ তলা নতুন একটি ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে, যেখানে ২৫৩ জন বোর্ডার থাকতে পারবেন। তবে সেখানে আসন বরাদ্দ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত বোর্ডার তোলা হচ্ছে না। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সালেহা বিনতে সিরাজ বলেন, ‘আমরা আবেদন নেওয়া শুরু করেছি। ভবনের ছোটখাটো কিছু কাজ বাকি থাকায় এখনো সিট হ্যান্ডওভার করা যাচ্ছে না। আশা করছি আগামী মাসের মধ্যে এখানে কর্মজীবী নারীরা থাকা শুরু করতে পারবেন।’

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নীলক্ষেতের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের পুরোনো ভবনগুলোতে রয়েছে পাঁচ ধরনের আসনব্যবস্থা। সিঙ্গেল রুম আছে ২৮টি, ভাড়া ২ হাজার ৫৬০ টাকা। ডাবল বেডরুম ৪০টি, ভাড়া ১ হাজার ৭৬০ টাকা। তিন আসনবিশিষ্ট রুম আছে ৩৬টি, ভাড়া ১ হাজার ২৮০। শৌচাগারসহ তিন আসনের রুম আছে ১টি, ভাড়া ১ হাজার ৬০০ টাকা। চার আসনবিশিষ্ট রুম ৭১টি, ভাড়া ১ হাজার ১২০ টাকা করে।

খাবারদাবার
হোস্টেলে ক্যানটিনের পাশাপাশি বাসিন্দাদের জন্য নিচতলায় রাখা হয়েছে রান্নাঘর। অনেকে রান্নাঘরে রেঁধে খেতে পছন্দ করলেও বেশির ভাগ বাসিন্দা খাবারের জন্য ক্যানটিনের ওপর নির্ভরশীল। এখানে সকালের খাবার মেন্যুতে থাকে সুজি, পরোটা, সবজি, ডাল। দুপুর আর রাতে থাকে দুই পদের মাছ, সবজি, ভর্তা, মাংস আর ডাল। মাছ, মাংস ৩০ টাকা আর সবজি ভাজি রাখা হয় ২৫ টাকা। খাবারের মান ও দাম নিয়ে কিছুটা অসন্তুষ্টি থাকলেও ঢালাওভাবে অভিযোগ করতে চাইলেন না কেউ। মুশফিকা নামের একজন বলেন, ‘ক্যানটিনের খাবারের মান খুব ভালো না এটা ঠিক, কিন্তু একেবারে মুখে তোলা যায় না, তেমনও নয়। আট বছর ভার্সিটির হলে ছিলাম। সেখানকার খাবারের চেয়ে আমাদের ক্যানটিনের খাবার হাজার গুণে ভালো।’

ঢাকা ও ঢাকার বাইরে
ঢাকার নীলক্ষেত ছাড়াও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশে পরিচালিত হচ্ছে আরও আটটি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল। এসব হোস্টেলের আসনসংখ্যা মোট ১ হাজার ৯১৯। 
এ ছাড়া জাতীয় মহিলা সংস্থার অধীনে রাজধানীর বেইলি রোডে পরিচালিত হচ্ছে শহীদ আইভি রহমান কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল।  

হোস্টেলগুলোতে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাভার ও গাজীপুরের হোস্টেল ছাড়া অন্যগুলোতে আসন খুব একটা ফাঁকা থাকে না। যাঁরা হোস্টেল ছাড়তে চান, তাঁরা চলে যাওয়ার এক মাস আগে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেন। প্রতি মাসে হোস্টেল কমিটির সদস্যরা জমা হওয়া আবেদনের মধ্য থেকে বাছাই করে নতুন বোর্ডার তোলেন। রাজশাহী কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের কর্মকর্তা ফেরদৌস রাবিয়া বলেন, ‘আমার হোস্টেলের ১২০টা নিয়মিত সিটের সব ভরা। তবে এ মাসে কয়েকটি খালি হওয়ার কথা রয়েছে।’ 

কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে ফুলের বাগানঅনিয়মের গুঞ্জন
কর্মজীবী নারী হোস্টেলের রয়েছে অনিয়মের কিছু অভিযোগ। সাভার ও গাজীপুরের বিপুল টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ করা হলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে মিলছে না বাসিন্দা। সাভারের হোস্টেলে ৩৮৮ সিটের বিপরীতে ভাড়া হয়েছে মাত্র ১৩০টি আসন। আর গাজীপুরের কালীগঞ্জে ১৩০ আসনের বিপরীতে থাকছেন মাত্র ২০ জন। রাজধানীর হোস্টেলগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও আসন পান না কর্মজীবী নারীরা। এ জন্য ঢাকায় হোস্টেল সংখ্যা বাড়ানোর দাবি রয়েছে। তবে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর জানিয়েছে, আপাতত ঢাকায় হোস্টেল সংখ্যা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।

এ বিষয়ে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের দায়িত্বে থাকা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সালেহা বিনতে সিরাজ বলেন, ‘যেহেতু ঢাকায় জমি পাওয়া কঠিন, তাই আপাতত এখানে হোস্টেলের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। তবে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে হোস্টেল নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।’

কর্মজীবী হোস্টেলের ভাড়া অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় অনেক কম। নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও নেই। এ জন্য মেস বা বেসরকারি হোস্টেলে থাকার চেয়ে সরকারি কর্মজীবী হোস্টেলে থাকাই সুবিধাজনক। আর তাই নানা অসন্তুষ্টির ভিড়েও থাকার জন্য অনেক নারী বেছে নেন কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল। 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ভারত থেকে চিরতরে ইসরায়েল চলে গেলেন বিশেষ গোত্রের ২৫০ জন

শূন্যে নামবে সেশনজট, অনেক কলেজে বন্ধ হতে পারে স্নাতক-স্নাতকোত্তর কোর্স

হস্তান্তরের আগেই ফাটল সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনে

নকল পা সংযোজন ও বিকৃত মুখে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন মোজতবার

সরকারি কলেজের নারী ডেমোনেস্ট্রেটরকে জুতাপেটা করলেন বিএনপি নেতা, অধ্যক্ষসহ আহত ৫

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত